যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কমুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনা ক্ষীণ: বাস্তবতা স্বীকার করলেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি

গত মাসে কানাস্কিসে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনের পর কার্নি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন ২১ জুলাইয়ের মধ্যেই কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্ভব

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করা প্রায় অসম্ভব। মঙ্গলবার পার্লামেন্ট হিলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে যোগ দিতে যাওয়ার পথে সাংবাদিকদের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ফরাসি ভাষায় কার্নি বলেন, “বর্তমান সময়ে বিশ্বের কোনো দেশই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি করতে পারেনি যেখানে শুল্ক সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। আমাদেরকেও সেই বাস্তবতা মেনে নিতে হবে।” তিনি যোগ করেন, “কানাডা এখনও শুল্কমুক্ত বাণিজ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে আছে, কিন্তু সেই সুবিধা আগের মতো অবারিত নয়।”

- Advertisement -

গত মাসে কানাস্কিসে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনের পর কার্নি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ২১ জুলাইয়ের মধ্যেই কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি নতুন বাণিজ্য চুক্তি সম্ভব। কিন্তু সে আশা কার্যত ভেস্তে যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ প্রকাশিত খোলা চিঠিতে ঘোষণা দেন, ১ আগস্ট থেকে কানাডিয়ান পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। এই ঘোষণার ফলে কানাডার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরে কার্নি সরকার আলোচনার নতুন সময়সীমা ঘোষণা করে জানায়, তারা এই পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে মীমাংসা করতে চায়।

মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কার্নি বলেন, “আগামী কয়েক সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা আরও তীব্র হবে বলে আমি আশা করছি। তবে আমাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের দৃশ্যপট এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এটি আগের মতো পূর্বানুমেয় নয়। তাই আমাদের মনোযোগ থাকা উচিত সেই জায়গায়, যেটি আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি একটি শক্তিশালী কানাডিয়ান অর্থনীতি গড়ে তোলা।”

তিনি আরও বলেন, “অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রথমে শুল্কের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত খাতগুলোকে সহায়তা দিতে হবে। বিশেষ করে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, কৃষি এবং গাড়ি শিল্পের ওপর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে। এই খাতগুলো থেকেই পুনরুদ্ধার শুরু করতে হবে।”

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি সরাসরি কানাডার বাণিজ্য কাঠামোর ওপর প্রভাব ফেলছে। দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য পরিমাণ প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার হলেও নতুন শুল্কের ফলে রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে, বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে।

প্রধানমন্ত্রী কার্নি মন্ত্রিসভার বৈঠকে শুল্কবিরোধী প্রতিকৌশল, রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণ, এবং দেশীয় শিল্পকে টেকসই রাখার পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, “আমাদের শুধু প্রতিক্রিয়া জানিয়ে থেমে থাকলে চলবে না। বিকল্প বাণিজ্য বাজার ও নতুন অংশীদারিত্ব খুঁজে বের করতে হবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, এশিয়া-প্যাসিফিক এবং লাতিন আমেরিকার বাজারগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার এটাই সময়।”

আগামী সপ্তাহে অন্টারিওর হান্টসভিলে কানাডার বিভিন্ন প্রদেশের প্রিমিয়ারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন কার্নি। বৈঠকের মূল আলোচ্য বিষয় হবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কের প্রভাব, আন্তঃপ্রাদেশিক বাণিজ্য সহযোগিতা এবং নতুন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পরিকল্পনা। সরকারি সূত্র জানিয়েছে, বৈঠকে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় অবস্থান গড়ে তুলতে কার্নি প্রিমিয়ারদের সঙ্গে সক্রিয় আলোচনায় অংশ নেবেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান কেবল বাণিজ্যক্ষেত্রেই নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কেও শীতলতা এনেছে। তবে কার্নি সরকারের লক্ষ্য হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে কানাডার অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব অটুট রাখা।

কানাডা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে আজ, যখন বাণিজ্য যুদ্ধের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কার্নির স্বীকারোক্তি “শুল্কমুক্ত চুক্তির যুগ শেষ” এক কঠিন বাস্তবতার প্রতিফলন। এখন প্রশ্ন একটাই কানাডা কি নিজস্ব শক্তিতে নতুন অর্থনৈতিক ভারসাম্য খুঁজে পাবে, নাকি যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ছায়ায় আবারও নির্ভরতার ফাঁদে আটকে পড়বে।

- Advertisement -

Read More

Recent