
কানাডার আবাসন বাজারে অনিশ্চয়তা ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ২০২৫ সালের জন্য দ্বিতীয়বারের মতো বাড়ি বিক্রির পূর্বাভাস কমিয়েছে কানাডা রিয়েল এস্টেট অ্যাসোসিয়েশন (সিআরইএ)। সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর সারাদেশে মোট বাড়ি বিক্রির সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমে যেতে পারে। যদিও জুন মাসে সামান্য চাঙাভাব দেখা গেছে, যা থেকে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন বছরের দ্বিতীয়ার্ধে বাজার ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার শুরু করতে পারে।
সিআরইএর তথ্য অনুযায়ী, জুনে কানাডা জুড়ে বাড়ি হাতবদলের হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩.৫ শতাংশ বেড়েছে। মে মাসের তুলনায় জুনে বিক্রিও ২.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই হিসাবগুলো মৌসুমি সমন্বয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত। তবে বছরের সার্বিক হিসেবে বিক্রির গতি এখনও দুর্বল।
সংস্থার নতুন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশজুড়ে প্রায় ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০৩টি বাড়ি বিক্রি হতে পারে। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কম। এপ্রিলে প্রকাশিত পূর্বাভাসে সিআরইএ বলেছিল, বাড়ি বিক্রির হার অপরিবর্তিত থাকবে। কিন্তু বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসে দেওয়া পূর্বাভাসে তারা বলেছিল, ২০২৫ সালে বিক্রির হার ৮.৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। ক্রমাগত অর্থনৈতিক চাপ, ঋণের উচ্চ সুদহার এবং ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কমে যাওয়ার কারণে সেই আশাবাদ এখন অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
মূল্যমানের ক্ষেত্রেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। সিআরইএর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কানাডায় বাড়ির গড় মূল্য বার্ষিক ভিত্তিতে ১.৭ শতাংশ কমে দাঁড়াতে পারে ৬ লাখ ৭৭ হাজার ৩৬৮ ডলারে। এপ্রিলে দেওয়া পূর্বাভাসের তুলনায় এটি প্রায় ১০ হাজার ডলার কম।
সিআরইএর জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ শন ক্যাথার্ট বলেন, “বছরটি বিশৃঙ্খলভাবে শুরু হলেও এখন বাজারে কিছুটা স্থিতি এসেছে। তথ্যে বোঝা যাচ্ছে, আবাসন বাজারের পুনরুদ্ধার শুরু হতে আরও কয়েক মাস লাগবে। আমরা এখনও বিপদমুক্ত নই। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ নতুন শুল্কের হুমকি অর্থনীতির স্থিতিশীলতা এবং ক্রেতাদের আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
জুনে জাতীয়ভাবে বাড়ির গড় মূল্য আগের বছরের তুলনায় ১.৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৪৩ ডলারে। ওই মাসে সারাদেশে মোট ৪৭ হাজার ৮৭১টি বাড়ি বিক্রি হয়েছে, যা ২০২৪ সালের জুনের ৪৬ হাজার ২৩৭ ইউনিটের তুলনায় সামান্য বেশি। অর্থাৎ, বাজারে কিছুটা গতি ফিরলেও তা এখনও আগের অবস্থানের তুলনায় অনেক নিচে।
ভবিষ্যতের পূর্বাভাসে সিআরইএ জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাড়ি বিক্রি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। সেই বছরে বিক্রির হার ২০২৫ সালের তুলনায় প্রায় ৬.৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৪ লাখ ৯৯ হাজার ৮১ ইউনিটে পৌঁছাতে পারে। পাশাপাশি গড় বাড়ির মূল্যও প্রায় ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়াবে ৬ লাখ ৯৭ হাজার ৯২৯ ডলারে। অর্থাৎ, ২০২৬ সাল হতে পারে কানাডার আবাসন বাজারের পুনরুদ্ধারের সূচনা বছর।
বিশ্লেষকদের মতে, কানাডার আবাসন বাজার বর্তমানে এক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে। একদিকে ব্যাংক অফ কানাডা সুদের হার কিছুটা কমানোর ইঙ্গিত দিলেও ক্রেতাদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। বাড়তি ঋণখরচ, মুদ্রাস্ফীতি এবং মার্কিন শুল্কনীতি দেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলছে, যার প্রভাব দেখা যাচ্ছে রিয়েল এস্টেটে।
দেশের বিভিন্ন প্রদেশে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ভ্যাঙ্কুভার ও টরন্টোতে বিক্রিতে সামান্য বৃদ্ধি হলেও প্রেইরি অঞ্চল এবং আটলান্টিক কানাডার বাজারে মন্দা অব্যাহত। বিশেষ করে নতুন বাড়ি নির্মাণ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ কমে গেছে, কারণ নির্মাণ খরচ এবং সামগ্রীর দাম এখনও উচ্চ।
রিয়েল এস্টেট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাজারকে পুনরুজ্জীবিত করতে সরকারের প্রথমবারের মতো ক্রেতাদের জন্য কর রেয়াত, স্বল্পসুদে ঋণ, এবং নির্মাণ খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করার মতো পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায়, এই ধীরগতি দীর্ঘায়িত হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতির অন্যান্য খাতেও প্রভাব ফেলবে।
সব মিলিয়ে, কানাডার আবাসন বাজার এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে যেখানে পতনের ইঙ্গিতের মধ্যেও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দরকার স্থিতিশীল নীতি, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং ক্রেতাদের আস্থা ফিরিয়ে আনার দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
