
সাম্প্রতিক এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে অংশ নেওয়া কানাডার অর্ধেকেরও বেশি ভোটার মনে করেন, তারা যথেষ্ট তথ্য না পেয়েই ভোট দিয়েছেন। দেশের বিশাল অংশের নাগরিক জানিয়েছেন, প্রার্থীদের নীতি, অবস্থান ও স্থানীয় সমস্যাগুলো সম্পর্কে পর্যাপ্ত সংবাদ না থাকায় তারা ভোটের সিদ্ধান্ত নিতে বিভ্রান্ত ছিলেন।
ইপসস পরিচালিত এই জাতীয় সমীক্ষায় দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, নির্বাচনের সময় তাদের কাছে প্রার্থীদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য ছিল না অথবা ভোট দেওয়ার আগে আরও তথ্য জানা প্রয়োজন ছিল। অনেকেই স্বীকার করেছেন, তারা বাধ্য হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্যের ওপর নির্ভর করেছেন, যদিও সেখানে খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে।
সমীক্ষায় অংশ নেওয়া এক হাজার কানাডিয়ানের মধ্যে ১৪ শতাংশ বলেছেন, তারা মূলত ফেসবুক থেকে নির্বাচনী তথ্য পেয়েছেন। কিন্তু paradox হলো ফেসবুক ইতিমধ্যেই কানাডায় সংবাদ প্রকাশ নিষিদ্ধ করেছে, অর্থাৎ ওই প্ল্যাটফর্মে পাওয়া তথ্যে সাংবাদিক যাচাইয়ের সুযোগ ছিল না। ফলে বহু মানুষ আসল ও ভুয়া তথ্যের মিশ্রণে বিভ্রান্ত হয়েছেন।
এই গবেষণাটি ‘পাবলিক পলিসি ফোরাম’-এর উদ্যোগে পরিচালিত, যা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের সংকট ও তার সামাজিক প্রভাব নিয়ে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটি জানায়, স্থানীয় সংবাদপত্র ও সম্প্রচার মাধ্যমের ধারাবাহিক পতনের কারণে এখন অনেক কানাডিয়ানকে তথাকথিত “ডিজিটাল বিষাক্ত তথ্যের স্রোত”-এর মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষ বাস্তব ঘটনার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিকৃত উপস্থাপনায় বেশি প্রভাবিত হচ্ছেন।
প্রতিবেদনের লেখকদ্বয় টরন্টো স্টারের সাবেক কলামিস্ট টিম হারপার এবং ম্যাকলিন ম্যাগাজিনের সাবেক সম্পাদক অ্যালিসন আঙ্কেলস জানিয়েছেন, গণমাধ্যমের আর্থিক টেকসই ব্যবস্থা না থাকায় স্থানীয় সাংবাদিকতার ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। তাদের মতে, একটি নিরপেক্ষ ও স্থায়ী “নির্বাচন সংবাদ তহবিল” গঠন করা হলে সাংবাদিকরা স্বাধীনভাবে প্রার্থীদের কার্যক্রম ও নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করতে পারবেন, যা ভোটারদের সঠিক তথ্য দিতে সহায়ক হবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক নির্বাচনে স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত। অনেক প্রার্থী মিডিয়ার প্রশ্ন এড়িয়ে নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নিজেদের প্রচারণা চালিয়েছেন। এতে যাচাই-বাছাই করা তথ্যের পরিবর্তে একতরফা প্রচারই প্রাধান্য পেয়েছে। ফলস্বরূপ, ২০২৫ সালের নির্বাচনটি আধুনিক কানাডার ইতিহাসে সবচেয়ে কম সংবাদ কাভারেজ পাওয়া নির্বাচনে পরিণত হয়।
ইপসসের জ্যেষ্ঠ ভাইস প্রেসিডেন্ট শন সিম্পসন বলেন, “সমীক্ষা স্পষ্ট করে জানাচ্ছে—ভোটাররা তাদের স্থানীয় প্রার্থী, সমস্যা ও নীতিগত বিষয় নিয়ে জানতে চায়, কিন্তু সেই তথ্য তাদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। সংবাদ ঘাটতি গণতন্ত্রের জন্য বড় হুমকি।”
তিনি আরও জানান, যদি ভোটাররা স্থানীয় সংবাদ ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রার্থীদের সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পেতেন, তবে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতো।
সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ৭০ শতাংশ অংশগ্রহণকারী একমত হয়েছেন যে, স্থানীয় সংবাদে সহজ প্রবেশাধিকার থাকলে তারা আরও জ্ঞাত ও দায়িত্বশীল ভোটার হতে পারতেন। এর বিপরীতে এখন অধিকাংশ মানুষ জাতীয় বা অনলাইন সংবাদে নির্ভরশীল, যেখানে স্থানীয় ইস্যু বা প্রার্থীর বাস্তব কাজের বিশ্লেষণ প্রায় অনুপস্থিত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণমাধ্যমের আর্থিক সংকট, বিজ্ঞাপন রাজস্ব হ্রাস, এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নীতি সবকিছু মিলে কানাডার স্থানীয় সাংবাদিকতা অস্তিত্বসংকটে পড়েছে। এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে ভোটারদের জ্ঞাত সিদ্ধান্ত গ্রহণে।
অর্থাৎ, ২০২৫ সালের নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং গণমাধ্যমের দুর্বলতা ও তথ্যপ্রবাহের বৈষম্য কতটা প্রভাব ফেলতে পারে তার একটি বাস্তব উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম যদি পুনরুজ্জীবিত না হয়, তবে ভবিষ্যতের কানাডিয়ান ভোটাররা আরও অন্ধকার তথ্যশূন্যতায় হারিয়ে যাবেন এমন আশঙ্কাই এখন বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে।
