
উত্তর আমেরিকার দুই প্রতিবেশী দেশের বাণিজ্য সম্পর্কে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন নির্দেশে কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া পণ্যের ওপর ধারাবাহিকভাবে শুল্ক আরোপ ও সংশোধনের ঘোষণা দেশ দুটির অর্থনৈতিক সম্পর্কে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
২০২৫ সালের শুরু থেকেই হোয়াইট হাউস বাণিজ্যনীতিতে একাধিক কঠোর পদক্ষেপ নেয়, যা এখন কানাডিয়ান রপ্তানি খাতে গভীর প্রভাব ফেলছে। ট্রাম্প প্রশাসন শুধু কানাডাই নয়, আরও কয়েক ডজন দেশের ওপর শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে—কখনও তা বিলম্বিত করছে, কখনও পরিবর্তন করছে, আবার কখনও শুল্ক দ্বিগুণ করার হুমকি দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপ করা হবে। যুক্তি হিসেবে তিনি বলেন, এই দুই দেশ থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী ও মাদক প্রবেশ করছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশনসহ অন্যান্য সংস্থার তথ্য বলছে, ফেন্টানাইলসহ অধিকাংশ অবৈধ মাদক দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে আসে, উত্তর সীমান্ত থেকে নয়।
ফেব্রুয়ারিতে হোয়াইট হাউস এই নীতিটি আরও সুস্পষ্ট করে জানায় এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ কানাডিয়ান আমদানি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। তবে কানাডার জ্বালানি খাতকে কিছুটা ছাড় দেওয়া হয়—তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস এবং সংশ্লিষ্ট জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক নির্ধারণ করা হয় ১০ শতাংশ।
এক মাস বিলম্বের পর, মার্চের ৪ তারিখ থেকে এই নতুন শুল্ক কার্যকর হয়। কিন্তু মাত্র দুই দিন পরই যুক্তরাষ্ট্র সরকার একটি নির্বাহী সংশোধনী জারি করে জানায়, যেসব পণ্য উত্তর আমেরিকার মুক্তবাণিজ্য চুক্তি (সিইউএসএমএ)-এর শর্ত পূরণ করছে, সেগুলো শুল্কমুক্ত থাকবে। সিইউএসএমএ-এর আওতায় না পড়া পণ্যগুলোর মধ্যে পটাশ, সার এবং কিছু নির্মাণ উপকরণের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকে।
কানাডার শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান আরবিসি ইকোনমিকসের জুলাই মাসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মে মাস পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া কানাডিয়ান পণ্যের প্রায় ৯১ শতাংশ এখনো শুল্কমুক্তভাবে প্রবেশ করছে। তবে বাকি ৯ শতাংশ পণ্য—বিশেষত ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং শিল্পখাতে ব্যবহৃত তামাজাত সামগ্রী—উচ্চ শুল্কের আওতায় পড়েছে, যা কানাডিয়ান উৎপাদন শিল্পের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করছে।
প্রথম দফার শুল্কের পরপরই ট্রাম্প আরও এক ধাপ এগিয়ে যান। মার্চের ১২ তারিখ থেকে কানাডা থেকে আমদানি করা ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা কার্যকর হয়। এই সিদ্ধান্তের জেরে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডগ ফোর্ড ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে উত্তপ্ত বাকবিনিময় শুরু হয়। বিতর্কের মাঝেই ট্রাম্প হুমকি দেন, প্রয়োজনে তিনি ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের শুল্ক দ্বিগুণ করবেন। জুন মাসে প্রকাশ্য বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আমেরিকার শিল্পকে সুরক্ষিত রাখতে আমি বৈশ্বিকভাবে এই শুল্ক দ্বিগুণ করতে প্রস্তুত।”
এর পরপরই মার্চের শেষ সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরেকটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন, যার মাধ্যমে অটোমোবাইল ও অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করা হয়। হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, “বিদেশি গাড়ি আমদানি আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ,” তাই এই শুল্ককে প্রতিরক্ষা নীতির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সপ্তাহের শুরুতেই ট্রাম্প প্রশাসন নতুন এক নির্দেশ জারি করে জানায়, এখন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে তামার পাইপ ও বৈদ্যুতিক তার আমদানিতেও বৈশ্বিকভাবে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এই পদক্ষেপ সরাসরি কানাডা, মেক্সিকো এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দেশের ওপর প্রভাব ফেলবে, কারণ উত্তর আমেরিকার তামা আমদানির বড় অংশই আসে এই দেশগুলো থেকে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, এসব শুল্ক সিদ্ধান্ত শুধু বাণিজ্যিক নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও গৃহীত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতিকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ শিল্পকে সুরক্ষিত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনরায় জোরদার করছেন, তবে এর মূল্য দিতে হচ্ছে প্রতিবেশী কানাডাকে।
কানাডার ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো বলছে, শুল্ক আরোপের ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, বাজারে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে এবং চাকরির ওপরও চাপ পড়বে। বিশেষ করে অন্টারিও, আলবার্টা এবং কুইবেকের উৎপাদন খাত এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অর্থাৎ, উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক এখন নতুন করে ঝুঁকির মুখে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই ধারাবাহিক শুল্ক আরোপ শুধু কানাডার রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকেই ব্যাহত করছে না, বরং দীর্ঘদিনের পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতামূলক অর্থনৈতিক সম্পর্কেও তৈরি করছে গভীর অনিশ্চয়তা।
