কানাডায় স্বাস্থ্যকর খাদ্য নীতিমালা অনুসরণের খরচ চড়া

লবণ ও চিনির আধিক্য আছে কানাডিয়ানদের তাকে শোভা পাওয়া এমন খাদ্য সমপরিমাণ স্বাস্থ্যকর খাদ্যের চেয়ে অনেক বেশি সাশ্রয়ী লাভাল ইউনির্ভাসিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই উঠে এসেছে

কানাডায় পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যপণ্য দিন দিন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর বিপরীতে, লবণ ও চিনিসমৃদ্ধ প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো হচ্ছে আরও বেশি সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী। লাভাল ইউনিভার্সিটির সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এমনই এক বাস্তব চিত্র, যা কানাডার স্বাস্থ্য বৈষম্যের গভীর সংকেত দিচ্ছে।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন লাভাল ইউনিভার্সিটির গবেষক ইসাবেল পেটিটক্লার্ক। তিনি জানান, “খাবারের উচ্চমূল্য এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি স্বাস্থ্য বৈষম্যেরও মূল কারণ হয়ে উঠছে। আমাদের গবেষণার ফলাফল রাজনৈতিক পর্যায়ে অর্থবহ নীতিগত পরিবর্তনের অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে বলে আশা করি।”

- Advertisement -

পেটিটক্লার্ক আরও বলেন, “যাদের ক্রয়ক্ষমতা আছে তারা হয়তো একটু বেশি ব্যয় করে পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে পারবেন। কিন্তু আমাদের সমাজে এমন অনেকেই আছেন, যাদের জন্য এটি একেবারেই সম্ভব নয়। ফলস্বরূপ, তারা বাধ্য হচ্ছেন কমদামি কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করতে।”

গবেষণার ফলাফল ২০২৫ সালের আগস্টে ‘পাবলিক হেলথ নিউট্রিশন’ জার্নালে প্রকাশিত হয়। গবেষক দলটি হেলথ কানাডা-র পুষ্টি লেবেল মানদণ্ড ব্যবহার করে দুই হাজারেরও বেশি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন কোন পণ্যগুলো বেশি সাশ্রয়ী এবং কোনগুলো পুষ্টিকর।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ছিল পাঁচ শ্রেণির জনপ্রিয় প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য – ব্রেকফাস্ট সিরিয়াল, স্ন্যাক ফুড, প্রক্রিয়াজাত পনির, কুকিজ এবং ক্র্যাকার।

গবেষণায় দেখা যায়, এই সব শ্রেণির অধিকাংশ খাবারেই চিনি ও লবণের মাত্রা অত্যধিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অস্বাস্থ্যকর উপাদানসমৃদ্ধ পণ্যগুলোর দাম তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফলে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো স্বাভাবিকভাবেই এই খাবারগুলোর দিকেই ঝুঁকছে।

গবেষণায় আরেকটি আকর্ষণীয় তথ্য উঠে এসেছে – অস্বাস্থ্যকর খাদ্যের মধ্যে “স্যাচুরেটেড ফ্যাট”-সমৃদ্ধ পণ্যগুলো তুলনামূলকভাবে বেশি দামি। কারণ এই ফ্যাট সাধারণত বাটার ও নারকেল তেলের মতো উপকরণে পাওয়া যায়, যেগুলোর বাজারমূল্য বেশি। ফলে, স্যাচুরেটেড ফ্যাটযুক্ত খাবারগুলো সস্তা হলেও চিনি ও লবণের মতো নয়, বরং ব্যয়সাপেক্ষ।

স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় হেলথ কানাডা আগামী বছর থেকে নতুন এক নীতিমালা কার্যকর করতে যাচ্ছে। এই নীতিমালার আওতায়, যেসব খাদ্যে উচ্চমাত্রায় চিনি, লবণ বা স্যাচুরেটেড ফ্যাট রয়েছে, সেগুলোর প্যাকেটে স্পষ্টভাবে “হাই-ইন” (High-in) সতর্কবার্তা লেবেল দিতে হবে।

এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য কানাডিয়ান ভোক্তাদের সচেতন করা এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে উৎসাহিত করা। কারণ গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, এসব উপাদান অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে স্থূলতা, হৃদরোগ এবং টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।

ইতিমধ্যে কানাডার বিভিন্ন গ্রোসারি স্টোরে কিছু পণ্যে এই নতুন সতর্কবার্তা লেবেল দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের খাদ্যাভ্যাসে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, যদিও নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যকর বিকল্প তৈরি করাও সমান জরুরি।

এই গবেষণা কানাডার খাদ্যনীতি ও সামাজিক বাস্তবতার এক গভীর বৈষম্যের প্রতিফলন। যেখানে পুষ্টিকর খাবার বিলাসপণ্য হয়ে উঠছে, সেখানে চিনি-লবণসমৃদ্ধ খাবার ছড়িয়ে পড়ছে প্রতিটি পরিবারের টেবিলে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবলমাত্র সতর্কবার্তা বা লেবেলই যথেষ্ট নয়। সরকারকে এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে যা পুষ্টিকর খাবারকে সাশ্রয়ী করে তুলবে এবং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য স্বাস্থ্যকর বিকল্পের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

অন্যথায়, কানাডার সমাজে “স্বাস্থ্য হবে ধনীদের অধিকার” এমন একটি বাস্তবতা অচিরেই স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

- Advertisement -

Read More

Recent