
২০২৬ সালে প্রবেশের মুখে কানাডার অর্থনীতি ও মুদ্রানীতিকে ঘিরে ভিন্ন ভিন্ন প্রত্যাশা প্রকাশ করেছে দেশটির বৃহৎ ছয়টি ব্যাংক। বিশেষ করে সুদের হার কোন দিকে যাবে এই প্রশ্নে ব্যাংকগুলোর অর্থনীতিবিদদের মতামতে স্পষ্ট বিভাজন দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে নতুন বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অব কানাডার সামনে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি, বৈশ্বিক বাণিজ্য অনিশ্চয়তা, দুর্বল উৎপাদনশীলতা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধীর গতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন তারা।
ব্যাংক অব কানাডা সর্বশেষ ১০ ডিসেম্বর নীতিনির্ধারণী সুদের হার সংক্রান্ত ঘোষণা দেয়। ওই ঘোষণায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার ২ দশমিক ২৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখে। এর আগে ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় চার দফায় সুদের হার কমানো হয়েছিল।
বৃহৎ ছয়টি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদদের মধ্যে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, সুদের হার নিয়ে তাদের প্রত্যাশা একেবারেই একরকম নয়। জরিপে অংশ নেওয়া ছয় ব্যাংকের মধ্যে দুইটি ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ২০২৬ সালে সুদের হার বাড়তে পারে। একজন অর্থনীতিবিদ সুদের হার কমানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। আর বাকি অর্থনীতিবিদদের ধারণা, ব্যাংক অব কানাডার গভর্নর টিফ ম্যাকক্লেম পুরো বছরই ‘আটোসাঁটো’ বা সতর্ক অবস্থান বজায় রাখবেন এবং সুদের হারে বড় কোনো পরিবর্তন আনবেন না।
বিএমও (ব্যাংক অব মন্ট্রিয়াল) তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে নরম অবস্থান নিয়েছে। ব্যাংকটির প্রত্যাশা, সুদের হার মোটামুটি ২ শতাংশ বা তার চেয়েও কমানো হতে পারে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, নীতিনির্ধারণী সুদের হার নেমে আসতে পারে ১ দশমিক ৭ শতাংশে। বিএমও গ্লোবাল অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ফিক্সড ইনকাম অ্যান্ড মানি মার্কেটস বিভাগের প্রধান আর্ল ডেভিস বিএনএন ব্লুমবার্গকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই পূর্বাভাসের কথা জানান।
অন্যদিকে স্কশিয়াব্যাংকের দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন। ব্যাংকটির ধারণা, ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ব্যাংক অব কানাডা নীতিনির্ধারণী সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমাতে পারে। এতে সুদের হার দাঁড়াবে ২ দশমিক ৭৫ শতাংশে, যা তারা ‘নিউট্রাল রেঞ্জ’-এর মাঝামাঝি বলে মনে করছে। স্কশিয়াব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাঁ-ফ্রাসোয়া পেরো বিএনএন ব্লুমবার্গকে জানিয়েছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির ভারসাম্য রক্ষায় এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
ন্যাশনাল ব্যাংক আবার আরও কড়াকড়ি অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। ব্যাংকটির মতে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে সুদের হার ৫০ বেসিস পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগে ন্যাশনাল ব্যাংক ২০২৭ সালে সুদের হার বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছিল। অর্থাৎ তারা এখন সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনাকে এক বছর এগিয়ে এনেছে।
সিআইবিসির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যাংক অব কানাডা পুরো ২০২৬ সালজুড়ে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখতেও পারে। তবে ব্যাংকটির প্রধান অর্থনীতিবিদ আভেরি শেনফেল্ডের মত হলো, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সুদের হার আরও কিছুটা কমানো উচিত। তিনি এ বিষয়ে বিএনএন ব্লুমবার্গকে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের নর্থ আমেরিকান ফরেন এক্সচেঞ্জ স্ট্র্যাটেজির প্রধান জেসন ড-ও একই ধরনের মত দিয়েছেন। তার মতে, ২০২৬ সালে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি।
সবশেষে টিডি ব্যাংকও ধারণা করছে, ২০২৬ সাল জুড়েই ব্যাংক অব কানাডা সুদের হার অপরিবর্তিত রাখবে। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় কোনো ঝুঁকি নিতে চাইবে না।
সব মিলিয়ে বলা যায়, ২০২৬ সালে কানাডার মুদ্রানীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। সুদের হার বাড়বে, কমবে না কি অপরিবর্তিত থাকবে এই প্রশ্নের উত্তর অনেকটাই নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতির গতিপথ, বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো কীভাবে সামনে আসে তার ওপর।
