মায়ের মৃত্যু ও কৃতজ্ঞতার হাস্নাহেনা

আমার জীবনে মহা শোকানুভুতির দিন পেরিয়ে গেলো আমার মা চলে গেলেন না ফেরার দেশে

নজরুল তাঁর ‘যদি আর বাঁশী না বাজে’ গদ্যে কাব্যময় ভাষণ দিয়েছিলেন। <রবীন্দ্রনাথ আমায় প্রায়ই বলতেন, “দেখ উন্মাদ তোর জীবনে শেলীর মত, কীটসের মত খুব বড় একটা ট্র্যাজেডি আছে -তুই প্রস্তুত হ”, -জীবনের সেই ট্র্যাজেডি দেখবার জন্য আমি কতদিন অকারণে অন্যের জীবনকে অশ্রুর পরশায় আচ্ছন্ন করে দিয়েছি। কিন্তু আমারই জীবন রয়ে গেল বিশুষ্ক মরুভূমির মত তপ্ত মেঘের উর্দ্ধে শুন্যের মতো, কেবল হাসি কেবল গান কেবল বিদ্রোহ।

আমার জীবনে মহা শোকানুভুতির দিন পেরিয়ে গেলো। আমার মা চলে গেলেন ‘না ফেরার দেশে’। এইতো.. এই মঙ্গলবারে ( ১৭ মে ২০১৬)। বারো হাজার কিলোমিটার দূরে আমাকে কোনো বার্তা না দিয়েই। ট্র্যাজেডির শুরুটা এখানে নয়। সাত বছর আগে বাবাও চলে গিয়েছিলেন এমনি করে। আমার সাথে দেখা হয়নি। বারো হাজার কিলোমিটার দূরে বসে শুধু অসহায় দুবোনের কান্না শুনেছি। মা তখন বেঁচেছিলেন। শক্ত গলায় আমাকে শক্ত হতে বলেছিলেন। এবার আর বলার কেউ নেই। তাই শক্ত থাকাও সম্ভব হয়নি। তবে ভেঙ্গে পড়া এ মানুষটাকে দাঁড় করাতে হাস্নাহেনা ফুটিয়েছিলেন টরন্টো ও মন্ট্রিয়লের কজন মহাপুরুষ। আমি প্রানভরে সেই হাস্নাহেনার গন্ধ উপভোগ করেছি। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা আমি হারিয়ে ফেলেছি।

- Advertisement -

হুইটবির রোড কনস্ট্রাকশন সাইটে বসে খবরটা পাই। বাড়ি থেকে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার পথ। ফিরতে হবে কানাডার সবচে’ ব্যস্ত হাইওয়ে 401 দিয়ে। ডিভিশনাল ম্যানেজার তাৎক্ষনিক ছুটি অনুমোদন করলেন। কিন্তু ভয় পাচ্ছিলেন নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবো কিনা। ড্রাইভ করতে নিষেধ করলেন। ‘ভন’ অফিস থেকে লোক পাঠাতে চাইলেন। আমার দুই হাঁটু ততক্ষণে ভাঁজ হয়ে গেছে। শরীরের ওজন বইতে এদের কষ্ট হচ্ছে। হাতখানা কোনরকমে ফোনটাকে কানে তুলে রেখেছে। লোনা জলে সারা মুখ ভেজা। বাকরুদ্ধ কন্ঠে তবু বললাম, লাগবেনা। একাই বাড়ি ফিরবো।

আমি ঘরে ঢোকার আগেই সংবাদ পেয়ে বাসায় পৌঁছে গেছেন চিত্রশিল্পী নুর জালালী ও সুরাইয়া ভাবি। থর্নক্লিফ ও ফ্লেমিংডন পার্কের বাঙালিদের বিপদ আপদে সবার আগে ছোটেন তাঁরা। কিছুক্ষণ পরেই আসেন কবি শিবলী সাদিক, মৌ ভাবি এবং তাঁর মা (আমাদের প্রিয় খালাম্মা)। মায়ের মমতায় আমাকে কাছে টেনে নেন তিনি। একে একে আসেন নাসির ভাই, পারভীন ভাবি, অনুজপ্রতিম সালাউদ্দিন আফরোজ ও তাঁর স্ত্রী লাকি এবং আরো কজন বাঙালি প্রতিবেশি।

এরি মধ্যে ফোন। ফোনের পর ফোন। সবগুলিই মিস করেছি। বেশ কজন শোক জানিয়ে ভয়েস মেসেজ রেখেছেন। প্রথম মেসেজটি অসম্ভব দরদি কন্ঠে যিনি রেখেছেন, তিনি আর কেউ নন, এন.আর.বি টিভির চেয়ারম্যান ও বাংলা মেইল পত্রিকার সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি Abdul Halim Miah। আমাদের প্রিয় হালিম ভাই। মেসেজ শেষ করেই কলব্যাক করলাম। আবারো সেই মিষ্টি কন্ঠ। শান্তনার ভাষা বুঝি এমনই হয়। এতো ব্যস্ততার মাঝেও ছুটে আসতে চাইলেন। এখানেই শেষ নয়। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে সংবাদটি তিনিই প্রথম সবাইকে জানান। তাঁর স্ট্যাটাসেই পুরো টরন্টো-মন্ট্রিয়ল আমার পাশে দাঁড়ায়। লাইক-কমেন্ট দিয়ে মায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি এবং পরকালে তাঁর বেহেশত কামনা করেন প্রায় শ’খানেক মানুষ।

হালিম ভাইয়ের সাথে কথা শেষ না হতেই Shahidul Islam Mintu মিন্টু ভাইয়ের ফোন। শহিদুল ইসলাম মিন্টু। এন.আর.বি টিভির প্রধান নির্বাহী এবং বাংলা মেইল পত্রিকার সম্পাদক। পরম মমতায় শক্ত হতে বললেন। বললেন, পাশে আছি। সব সময় পাশে থাকবো। ফোনে কথা বলছিলাম। তবু মনে হলো কাঁধে হাত রেখে মিন্টু ভাই বলছেন, …এইতো আছি, আমরা সবাই আছি।

ফেসবুক থেকে খবর পেয়ে ফোন দিলেন এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ার্স অন্টারিও’র পরিচালক (প্রশাসন) এবং KUET এলামনাই এসোসিয়েশন অব কানাডার জেনারেল সেক্রেটারি প্রকৌশলী নওশের আলী Nowsher Ali ভাই। অফিস শেষে বাড়ি না ফিরে সরাসরি আমায় দেখতে এলেন। পরেও একাধিকবার খবর নিয়েছেন। KUET ইয়াহু গ্রুপে ইমেইল করে সবাইকে জানিয়েছেন।

রবীন্দ্র গবেষক ও কথা সাহিত্যিক সাদ কামালী। প্রিয় সাদী ভাই। লাজুল আপাকে সাথে নিয়ে এলেন। পরম স্নেহে জড়িয়ে ধরে শান্তনা দিলেন। সুদুর সাসকাচুয়ান থেকে পাশে দাঁড়িয়ে শান্তনা দিতে না পেরে KUET এলামনাই এসোসিয়েশন অব কানাডার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ ফারুক হোসেন তাৎক্ষনিক বাংলাদেশ যাবার টিকেট দিতে চাইলেন।

মন্ট্রিয়ল থেকে কানাডা বাংলাদেশ সলিডারিটির সভাপতি ও বাংলাদেশ ছাত্রমৈত্রীর কেন্দ্রীয় সাবেক সভাপতি জিয়াউল হক জিয়া এবং বাংলাদেশ রাইটার্স ও জার্নালিস্ট ফোরামের সেক্রেটারি শামসাদ রানা বারবার ফোন করে খবর নিয়েছেন। ফেসবুকে মেসেজ দিয়ে সান্তনা আর অবারিত সাহায্যের হাত বাড়াতে চাইলেন একুশে টিভির তানভীর ইউসুফ রনী ভাই Mohammed Youssef।

খবর নিয়েছেন কানাডার রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আবুল হক বাবলু ভাই। অফিস শেষে শরীর খারাপ অবস্থাতেও আমাকে দেখতে এলেন শিল্পী বাবুন ভাই ও কুমু আপা। অটোয়া থেকে সান্তনা জানাতে ফোন করলেন জামি ভাই ও কানিজ ভাবি।

আমার মা চলে গেছেন উইকডেতে। দিনের বেলা সবাই অফিসে। সন্ধ্যা নামতেই KUET’র সহপাঠিরা আসতে শুরু করে। সালাহউদ্দিন শৈবাল, মিজানুর রহমান রুমেন, বিপ্লব কর্মকার, আবু সাইদ, ইলিয়াস ইউসুফ, একেএম মনিরুজ্জামান মনির সবাই এসেছে সপরিবারে, অথবা ইমেইল ও ফোন করে দোয়া ও সান্তনা জানিয়েছে। KUET’র সিনিয়র প্রকৌশলীরা ফোন ও ইমেইল দিয়ে আমার মায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।

‘সন্তানের কাছে মায়ের কোনো মৃত্যু নেই। মা বেঁচে থাকেন সন্তানের হৃদয়ে।’ -এই আপ্ত বাক্য বলে আমার শোককে শক্তিতে পরিনত করেছেন শ্যামল দা। Shyamal Das দাদা বলছিলেন তাঁর মা মারা গেছেন বেশ ক’বছর আগে। তবু আজো মাকে প্রনাম করেই তিনি ঘর থেকে বের হন।

যে মানুষটি নীরবে নিভৃতে সহোদরের মতো গুমরে কেঁদেছেন তিনি বাবু ভাই। কাজী আলম বাবু। Kazi Alam Babu বাংলা মেইল পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। আমার ব্যথায় যিনি হয়েছেন সমব্যাথিত।

আমাকে ঘিরে চারিদিকে এতো মানুষ, এতো হাস্নাহেনার সুবাস, কৃতজ্ঞতা রাখিবো কোথায়?

- Advertisement -

Read More

Recent