রোড টু মন্ট্রিয়লঃ মন্ট্রিয়লের কাজী আলম বাবু

অগ্রজ প্রতিম কাজী আলম বাবুর রোড টু মন্ট্রিয়ল পড়তে গিয়ে কেনো জানি এ ছবিটার কথা মনে পড়ছিলো

এই লেখায় যে ছবিটি দেখছেন সেটা মন্ট্রিয়লের সেন্ট লরিয়ে বলিভার্ড এলাকার। একটি ফেস্টিভ্যাল চলাকালনি ছবিটি তোলা হয়। মন্ট্রিয়লে প্রায় এক যুগ বসবাস করেছি । প্রিয় বন্ধু, সাংবাদিক কাজী আলম বাবুর সঙ্গে বন্ধুত্বও দীর্ঘদিনের। আমাদের আড্ডা আর স্মৃতি ঘিরেই আছে এই জায়গাটি। বিখ্যাত মুরাল শিল্পীর আকা এসব। ভুমিকায় কেনো এতা কিছু বলছি? কারণ বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘দি জার্নি’ দেখার আগে কেউ কি ভেবেছিলেন এটি হাঙ্গেরিয়ান বিপ্লবের উপর নির্মিত? ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরি বিপ্লবের সময় বুদাপেস্ট এয়ারপোর্ট হঠাৎ বন্ধ করে দেয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশ ক’টি দেশের পর্যটক আটকা পড়ে যান হাঙ্গেরিতে। ছবির নায়িকা ডেবোরাহ এশমোর যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের কজন নাগরিককে নিয়ে রওনা হন ভিয়েনা। ইউরোপের দ্বার খ্যাত এ শহরে যেতে তাঁরা বেছে নেন মুড়ির টিন বাস। শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর ‘জার্নি’। পালাও পালাও! কিন্তু হাঙ্গেরি-অস্ট্রিয়া বর্ডারে বিশাল বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সোভিয়েত সেনাকর্তা মেজর সুরোভ।

মন্ট্রিয়লের পরিচিত মুখ সাংবাদিক, অগ্রজ প্রতিম কাজী আলম বাবুর ‘রোড টু মন্ট্রিয়ল’ পড়তে গিয়ে কেনো জানি এ ছবিটার কথা মনে পড়ছিলো। তাঁর এ বইটি মন্ট্রিয়ল, কানাডার ক্রীড়ি জগৎ, অভিবাসী জীবন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কানাডা-বাংলাদেশের ক্রীড়াকুশলীদের এগিয়ে যাওয়ার সনিপুণ বর্ণনা । ‘দি জার্নি’র মতো নাম দেখে প্রথমে তা মনে হয়নি। ‘দি জার্নি’র সাথে আরেকটি মিল পাওয়া যায় বর্ডারের বিভিন্ন ঘটনায়। বিশেষ করে যখন টরন্টোর ব্লু জেস, কানাডা টীম কিংবা ভারতের হরিদাসপুর বর্ডারে সাফগেমস দল পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের হাতে নাকাল হয়। অথবা মালয়েশিয়ান এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশনকর্তারা পাসপোর্ট দেখে সন্দেহের লাল চোখে। কিংবা ব্যাংকক এয়ারপোর্টে সিগারেটে আগুন ধরাতে লাক্সারী বাস ছেড়ে যাওয়ার টেনশন!

- Advertisement -

আশ্চর্য দক্ষতায় কাজী আলম বাবু তাঁর ক্রীড়া বিষয়ক বইটিকে রোমাঞ্চকর ভ্রমন উপাখ্যানে পরিণত করেছেন। আশির দশকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া অঙ্গনে বাংলাদেশ যখন হাসির পাত্র সেই চরম দুঃসময়ে বন্ধুর মতো বাংলাদেশের দলের সাথে ছিলেন তিনি। তরুণ বয়সে প্রত্যক্ষ করেছেন বাংলাদেশের সকরুণ ব্যর্থতা। আবার সামান্য সাফল্যে আনন্দে উদ্বেলিত হয়েছেন দলের সাথে। কানাডায় অভিবাসী হবার পর খুই কাছে থেকে দেখেছেন কানাডার ক্রীড়াঙ্গন। দেখেছেন কানাডার রাজনীতি ও সাংবাদিকতা। এসরেই সুনিপুন চিত্র এঁকেছেন ‘রোড টু মন্ট্রিয়ল’ বইয়ে।

জনপ্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দি রয়েল পাবলিশার্স প্রকাশিত এ বইয়ে রাজনৈতিক দলাদলির প্রসঙ্গ এসেছে। রাজনৈতিক কারণে সরকারি সফরে বিমান টিকেট পাননি। সে এক মজার গল্প। ভলিবল ফেডারেশন ব্যাংককে থাকা খাওয়ার সুব্যবস্থা করে দেয় বিপরীত রাজনৈতিক ভাবনার দুই পত্রিকার দুই সাংবাদিকের। মজার এ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লেখক কাজী আলম বাবু বারবার উল্লেখ করেছেন  সাংবাদিক বন্ধু সোহাগের কথা।

সাংবাদিক সমাজের ব্যক্তিগত খাট্টা তামাশার কথা বলেছেন এ বইয়ে। ডেইলি নিউ নেশনের সাংবাদিক আফজাল খান টিভিতে ইংরেজি সংবাদ পড়তেন। বিটিভি তখন দেশের সবেধন নীলমনি একমাত্র টেলিভিশন। এরই কল্যানে দেশের প্রায় সব মানুষ চেনে আফজাল খানকে। চলাফেরায় তারকা তারকা ভাব। চেইন স্মোকার। বেনসন তাঁর প্রিয় ব্র্যান্ড। একদিন ধরা খেলেন। বাংলাদেশ দলের সাথে বাসে করে যাচ্ছিলেন কোলকাতা। একই দলে ছিলেন সাংবাদিক কাজী আলম বাবু। বর্ডারে বাস দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময়। ধুমপান চলছে। কাজী আলম বাবু সিগারেট চাইলেন আফজাল খানের কাছে। খান সাহেব খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত। ভাবছেন, দেবেন কি দেবেন না। অনেকটা জোর করেই বেনসনের প্যাকেটটা হাতিয়ে নিলেন কাজী আলম বাবু। প্যাকেট খুললেন তিনি। ওমা, একি! এতো বগলা সিগারেট। তাই দেখে সবার মধ্যে হাসির রোল।

মন্ট্রিয়লের বিশিষ্ট সাংবাদিক কাজী আলম বাবুর হাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মারজারি মিশেলের পাঠানো সম্মাননাপত্র তুলে দেন তার অফিস উপদেষ্টা মাইনুর

ক্রীড়াঙ্গনের অনেক রথী মহারথীর কালো দিক উন্মোচিত হয়েছে তাঁর লেখায়। কোলকাতার হোটেল থেকে বেড়িয়ে সোনাগাছির পতিতা পল্লীতে বেরসিক পুলিশের হাতে ধরা খেয়েছেন বিখ্যাত খেলোয়াড় ও কর্মকর্তা। আবার দোষ না করে চুরির অভিযোগে এয়ারপোর্টে জিজ্ঞাসাবাদের কবলে পড়েছেন বাংলাদেশ ক্রীড়া দলের সাথে আসা বিখ্যাত শিক্ষাবিদ। ভিকারুন্নেসা স্কুলের অধ্যক্ষা হামিদা আলীকে বেইজিং হোটেলে তোয়ালে চুরির কারণে সাংহাই এয়ারপোর্টে হেনস্থা করা হয়। পরদিন বেশকটি জাতীয় দৈনিকে ফলাও করে হামিদা আলীর ঘটনাটিকে চুরি হিসাবেই প্রচার করা হয়।

ঢাকা ও কোলকাতার মূল পত্রিকাগুলো একই ভাষায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত। অর্থাৎ বাংলা ভাষায় রচিত। কাজী আলম বাবু দুই দেশের অভিন্ন ভাষায় লেখা পত্রিকাগুলোর গুনগত পার্থক্য তুলে ধরেছেন। পিটি উষার মতো এথলেটকে নিয়ে কীরকম নোংরা ভাষায় হেডিং হতে পারে তা কল্পনাও করা যায়না। কোলকাতার প্রভাবশালী দৈনিক বর্তমান শিরোনাম করেছিলো ‘কোচ নাম্বিয়ার সারারাত উষার ঘরে কি করলেন?’ কেরালার মেয়ে পিটি উষা ভারতের এযাবত কালের সেরা এথলেট। আমাদের দেশের কোনো এথলেটকে নিয়ে এমন শিরোনাম ঢাকার পত্রিকায় অসম্ভব। অথচ দেশের অনেক বুদ্ধিজীবি (?) কোলকাতার পত্রিকাকে আমাদের চেয়ে সেরা মনে করেন!

খেলাধুলার বইয়ে প্রেম রোমান্স থাকেনা। এ বইয়ের লেখক সে পর্বটিও রেখেছেন। ১৯৮৭ সালে সাফ গেমস কাভার করতে কোলকাতা গিয়েছিলেন। সেবার কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুন্দরী ছাত্রীদের নিয়ে গঠিত হয়েছিলো মিডিয়া সেন্টার। ওদের দায়িত্ব ছিলো দেশ বিদেশের সাংবাদিকদের সহায়তা করা। কাজের সুত্রে এদেরই একজনের সাথে পরিচিত হন লেখক। নাম শ্বাসতি দাস গুপ্তা। পেশাগত দায়িত্ব পালনে সম্পর্ক যেটুকু হবার সেটুকুই ছিলো। তবু বয়স বলে কথা! সাংবাদিক হলেও লেখক তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগে মাস্টার্সের ছাত্র মাত্র। আর শ্বাসতি কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। দু’নয়নে অশ্রু নিয়ে গোলাপ হাতে দাঁড়িয়ে বিদায়…….., থাক এ অংশটুকু পাঠকরা মূল বই থেকেই পড়ে নেবেন।

কোলকাতা থেকে শুরু করে দিল্লি, কুয়ালালামপুর, ব্যাংকক, সিউল, বেইজিং, সাংহাই, হংকং, টরন্টো, ক্যালগেরি, অটোয়া, রেজিনা, মিসিসাগা, ভ্যানকুভার হয়ে প্রায় কুড়িটি দেশের বিভিন্ন নগরী ঘুরে কানাডার মন্ট্রিয়ল এসে থেমেছে বইয়ের কাহিনী। টেনিস সম্রাট আন্দ্রে আগাসির সাক্ষ্যাতকারের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে এটি। এ সাক্ষ্যাতকারের আগে কেউ কি জানতো ফারিয়া নামের এক বাংলাদেশী প্রেমিকা ছিলো আন্দ্রে আগাসির?

টরন্টোর আরেক বরেণ্য শিল্পী, আন্তর্জাতিক ক্যাতি সম্পন্নচিত্রশিল্পী সৈয়দ ইকবালের ঝকঝকে প্রচ্ছদে আঁকা এ বইটির একটি ঘটনা  স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আসপু’র  সদস্যপদ প্রাপ্তির মাধ্যমে দেশপ্রেমের যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত লেখক দেখিয়েছেন তা এদেশের মানুষ মনে রাখবে চিরদিন। ক্রীড়া সাংবাদিকতার আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে এই ধরনের বই অবশ্যই উল্লেখযোগ্য মাত্রা যোগ করবে !

কাজী আলম বাবুর মন্ট্রিয়ল জীবন প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে। মন্ট্রিয়ল জীবনে তার প্রাপ্তি অনেক। স্থানীয় কমিউনিটিতে তিনি জনপ্রিয় মুখ। তার লেখনি আগামী প্রজন্মকে জানতে সাহায্য করবে দুই যগ আগের একজন অভিবাসী কীভাবে এখানে নিজের কাজ দিয়ে অপরিহার্য হয়ে উঠেছিলেন।

- Advertisement -

Read More

Recent