
টানা কয়েকদিনের শীত এবং ক্রমাগত তুষারপাতে এমনিতেই টরন্টোর জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রচুর বাসিন্দা বাড়ি থেকে বের হতে পারেননি, যখন তুষারপাতের মাত্রা ১৫-২০ সেন্টিমিটার হয়ে যায়। কাজের যাবার ক্ষেত্রেও দেখা দেয় প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু এই ভোগান্তির মাঝেও থাকে আনন্দ। পরিবেশের এই পালাবদল কানাডার আবহাওয়া গতি প্রকৃতিতে একটা স্বাভাবিক ঘটনা বটে। ডাউন টাউনের বাসিন্দা নাজ হাজরা মজা করে টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, কানাডায় আছি অথচ স্নো কিংবা ঠান্ডা থাকবে না সেটা কী করে হয়!
এই প্রতিবেদক প্রবল এই শীতেও গ্রেটার টরন্টোর বিভিন্ন জলাধারে ওঠানামা করতে দেখেন প্রচুর বাসিন্দাদের। এদের মধ্যে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি। টরন্টোর একজন বাংলাদেশি পরিবেশবাদী কর্মী লিটা করিম বললেন, জলাধারের ওপর যত্রতত্র ঘুরে বেড়ানোটা আমি বিপদজনক মনে করি। জলাধারে ওঠানামা করা যে কতটা প্রাণঘাতী হতে পারে সেটা কল্পনাতীত। লিটা উল্লেখ করে যে, হারবারফ্রন্ট এলাকায় শনিবার বিকেলে বরফের ওপর হাঁটতে গিয়ে ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর বরফ ভেঙে পানিতে পড়ে যায়। সৌভাগ্যক্রমে স্থানীয় এক ব্যক্তি দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে উদ্ধার করেন। লিটা বলেন, এই বিষয়টিকে হালকা ভাবে দেখার সুযোগ নেই। আমাদের সচেতনতা আরো বাড়ানো জরুরী বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এই প্রতিবেদক একটু বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন যে, দুর্ঘটনাটি ঘটে সন্ধ্যার দিকে, যখন টরন্টোর হারবারফ্রন্টে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ জমে থাকা বরফের ওপর হাঁটছিলেন। একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাহায্যের জন্য চিৎকার শুনে দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। দৌড়ে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে তাদের কাছে পৌঁছাই। তারপর কাঁধে তুলে বরফের ভেতর থেকে বের করে আনতে সক্ষম হন। ঘটনার পর অবশ্য জরুরি সেবা কর্মীরা কিশোরটির প্রাথমিক চিকিৎসা দেন। পুলিশ জানায়, চিকিৎসার পর সে বাড়ি ফিরতে পেরেছে। উল্লেখ্য যে, বরফে পড়ে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত নেমে যেতে পারে, যা প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। জানা যায়, এটি গত কয়েক দিনের মধ্যে দ্বিতীয় অনুরূপ ঘটনা। শুক্রবারও একজন ব্যক্তি বরফের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন।
লোকজনকে বরফ থেকে দূরে রাখতে তারা বিপুল প্রচারণা চালাচ্ছে টরন্টো পুলিশ। এমন কোনো পরিস্থিতিতে নিজেদেরকে ফেলতে বারন করেছেন, যা প্রয়োজন নেই। অনেক বাসিন্দার ধারণা নেই যে, বরফের পুরুত্ব দেখে নিরাপদ মনে হলেও নিচের স্তর দুর্বল থাকতে পারে, বিশেষ করে যেখানে ফায়ার বোট নিয়মিত বরফ ভেঙে চলাচল করে।
শনিবার প্রায় ২০০ জন মানুষ হারবারফ্রন্টের জমে যাওয়া জলাধারের ওপর অবস্থান করছিলেন। অনেকেই হাঁটছিলেন সেই জায়গায়, যেখানে নিয়মিত বরফ ভাঙা হয়। ফলে বরফের স্তর অসম ও অনিরাপদ হয়ে পড়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাবে। এতে বরফ আরও দুর্বল হয়ে পড়বে এবং পরিস্থিতি অনিশ্চিত হবে। পুলিশ সতর্ক করে বলেছে, কেউ যদি বরফের ফাটলে পড়ে যায়, তাহলে জীবন ও মৃত্যুর ব্যবধান হতে পারে মাত্র কয়েক মিনিট।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং স্কুল শিক্ষক রুমি কারিম এই প্রতিবেদককে বলেন , শহুরে জলাধারে বরফের ওপর হাঁটা কখনই নিরাপদ নয়, বিশেষ করে যখন তাপমাত্রা ওঠানামা করে। বরফের পুরুত্ব সমান থাকে না এবং পানির স্রোত বা নৌযানের চলাচলের কারণে অনেক জায়গায় তা ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
পুলিশ অবশ্য ইতিমধ্যে আহ্বান জানিয়েছে শীতের সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে যেন কেউ নিজের জীবন ঝুঁকির মুখে না ফেলেন। হারবারফ্রন্ট বা অন্য কোনো জলাধারের জমে যাওয়া বরফের ওপর না ওঠাই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত। নাগরিকদের উচিত হবে তুষারময় এবং ঠান্ডাকালীন সময়ে নিরাপদে থাকা।
