ক্যালগেরির চিঠি : মেহরুনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

মেহেরুন উপন্যাস পড়ে সাহিত্যানুরাগী সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য ইনবক্সে লিখেছেন

কানাডার এক প্রান্তে বসে বাংলা সাহিত্যের চর্চা সত্যিই দুরুহ কাজ। তবুও লিখেতে হয়। লিখে যাই। কখনো কখনো এই জীবনে অনেক ঘটনা ঘটে যায়। কখনো কানাডার ভেতরে। আবার কখনো কানাডার বাইরে।

“মেহেরুন” উপন্যাস পড়ে সাহিত্যানুরাগী সুদেষ্ণা ভট্টাচার্য ইনবক্সে লিখেছেন। উপনিষদের পাঠক, রবীন্দ্রভক্ত, এমন মানুষ খুব কম। সুদেষ্ণা সেই ব্যতিক্রমদের একজন, যাঁর সাথে আলাপে আপনার জ্ঞানজগত সমৃদ্ধ না হয়েই পারে না। তাঁর কিছু জিজ্ঞাসার জবাব আমার মন্তব্য আকারে ব্রাকেটে বন্দী করে রাখলাম:

- Advertisement -

আপনার লেখা মেহেরুন পড়লাম । বেশ ভালো লাগল। ভালো লাগাটাকে কিরকম বিশেষণ দিয়ে সাজানো গোজানো যায় জানি না তবে পড়তে শুরু করে আর ছাড়তে পারি নি। এই উপন‍্যসটিকে পুরোপুরি ভাবে ইতিহাস নির্ভর উপন্যাস বলা যায় কিনা জানি না কিন্তু ইতিহাসকে নিজেদের জীবনে, ভাবনায়, জ্ঞানবৃদ্ধিতে, কর্মকান্ডে যে ভাবে তুলে আনা হয়েছে আবিরের হাত ধরে সেটা খুব সুন্দর। মেহেরুনের চরিত্রের উপস্থিতি আবিরকে আরও অনেক খানি বেশী বুঝতে সাহায‍্য করেছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস না জানার বা ভাসা ভাসা জানার অজ্ঞানতা নিজেকেই ছোট করে দেয় কোথাও। যে কোন ভালো বই পড়লেই মনে হয় সত‍্যি কত কিছু জানি না। মেহেরুন পড়েও তাই মনে হল।

আলাপ আলোচনা কথপোকথনের মধ‍্যে দিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এল উপন্যাসটি। সবটাই যে বুঝেছি ঠিক তা নয়, তবে অনেকরকম perspective এসেছে যেগুলো ভাবিয়েছে।

সাহিত‍্যিক উৎকর্ষতা যদি বিচার করতে বসি তাহলে প্রথমেই বলব এরকম sensory ingredients ( বাংলাটা ঠিক বলতে পারলাম না) মিশিয়ে শুধুমাত্র শব্দ দিয়ে যখন গল্পকার ছবি আঁকেন, আমার মত পাঠকের কাছে সেটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগে। যেমন .. “ পুড়ে যাওয়া কাঠের ধোঁয়ার সাথে ভাতের বাষ্প পরষ্পরের হাত ধরে ছাদের দিকে উঠে যাচ্ছে কিন্তু অপ্রশস্ত পথে আটকা পড়া ধোঁয়ার কুন্ডলী ঘরকে প্রায় অন্ধকারাচ্ছন্ন করেফেলেছে ….” এরকম আরও অনেক বর্ণনা পেলাম উপন্যাসের মধ‍্যে যেটা খুব উপভোগ করেছি । প্রকৃতি, পরিবেশ, মানুষজন সবকিছুকে আবেগ যেন ছুঁয়ে ছিল শেষ পর্যন্ত সবসময়। গুরু গম্ভীর আলোচনাও তাই পড়তে ভালো লাগছিল।

ফরিদার বিয়ের সময় মেহেরুন আর ছন্দা ট্রেনে করে যাচ্ছিল, একজায়গায় লেখা হয়েছে “ ফরিদা একটু সময নেয় কিন্তু কোন মানে খুঁজে না পেয়ে …. “এখানে ফরিদার জায়গায় কি ছন্দা হবে? [ঠিক ধরেছেন। পরবর্তী সংস্করণে ঠিক করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখছি।]

একজায়গায় আলতাফ হোসেন আবিরকে বলছেন “তোমাদের সাথে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলতে ভয় হয়। টানা দু যুগ যে ইতিহাস নিষিদ্ধ হঠাৎ করে তার মুখ খুলে দেওয়াতে অনেকেই সত‍্যকে সন্দেহ করছে।” দু যুগ ধরে ইতিহাস নিষিদ্ধ রাখা হয়েছিল কেন এটা জানার ইচ্ছে হচ্ছে । যদিও রাজনৈতিক স্বার্থে ইতিহাসকে নিষিদ্ধ করা, বিকৃত করা চলেই আসছে, তাও কিছু যদি আপনি বলেন এই উল্লেখিত অংশের পরিপ্রেক্ষিতে ভালো লাগবে। [অনেক বড় আলোচনা। উপন্যাসে তার আভাসটুকু এসেছে। বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে অজানা নয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধু ও মুজিবনগর সরকারের অবদানকে আড়াল করার তেমনি একটা চেষ্টা বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর থেকে চলমান আছে। অনেকটা সুভাষ বসুকে নিয়ে পশ্চিমবাংলা কিংবা ভারতে যেমনটা হয়। সেখানকার বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজ অনেক অগ্রসর বিধায় তাদের সেই চেষ্টা হালে পানি পায়নি, কিন্তু, বাংলাদেশে অবস্থা শোচনীয়। সাক্ষাতে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারলে খুশি হবো।]

কানাডার একজন বাঙালি লেখকের এই প্রাপ্তি অনেক বড়। জীবন অনেক সুন্দর। এই ছোটখাটো প্রাপ্তিই বদলে দেয় জীবনের গতিধারা। জীবন হয়ে উঠুক আরো সুন্দরময়।

ক্যালগেরি, আলবার্টা

- Advertisement -

Read More

Recent