
কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি স্বীকার করেছেন যে, দীর্ঘদিন ধরে সামরিক খাতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন ও শক্তিশালী দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কানাডা পিছিয়ে ছিল। তিনি বলেছেন, এই দুর্বলতার কারণে দেশটি নিজের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে অন্য দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যা ভবিষ্যতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
মঙ্গলবার মন্ট্রিয়ল শহরে কানাডার প্রথম পূর্ণাঙ্গ প্রতিরক্ষা শিল্প কৌশল প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি এই মন্তব্য করেন। নতুন এই কৌশল ঘোষণার মাধ্যমে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কার ও বিনিয়োগের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী কার্নি বলেন, গত কয়েক দশক ধরে কানাডা প্রতিরক্ষা খাতে যথেষ্ট ব্যয় করেনি। একই সঙ্গে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পেও প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ হয়নি। এর ফলে কানাডা তার নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে বিদেশি সরবরাহকারীর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, এই পরিস্থিতি একটি “ভঙ্গুরতা” সৃষ্টি করেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে এমন নির্ভরশীলতা বজায় রাখা আর সম্ভব নয়। কানাডাকে এখন নিজেদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বনির্ভর হওয়ার দিকে এগোতে হবে।
নতুন প্রতিরক্ষা শিল্প কৌশলের আওতায় প্রায় ৬৬০ কোটি ডলারের একটি বড় পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো কানাডার জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার করা এবং মিত্র দেশগুলোর কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা। কৌশল অনুযায়ী, ফেডারেল প্রতিরক্ষা চুক্তিতে কানাডিয়ান কোম্পানিগুলোর অংশীদারিত্ব বাড়িয়ে ৭০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের ভেতরে প্রতিরক্ষা শিল্পের বিকাশ ঘটানো এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা করা হবে।
সরকারের এই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি। আগামী দশ বছরে প্রতিরক্ষা খাতে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার নতুন চাকরি তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শুধু সামরিক খাতেই নয়, বরং প্রযুক্তি, উৎপাদন ও গবেষণা খাতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
কৌশল নথিতে বলা হয়েছে, কানাডা প্রথমে চেষ্টা করবে নিজস্ব শিল্পের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম তৈরি করতে। তবে যদি কোনো ক্ষেত্রে তা সম্ভব না হয়, তাহলে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা হবে অথবা কঠোর শর্তের আওতায় তাদের কাছ থেকে সরাসরি সরঞ্জাম ক্রয় করা হবে। এছাড়া সরকার নির্দিষ্ট কিছু কানাডিয়ান প্রতিষ্ঠানকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে নির্বাচন করবে। এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক মানের প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
নতুন এই উদ্যোগকে একটি ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখছেন কানাডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ডিফেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট ক্রিস্টিন সিয়ানফারানি। তিনি বলেন, প্রতিরক্ষা খাতের জন্য এত স্পষ্ট ও জবাবদিহিমূলক লক্ষ্য আগে কখনও দেখা যায়নি। তার মতে, এই কৌশল বাস্তবায়িত হলে কানাডার প্রতিরক্ষা শিল্প নতুন গতি পাবে এবং দেশীয় প্রযুক্তি ও উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈশ্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে অনেক দেশই নিজেদের প্রতিরক্ষা শিল্প শক্তিশালী করার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে কানাডার নতুন প্রতিরক্ষা শিল্প কৌশলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এটি শুধু দেশের নিরাপত্তা জোরদার করবে না, বরং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে, অতীতের দুর্বলতা স্বীকার করে কানাডা এখন প্রতিরক্ষা শিল্পে নতুন দিক উন্মোচনের চেষ্টা করছে। তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনা কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে সরকারের বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং দেশীয় শিল্পখাতের প্রস্তুতির ওপর।
