
কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দেশটি এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধির একমাত্র চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়াবে অভিবাসন। অর্থাৎ, জন্ম ও মৃত্যুর স্বাভাবিক ব্যবধান থেকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় শূন্যে নেমে আসবে এবং নতুন মানুষ যোগ হবে মূলত বিদেশ থেকে আগত অভিবাসীদের মাধ্যমে।
কানাডার ফেডারেল সরকারের সর্বশেষ ইমিগ্রেশন লেভেলস প্ল্যান বিশ্লেষণ করে সংসদীয় বাজেট কর্মকর্তারা পূর্বাভাস দিয়েছেন, ২০২৬ সাল হতে পারে টানা দ্বিতীয় বছর যখন দেশটিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যের কাছাকাছি থাকবে। এই পরিস্থিতি কানাডার জনসংখ্যাগত কাঠামো ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনার জন্য দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
কোভিড-১৯ মহামারি পরবর্তী সময়ে কানাডা জনসংখ্যা বৃদ্ধির এক অস্বাভাবিক ধারা প্রত্যক্ষ করেছে। মহামারির সময় আন্তর্জাতিক চলাচল সীমিত থাকলেও, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশটি ব্যাপক হারে অভিবাসীদের জন্য দরজা খুলে দেয়। এর ফলেই জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দ্রুত বেড়ে যায়।
২০২৩ সালে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ৩.১ শতাংশ, যা দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার ছিল ১৯৭২ সালে, তখন তা ছিল মাত্র ১.১ শতাংশ। এই তুলনা থেকেই বোঝা যায় যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে অভিবাসনের প্রভাব কতটা শক্তিশালী ছিল।
কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে অস্থায়ী ও স্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় প্রায় ৮ লাখ ১৬ হাজার। বিপরীতে একই সময়ে জন্ম ও মৃত্যুর স্বাভাবিক ব্যবধান থেকে জনসংখ্যা বেড়েছে মাত্র প্রায় ৩৪ হাজার। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে যে, কানাডার মোট জনসংখ্যা বৃদ্ধির বড় অংশই এখন অভিবাসনের ওপর নির্ভরশীল।
মানব অভিবাসন বিষয়ে গবেষণা করেন ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার ভূগোলের অধ্যাপক ড্যান হিয়েবার্ট। তার মতে, সরকারের বর্তমান নীতি অব্যাহত থাকলে কানাডা খুব দ্রুত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছাবে যেখানে স্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি সম্পূর্ণভাবে থেমে যেতে পারে। তিনি বলেন, “২০২৯ অথবা ২০৩০ সালের মধ্যেই কানাডায় জন্ম ও মৃত্যুর ব্যবধানের কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যে নেমে আসতে পারে। তখন দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির শতভাগই নির্ভর করবে অভিবাসনের ওপর।”
কানাডা সরকারের ২০২৪ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৩২ সালের মধ্যে কানাডার জনসংখ্যা বৃদ্ধির পুরোটা নতুন অভিবাসীদের মাধ্যমেই হবে। অর্থাৎ, জন্মহার কমে যাওয়া এবং জনসংখ্যার বার্ধক্য বাড়ার ফলে স্বাভাবিকভাবে জনসংখ্যা বাড়ার প্রবণতা প্রায় বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন শ্রমবাজারে নতুন কর্মী সরবরাহে সহায়ক হতে পারে, অন্যদিকে এটি জনসংখ্যার বয়স কাঠামো, আবাসন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক অবকাঠামোর ওপর নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কানাডা দীর্ঘদিন ধরেই অভিবাসনের ওপর নির্ভর করছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির পুরোটা যদি অভিবাসননির্ভর হয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে নীতিনির্ধারকদের সামনে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে। সব মিলিয়ে, কানাডা এখন এমন এক জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, যা আগামী কয়েক দশকে দেশটির অর্থনীতি, সমাজ ও নীতিনির্ধারণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
