ক্যালগেরি থেকে ৭ মার্চ: রাষ্ট্রের মানসিক জন্ম এবং আত্মত্যাগের ঘোষণা

আজ আমরা কানাডার পাহাড় ঘেরা শহর ক্যালগারির মাটিতে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চকে স্মরণ করছি

আজ আমরা কানাডার পাহাড়-ঘেরা শহর ক্যালগারির মাটিতে দাঁড়িয়ে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চকে স্মরণ করছি। আমরা একা না,  বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বাঙালি যার যার মতো করে দিনটি স্মরণ করছে। সময়ের হিসেবে ৫৫ বছর পেরিয়ে গেছে। আজও সেই বক্তৃতার আবেদন সেই প্রথম দিনের মতো অটুট। ৭ই মার্চ কেবল একটি ভাষণের দিন তো নয়। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় বৈধতা পুনর্গঠনের দিন। এটি ছিল একটি জাতির মানসিক স্বাধীনতার দিন। পাকিস্তানি শাসনের ২৩ বছরের বর্ণনা শেষে বঙ্গবন্ধু যখন বলেন, কী পেলাম আমরা? তখন সেই না-পাওয়ার আর্তনাদ কেবল ২৩ বছরের সীমায় আবদ্ধ থাকে না। ইতিহাসের বহু গভীর স্তর থেকে সেই আর্তনাদ ভেসে আসে। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে যেন ধ্বনিত হয় শশাঙ্কের অপমান, হুসেন শাহের দ্বিধা, সিরাজের সেনাপতি মোহনলালের পরাজিত সাহস, নেতাজি সুভাষ চন্দ্রের অসমাপ্ত প্রয়াস— হাজার বছরের রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে বাঙালির গভীর প্রত্যয় এক মুহূর্তে স্ফটিকস্বচ্ছ হয়ে ওঠে। সামনে বিস্তীর্ণ প্রান্তর। লাখো মানুষ। জাতির সামনে মাহেন্দ্রক্ষণ উপস্থিত। মানুষ হিসেবে তার সৃষ্টির সার্বভৌমত্ব—যা আধুনিক প্রজাতন্ত্রের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়—স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সেই সার্বভৌমত্ব অর্জনের মুহূর্ত এসে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭১ সালের ১লা মার্চে শুরু হওয়া সংকটটি শুধু রাজনৈতিক ছিল না—এটি ছিল জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার সংকট। প্রশ্ন ছিল—রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক কে? সামরিক জান্তা, না জনগণ? জনগণের অভিপ্রায়ের বিমূর্ত রূপ হলো শাসনতন্ত্র। আর সেই শাসনতন্ত্র সংসদের মাধ্যমে মূর্ত রূপ পায়—জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য, জনগণের ভোটে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ববাংলার জনগণ তো বটেই, সমগ্র পাকিস্তানের জনগণও শাসনতন্ত্র প্রণয়নের দায়িত্ব আওয়ামী লীগের হাতে অর্পণ করেছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল পরিষ্কার। জনগণের অভিপ্রায় ছিল স্পষ্ট। কিন্তু, শাসনতন্ত্র প্রণয়ন দূরের কথা, সংসদই বসতে দেওয়া হলো না। ক্ষমতা হস্তান্তর স্থগিত করা হলো। ঠিক এই মুহূর্তেই জন্ম নেয় legitimacy crisis—বৈধতার সংকট।

- Advertisement -

৭ই মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই সংকটের রাজনৈতিক সমাধান নিয়ে হাজির হন। জনগণের ম্যান্ডেটকে রাষ্ট্রের একমাত্র বৈধ ভিত্তি হিসেবে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠার ঘোষণা। কিন্তু ঘোষণাই তো যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্রের ওপর জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সক্ষমতাও দেখাতে হয়। কয়েকদিন আগে কর প্রদান বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এবার তার সাথে আরও তিনটি নির্দেশ যুক্ত করেন—অফিস-আদালত বন্ধ, সংগ্রাম কমিটি গঠন, এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ। ফলাফল—সারাদেশে কার্যত একটি সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে ওঠা। ফলশ্রুতিতে, উচ্চ আদালতও জনগণের অভিপ্রায়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থান নিতে সমর্থ হয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায়—এটি ছিল ডি-ফ্যাক্টো স্বাধীনতা। অর্থাৎ, আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই কার্যকর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। ২৫শে মার্চ রাতে সংগতকারণে তাই সামরিক আঘাত আসে। আর তাকে অনুসরণ করে আসে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। কিন্তু রাষ্ট্রের মানসিক জন্ম হয়েছিল ৭ই মার্চ।

প্রশ্ন ওঠে—কেন ৭ই মার্চেই স্বাধীনতা ঘোষণা দেওয়া হয়নি?

নেতৃত্ব মানে কেবল সাহস নয়—কৌশলও। ভূ-রাজনীতির সমীকরণ বোঝা প্রজ্ঞার অংশ। বায়াফ্রার উদাহরণ তখন সামনে ছিল—১৯৬৭ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা, তিন বছরের যুদ্ধ, দশ লক্ষ প্রাণহানি—তবু আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাবে স্বাধীনতার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়।

১৯৬৬ সালের ছয় দফা ছিল বাংলাদেশের জনগণের স্বায়ত্তশাসনের পথে প্রথম শর্ত পুরণ, এবং ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ছয় দফা বাস্তবায়ন প্রশ্নে জনগণের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধুকে ম্যান্ডেট প্রদান ছিল দ্বিতীয় শর্ত পুরণ। বাকি ছিল পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রতিবন্ধকতা। বঙ্গবন্ধুর পক্ষ থেকে আলোচনার মাধ্যমে সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়। ৭ই মার্চে সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে পাকিস্তান সহজেই পূর্ববাংলাকে “বিদ্রোহী অঞ্চল” এবং মার্কিন ও চীনা সমর্থনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাঙালির সংগ্রামকে “বিচ্ছিন্নতাবাদ” আখ্যা দিতে সক্ষম হতো। ফলশ্রুতিতে, তৃতীয় শর্তটি অপূর্ণ রয়ে যেতো। বঙ্গবন্ধুর ভাষণ তাই এমনভাবে নির্মিত হলো— যেখানে নৈতিক উচ্চতা অক্ষুণ্ণ থাকার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে প্রথম আঘাত হানতে বাধ্য করা হয়। ২৫শে মার্চের গণহত্যা বিশ্বকে দেখিয়ে দিল—কে আগ্রাসী, আর কে ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামী। এই নৈতিক অবস্থানই আন্তর্জাতিক সমর্থনের ভিত্তি তৈরি করে।

ইউনেস্কো ২০১৭ সালে এই ভাষণকে “Memory of the World” হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। কিন্তু আমার কাছে শহীদ অধ্যাপক আনোয়ার পাশার সাক্ষ্য আরও গভীর। মুক্তিযুদ্ধের চলমান সাক্ষী হিসেবে রচিত তাঁর উপন্যাস রাইফেল রোটি আওরাত— যেখানে ৭ই মার্চের উত্তাল মানসিক কম্পন নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। জনতা অপেক্ষা করছে। উত্তেজনা চরমে। সবাই ঘোষণা শুনতে চায়। কিন্তু নেতা সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছেন। “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”

এটি ঘোষণা নয়—ঘোষণার চেয়েও শক্তিশালী সংকেত। ইতিহাসের নির্মমতা—যিনি এই সময়ের সাহিত্যিক দলিল লিখছিলেন, সেই আনোয়ার পাশা ১৪ ডিসেম্বর শহীদ হন। নেতৃত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তি—উভয়েই মুক্তিযুদ্ধের ভিত গড়ে দেয়।

৭ই মার্চের ভাষণের শেষ অংশে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে আমরা যখন “আমি মরবার জন্য প্রস্তুত” শব্দগুলো শুনি, তখন সেখানে আমরা একজন রাজনীতিককে আর দেখি না—আমরা দেখি একজন ঐতিহাসিক চরিত্রকে। শব্দগুলো ছিল রাজনৈতিক ঘোষণার চেয়েও বড় কিছু। এটি ছিল নেতৃত্বের নৈতিক অঙ্গীকার। তিনি জনগণকে সামনে ঠেলে দেননি—তিনি নিজেকে দখলদার বাহিনীর অস্ত্রের সামনে দাঁড় করিয়েছেন। তিনি জানতেন তাঁকে গ্রেপ্তার করা হবে। তিনি জানতেন তাঁর জীবন ঝুঁকির মধ্যে। তবু, আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলিয়ান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনায় সেই বিস্ময়কে ধারণ করেন, যা মানুষকে অমরত্ব দেয়। রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ভাষায় এটিই নৈতিক বৈধতার চূড়ান্ত রূপ—যেখানে নেতা নিজের জীবনকে জাতির ভবিষ্যতের সাথে একীভূত করেন।

আমরা আজ কানাডায় বাস করি—একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে। ৭ই মার্চ আমাদের মনে করিয়ে দেয়— গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেট অস্বীকার করলে রাষ্ট্র ভেঙে পড়ে। নৈতিক বৈধতা ছাড়া ক্ষমতা টেকে না। ঐক্য ছাড়া স্বাধীনতা টিকে না। প্রবাসে থেকেও আমাদের দায়িত্ব— ঐক্য রক্ষা করা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চা করা, এবং ইতিহাসকে কেবল আবেগ নয়—বোধ দিয়ে মূল্যায়ন করা।

৭ই মার্চ ছিল বজ্রের মতো উচ্চারণ, কিন্তু তার ভিতরে ছিল রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতা। সেই দিন লাখো মানুষ বুঝেছিল— রাষ্ট্র মানে শুধু মানচিত্র নয়। রাষ্ট্র মানে সম্মিলিত রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি। আর যখন একজন নেতা বলেন—“আমি রক্ত দেবার জন্য প্রস্তুত”, তখন ইতিহাস জানে— সেই জাতিকে আর পরাজিত করা যায় না।

ক্যালগারি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent