
দুর্ঘটনাবশত বিষক্রিয়া বর্তমানে একটি উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখা দিচ্ছে, বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে। সাম্প্রতিক এক আলোচনায় স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ঘরের ভেতরেই থাকা নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক জিনিস শিশুদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে যা অনেক অভিভাবকই এখনও গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন না।
ইস্টার্ন অন্টারিও হেলথ ইউনিটের মেডিকেল অফিসার অব হেলথ এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. পল রুমেলিয়টিস একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেন, জরুরি বিভাগে কাজ করার সময় তিনি প্রায় প্রতি ঘণ্টায়ই এমন ফোনকল পেতেন, যেখানে আতঙ্কিত বাবা-মায়েরা জানাতেন তাদের সন্তান ভুল করে কোনো কিছু খেয়ে ফেলেছে। তার মতে, “এটা একটি বাস্তব এবং বড় সমস্যা, কিন্তু মানুষ এখনো বুঝতে পারছে না শিশুরা কত সহজে বিপজ্জনক কিছু খেয়ে ফেলতে পারে।”
অন্টারিও পয়জন সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রতিদিন গড়ে ১৮৯টি বিষক্রিয়া সংক্রান্ত ঘটনায় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি দেখা যায়। পুরো বছরজুড়ে এই বয়সসীমার ২৪ হাজারেরও বেশি শিশুকে চিকিৎসা দিতে হয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকেই নির্দেশ করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক গৃহস্থালী সামগ্রী শিশুরা নিরীহ বা খাবারযোগ্য ভেবে ভুল করে। যেমন উজ্জ্বল রঙের ক্লিনিং লিকুইড অনেক সময় শিশুদের কাছে স্পোর্টস ড্রিংক বা ফলের রসের মতো মনে হতে পারে। এমনকি কম উজ্জ্বল রঙের পরিষ্কারকও তাদের বিভ্রান্ত করতে পারে। ঘর পরিষ্কারের সময় অসাবধানতাবশত এসব জিনিস শিশুর নাগালে চলে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
এছাড়া ডিশওয়াশার ও লন্ড্রি পডও শিশুদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলো অনেক সময় ক্যান্ডির মতো দেখতে হওয়ায় শিশুরা মুখে নিয়ে চিবিয়ে ফেলে, ফলে এগুলো ফেটে গিয়ে রাসায়নিক পদার্থ শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আরেকটি অবহেলিত ঝুঁকি হলো চোষার ভিটামিন। দেখতে অনেকটা মিষ্টির মতো হওয়ায় শিশুরা একাধিক খেয়ে ফেলতে পারে। অথচ নির্ধারিত মাত্রার বেশি গ্রহণ করলে এসব ভিটামিনও বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। ডা. পলের ভাষায়, “প্রতিদিন একটি ভিটামিন গ্রহণ নিরাপদ, কিন্তু যদি কোনো শিশু চার-পাঁচটি একসঙ্গে খেয়ে ফেলে, তাহলে সেটি গুরুতর বিপদের কারণ হতে পারে যা অনেকেই উপলব্ধি করেন না।”
অন্টারিও পয়জন সেন্টারের তথ্যে দেখা যায়, ছয় বছরের কম বয়সী শিশুদের বিষক্রিয়ার প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যথানাশক ওষুধ, গৃহস্থালী পরিষ্কারক, ব্যক্তিগত পরিচর্যার সামগ্রী, ভিটামিন, খেলনা বা বিদেশি বস্তু, গাছপালা, ত্বকের ক্রিম, ভেষজ ও হোমিওপ্যাথিক ওষুধ, খাদ্য-পরিপূরক এবং কীটনাশক।
বিষক্রিয়ার লক্ষণ হিসেবে সাধারণত বমি, মুখ ও গলায় জ্বালা বা চুলকানি দেখা যায়। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, এমনকি শিশু অচেতন হয়ে কোমায় চলে যেতে পারে বা মৃত্যুও হতে পারে। তাই এসব উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিশুদের নিরাপদ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অভিভাবকদের সচেতনতা ও সতর্কতা। বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, সব ধরনের সম্ভাব্য বিষাক্ত সামগ্রী তালাবদ্ধ করে রাখা এবং শিশুদের নাগালের বাইরে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি। গৃহস্থালী কাজের সময়ও শিশুদের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন, কারণ সামান্য অসাবধানতাই বড় বিপদের কারণ হতে পারে।
সব মিলিয়ে, শিশুদের দুর্ঘটনাজনিত বিষক্রিয়া প্রতিরোধে সচেতনতা, সতর্কতা এবং সঠিক সংরক্ষণ ব্যবস্থাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা।
