
যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় বাঙালির দলপ্রীতি দেশের চেয়েও অনেক বেশি প্রকাশ্য এবং জোরালো। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশির সংখ্যা প্রায় আট লাখ, আর কানাডায় প্রায় লাখ খানেক। বাংলাদেশে যতগুলো রাজনৈতিক দল আছে, তার প্রায় সব কটির শাখা ও অঙ্গসংগঠন আছে রয়েছে এখানে, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে। এগুলোর আবার কেন্দ্রীয় সংগঠন, রাজ্য সংগঠন—এমনকি শহরভিত্তিক সংগঠনও আছে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ বা কানাডা বিএনপি, কুইবেক কিংবা ভার্জিনিয়া প্রাদেশিক বা রাজ্য শাখা এবং টরন্টো বা শিকাগো নগর শাখা। একমাত্র বাংলাদেশ ছাড়া পৃথিবীর আর কোনো দেশের কোনো রাজনৈতিক অঙ্গসংগঠন নেই উত্তর আমেরিকায়।
একই চিত্র সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের বেলায়। বাংলাদেশীদের সার্বজনীন সংগঠন FOBANA (ফেডারেশন অব বাংলাদেশি এসোসিয়েশন ইন নর্থ আমেরিকা) তিন চারটি গ্রুপে বিভক্ত। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি বছর যুক্তরাষ্ট্র অথবা কানাডার একটি শহরে সর্বস্তরের বাংলাদেশির অংশগ্রহণে একটিমাত্র ফোবানা সম্মেলন হওয়ার কথা থাকলেও লবিং গ্রুপিং’এর কারণে তা হয় না। গত বছর একই নামে চারটি ভিন্ন গ্রুপ চারটি ভিন্ন শহরে (জর্জিয়ার আটলান্টা, ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো, ম্যাসাচুসেটস’র বোস্টন এবং কুইবেকের মন্ট্রিয়ল) প্রায় একই সময়ে ফোবানা সম্মেলনের আয়োজন করে।
বলা বাহুল্য, যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডায় ভারতীয়দের কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা বা অঙ্গসংগঠন নেই। তাদের মধ্যে যাদের রাজনীতি করার বাসনা, তাঁরা যোগ দেন এখানকার মূলধারার রাজনৈতিক সংগঠনগুলিতে। যুক্তরাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক অথবা রিপাবলিকান পার্টিতে, কানাডায় লিবারেল, কনজারভেটিভ বা এনডিপিতে। তাতে বিশেষভাবে উপকৃত হয় এ দেশে ভারতীয় জনগোষ্ঠী এবং বৃহত্তর অঙ্গনে ভারত। প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের আমলে ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সম্পাদিত হয়, সেটি সম্ভব হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকানদের জোর তদবিরের ফলে। এ দেশে এখন ভারতীয়দের জোরালো অবস্থান জাতীয় জীবনের সব পর্যায়ে। আমেরিকার দুটি রাজ্যের নির্বাচিত গভর্নর এখন দুজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত নাগরিক। তাঁদের মধ্যে একজনের ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা পর্যায়ের কর্মকর্তা আছেন বেশ কয়েকজন ভারতীয়, আছেন আরও বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার পদে এবং বিভিন্ন রাজ্যের আইন পরিষদের সদস্য পদে। প্রেসিডেন্টের মন্ত্রিসভার সদস্য পর্যায়ের কর্মকর্তা এআইডির (এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট) প্রধান হলেন রাজীব শাহ নামের এক তরুণ ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান। কানাডায় ভারতীয়রা এমপি ও প্রাদেশিক মন্ত্রিত্ব পেয়েছে বেশ আগেই। এবার কেন্দ্রীয় মন্ত্রীত্ব পেলেন পাঞ্জাবি বংশোদ্ভূত তিম উপ্পাল। কানাডার পেট্রোলিয়াম রাজধানী ক্যালগারি শহরের মেয়র হয়েছেন নাহিদ কুরবান নেনশী; তানজানিয়া হয়ে কানাডায় এলেও তিনি মূলত ভারত বংশীয়। উত্তর আমেরিকায় ভারতীয়দের এই অর্জন সম্ভব হয়েছে বিদেশে বসে দেশের রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন পরিচালনার মতো অনাবশ্যক অবান্তর কাজে অযথা শক্তি ক্ষয় না করে এবং দলাদলি নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনর্থক দ্বন্দ্ব-কলহে জড়িয়ে না পড়ার কারণে।
তবে আশার কথা, দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশিদের বাংলাদেশের প্রতি গভীর ভালোবাসা থাকলেও ওরা দলাদলি করে না। বরং কেউ কেউ এখানকার মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছে। হয়তো ওদেরই কেউ একদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় বসবে। সেদিন বোধকরি খুউব বেশি দূরে নয়।
ব্রাম্পটন, কানাডা
