জীবন থেকে এভাবে আপনি সত্যি সত্যিই ঝাপসা হয়ে গেলেন ওস্তাদ!

কানাডায় আমার নিস্তরঙ্গ প্রবাস জীবনকে যে কজন মানুষ তাঁদের সৃজনশীল ঊর্মিতরঙ্গে মাতিয়ে রেখেছেন আনন্দের উদ্ভাস নিয়ে সঙ্গে থেকেছেন বেলাল আহমেদ তাঁদেরই একজন

কারো মৃত্যু নিয়ে লিখতে আর ভালো লাগে না! একে একে চলে যাচ্ছে প্রিয় মানুষগুলো। দুদিন আগে চলে গেলো চন্দন, আমাদের ছড়ার ভুবনের এক মেধাবী যুবরাজ। কাল চলে গেলেন আমার প্রিয় এক বন্ধু চিত্রপরিচালক বেলাল আহমেদ। বাংলাদেশে সুস্থ ছবির ধারার এক স্নিগ্ধ ও রুচিশীল নির্মাতা। তাঁর পরিচালিত ছবিগুলোই আমার কথার প্রমাণ দেবে। সব নাম বলার দরকার নেই। একটি নাম বললেই যথেষ্ট মনে হয়। ‘নয়নের আলো’র কথা আমাদের জেনারেশনে কার না মনে আছে?

তাঁর জীবনের প্রথম ছবিটির নাম ছিলো নাগরদোলা। মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৭৯ সালে। সেই ছবির বিখ্যাত গান—সাবিনার কণ্ঠে—ও আমার মন কান্দে/ও আমার প্রাণ কান্দে…ভীষণ জনপ্রিয়তা পেয়েছিলো। সুরকার ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। ‘নয়নের আলো’ তাঁর দ্বিতীয় ছবি। মুক্তি পেয়েছিলো ১৯৮৪ সালে।

- Advertisement -

কানাডায় আমার নিস্তরঙ্গ প্রবাস জীবনকে যে ক’জন মানুষ তাঁদের সৃজনশীল ঊর্মিতরঙ্গে মাতিয়ে রেখেছেন, আনন্দের উদ্ভাস নিয়ে সঙ্গে থেকেছেন, বেলাল আহমেদ তাঁদেরই একজন। খুব গান পাগল মানুষ আমি। বাংলা চলচ্চিত্রের অসাধারণ গানগুলো আমার নিত্য সঙ্গী। ইউটিউবের কল্যাণে কিছু কিছু গান প্রায় নিয়মিতই শোনা হয় আমার। লক্ষ্য করে দেখলাম আমার নিয়মিত শ্রুতির তালিকায় দুটি গান বেলাল আহমেদের চলচ্চিত্রের। ‘নয়নের আলো’ নামের স্নিগ্ধ সেই চলচ্চিত্রের দুর্ধর্ষ রকমের ভালো দুটি গান হচ্ছে–আমার সারা দেহ খেও গো মাটি/এই চোখ দুটি মাটি খেওনা/আমি মরে গেলেও তারে দেখার সাধ/মিটবে না গো মিটবে না/তারে এক জনমে ভালোবেসে/ভরবে না মন ভরবে না…। দ্বিতীয়টি–আমার বুকের মধ্যিখানে/মন যেখানে হৃদয় যেখানে/সেলখানে তোমাকে আমি/রেখেছি কতো না যতনে…। দুদিন আগেও প্রথম গানটি দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত একটানা শুনেছি, অজস্রবার। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা আর সুরে গান দুটির জন্ম হয়েছিলো।

আজ, এই লেখাটি লিখবার সময়েও বেলাল আহমেদ স্মরণে আমার ল্যাপটপে অবিরাম বেজে চলেছে গানটি। আহারে! মানুষের জীবনটা এমন কেনো! সৃজনশীল ভালো মানুষগুলো এতো আগে আগে চলে যায় কেনো? অথচ দুর্বৃত্ত টাইপের মানুষগুলোর মরণ হয় না।

বেলাল ভাইয়ের সঙ্গে আমার কতো কথা কতো স্মৃতি! মনে পড়ছে তাঁর সঙ্গে প্রথম পরিচয়ের মুহূর্তটিকে। চলচ্চিত্র সাংবাদিক আবদুর রহমান তখন ‘প্রিয়জন’ নামে পাক্ষিক একটি পত্রিকার সম্পাদক। আড্ডাপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল আবদুর রহমান ‘প্রিয়জন’-এর ব্যানারে প্রায়শঃ তাঁর প্রিয়জনদের একত্রিত করেন নানা উপলক্ষ্যের অজুহাতে। সেখানে যোগান থাকে বিপুল পানাহারের। উপস্থিত থাকেন চলচ্চিত্র আর টেলিভিশনের তারকা শিল্পী-নির্মাতাদের পাশাপাশি খ্যাতিমান লেখক-সাংবাদিক ও সঙ্গীতশিল্পীরা। নব্বুই দশকের সূচনায় মতিঝিলের রদেভূঁ সুন্দরমে আয়োজিত সেইরকম একটি মিলন মেলায় আবদুর রহমান আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন গুণী নির্মাতা বেলাল আহমেদকে। উজ্জ্বল সেই সন্ধ্যায় বিভিন্ন টেবিল আলো করে ছোট ছোট গ্রুপে ভাগ হয়ে চলছিলো হাস্য-লাস্য-ভাষ্যের সঙ্গে বিস্তর পানাহারের টুংটাং।

একটি টেবিলে নিঃসঙ্গ একজন একলা একা খুব নিরবে স্কটল্যান্ডের সোনালি শিশিরের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে বিষণ্ন ভঙ্গিতে পুরো আড্ডাটাকে অবলোকন করছিলেন। আবদুর রহমানকে ব্যাপারটা অবহিত করলাম। রহমান ভাই বললেন—পরিচালক বেলাল আহমেদের সঙ্গে পরিচয় নেই তোমার? আজ তাঁর মন ভালো নেই। চলো তোমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিই। গ্লাসভর্তি ফেনাথইথই গোল্ডেন বীয়ার হাতে পায়ে পায়ে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম বেলাল আহমেদের টেবিলের সামনে।

আমাদের দুজনকে দেখে আসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আমার দিকে একটা সৌজন্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। রহমান ভাই বললেন—বেলাল ভাই এ হচ্ছে আমাদের

বেলাল আহমেদ রহমান ভাইকে থামিয়ে দিয়ে বললেন—ছড়াকার রিটনকে চিনবো না আমি, আমাকে এতোটা মূর্খ ভাবাটা কি ঠিক রহমান ভাই! শুনে আমি লজ্জিত হবার মতো করে হাসলাম। রহমান ভাই পার্টি আর গেস্ট তদারকিতে ব্যস্ততার কারণে ত্রস্ত ভঙ্গিতে আমাদের সামনে থেকে চলে গেলেন।

বেলাল ভাই বললেন—আপনি আমার খুব পছন্দের একজন মানুষ। কোনো একটা কারণে মনটা ভালো নেই আজ। বসুন ভাই আমার সঙ্গে। আপনার সঙ্গ পেলে আমি জানি বেশিক্ষণ লাগবে না মনটা খুশিতে ভরে উঠতে।

আমি যে চিত্রপরিচালক বেলাল আহমেদের একজন মহা অনুরাগী সেটা কয়েকটি বাক্যেই তাঁকে বোঝাতে সক্ষম হলাম। আমি যে ফিল্মের পোকা এবং সিনেমার গানের একজন নিবিষ্ট শ্রোতা সেটাও তাঁর গোচরে আনলাম। এক পর্যায়ে বললাম—আপনি কি জানেন যে আমি চাইলেও আপনাকে ভুলতে পারবো না কোনোদিন? আপনি একজন স্মরণীয় মানুষ আমার কাছে?

আমার কথায় খানিকটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে নড়েচড়ে বসলেন বেলাল আহমেদ—আরে এটা কী বললেন? আমি স্মরণীয় মানুষ? আপনার কাছে!

বললাম—জ্বী জনাব। একবিন্দু বাড়িয়ে বলছি না। আপনার ‘নয়নের আলো’ ছবির দুটি গান আমি নিয়মিত শুনি। প্রথমটি ‘আমার সারাদেহ খেও গো মাটি’ দ্বিতীয়টি ‘আমার বুকের মধ্যিখানে মন যেখানে হৃদয় যেখানে’। গান দুটি যখনই শুনি, আপনার কথা স্মরণ করি। সুতরাং আপনি যে আমার কাছে একজন স্মরণীয় মানুষ তাতে সন্দেহ কী?

গ্লাসের তলানিটুকু একচুমুকে শেষ করে বেলাল ভাই বললেন—আমার মন ভালো করার জন্যে বলছেন?

এরইমধ্যে বেলাল আহমেদকে সার্বক্ষণিক এসিস্ট করা একটা ছেলে বেলাল ভাইয়ের শুন্য গ্লাসটি ছোঁ মেরে নিয়ে গেলো। এবং ফিরে এলো চটজলদি পূর্ণপাত্র সোনালি শিশির সমেত। বেলাল ভাই গ্লাসে ঠোঁট ছোঁয়াতে গেলেন। সে সময় আমি সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলাম—ওস্তাদ আর খাবেন না প্লিজ, আপনারে ঝাপসা লাগতাছে!

আমার কথায় মুহূর্তেই অট্টহাস্যে গুঁড়ো গুঁড় হয়ে পড়লেন বেলাল আহমেদ—এইটা কী বললেন রে ভাই! আপনি আমাকে মাতাল বললেন নাকি নিজেকে?

আমি বললাম—বুইঝা লন।

বেলাল ভাইয়ের হাসি আর থামে না। দূর থেক রহমান ভাই ব্যাপারটা খেয়াল করে ইশারায় আমাকে ধন্যবাদ দেন। আমি বুঝতে পারি বেলাল আহমেদের মন খারাপ ভাবটা এখন মতিঝিল ছাড়িয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে।

সেই থেকে বেলাল আহমেদ আমাকে খুব আপন করে নিলেন। পত্রিকা অফিসে, পার্টিতে, এফডিসিতে যেখানেই দেখা হোক আমাদের, একবার হলেও আমরা একজন অন্যজনকে ফিসফিস করে বলবো—ওস্তাদ আপনেরে ঝাপসা লাগতাছে!

আমি কানাডায় চলে এলে ফেসবুকেও আমাদের সেই ইয়ার্কি অব্যাহত ছিলো। তিনি আমার ফেসবুক ফ্রেন্ডও ছিলেন। ফেসবুকে আমার বিভিন্ন লেখায় তিনি কমেন্ট করতেন। খুব সংক্ষিপ্ত কমেন্ট। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধ আর স্বাধীনতা বিষয়ক আমার গদ্যে-পদ্যে তাঁর হার্দিক কমেন্ট আমাকে প্রাণিত করতো। আপনি লিখুন। আরো লিখুন। স্যালুট আপনাকে। ওস্তাদ আরো চাই। এরকম ছোট ছোট মন্তব্য পেতাম তাঁর কাছ থেকে। আহারে! আর কোনোদিন তিনি কমেন্ট করতে আসবেন না আমার কোনো পোস্টে! আমাদের চলচ্চিত্রে স্নিগ্ধতা ছড়ানো রুচিস্নিগ্ধ মানুষটা চলে গেলেন! সাহিত্য নির্ভর ছবির ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন খুব। ইমপ্রেস থেকে হুমায়ুন আহমেদের উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ অবলম্বনে বানিয়েছিলেন ছবি ‘নন্দিত নরকে’। মাহমুদুল হকের উপন্যাস ‘মাটির জাহাজ’ অবলম্বনে বানিয়েছিলেন ‘অনিশ্চিত যাত্রা’। ইম্প্রেস টেলিফিল্মের আরেকটা ছবির নির্মাণ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেলেন বেলাল আহমেদ।

প্রিয় বেলাল ভাই, এরপর ঢাকায় গেলে আর কখনোই দেখা হবে না আপনার সঙ্গে? এটা কোনো কথা হলো! জীবন থেকে এভাবে আপনি সত্যি সত্যিই ঝাপসা হয়ে গেলেন ওস্তাদ!

 

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent