
দশ বছর আগে, ২১ আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে নৃশংস গ্রেনেড হামলা করেছিলো কারা? বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত সেই জনসভায় পরিকল্পিত হামলায় ব্যবহৃত হয়েছিলো আর্জেস গ্রেনেড। চট্টগ্রাম বন্দরে ‘দশ ট্রাক অস্ত্র আটক ও উদ্ধারের তালিকায়’ এই আর্জেস গ্রেনেডও ছিলো। বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন চারদলীয় জামাত-বিএনপি জোট সরকার। সেদিন, অল্পের জন্যে রক্ষা পেয়েছিলেন শেখ হাসিনা। আইভি রহমানসহ সেদিন কতো মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলো আমাদের তা মনে নেই। আহত হয়েছিলো কতো মানুষ সেটাও আমাদের মনে নেই। এই ঘটনার পেছনে কারা কারা জড়িত ছিলেন সেটাও আমরা ভুলে গেছি। কারণ ‘গোল্ডফিস মেমোরি’ আমাদের। অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ভুলে যাই আমরা, সবকিছু। কী নিপুণ ছক সেদিন এঁকেছিলো ঘাতকরা! গ্রেনেড থেকে বেঁচে গেলে শেখ হাসিনাকে গুলি করে হত্যা করার জন্যে তৈরি ছিলো স্নাইপার। স্নাইপারের গুলি থেকে শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মাহবুব নামের এক তরুণ, হাসিনার ব্যক্তিগত দেহরক্ষী, নিজের বক্ষে ধারণ করেছিলেন সেই গুলি। নিজের শরীরকে বর্ম বানিয়ে হাসিনাকে বুক দিয়ে আড়াল করে তাঁকে বুলেট প্রুফ গাড়িতে তুলে দিতে দিতে গাড়ির দরোজাতেই লুটিয়ে পড়েছিলেন মাহবুব। গ্রেনেড-বোমার ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন পরিবেশে নির্ভুল নিশানায় হাসিনাকে গুলি করতে নিকটেই অবস্থান করছিলো সেই স্নাইপার। কিন্তু একজন মাহবুবের জন্যে দক্ষ স্নাইপারটি সেদিন ব্যর্থ হয়েছিলো। শেখ হাসিনার জীবন বাঁচাতে নিজের জীবনটা উৎসর্গ করেছিলো মাহবুব। শেখ হাসিনার জীবন বাঁচানো সেই মাহবুবকে আমরা কী মনে রেখেছি? রাখিনি। সরকার পরিবর্তন ঘটার পর হত্যাকাণ্ড ও হাসিনাহত্যাপ্রচেষ্টায় জড়িত তখনকার লুকিং ফর শত্রুজ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাবর এখনো জাবর কাটছে! এনএসআই ডিজিএফআইপ্রধানসহ পুলিশের বড়কর্তারাও আইনের লম্বা হাতের লম্বা ছায়ার আদরে এখনো শাস্তি থেকে যোজন যোজন কিলোমিটার দূরে। ১৯ আসামী এখনো পলাতক। চারশ আহতের মধ্যে শরীরে গ্রনেডের স্প্লিন্টারের অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে এখনো কতোজন কাতরাচ্ছেন আমরা তার খোঁজও রাখি না। আইভি রহমান ছাড়া স্পটডেড চব্বিশজনের একজনের নামও কি আমরা জানি? ‘পাপেট জজ মিয়া’ এবং জঙ্গি মুফতি হান্নানের কী হলো আমাদের জানা নেই। বছর ঘুরে ২১ আগস্ট এলে মিডিয়ার কল্যাণে বাবর-হান্নানদের কথা নতুন করে ফের অবগত হই আমরা। আহত কারো কারো সাক্ষাৎকার দেখে এবং শুনে খানিকক্ষণ আহা উহু করি। তারপর ফের ভুলে যাই।
‘গোল্ডফিস মেমোরি’ অপবাদ থেকে আমিও মুক্ত নই। আজ একুশে আগস্ট বলেই ইন্টারনেটে হতভাগ্য কিছু রক্তাক্ত আহত ও নিহত আনুষের ছবি দেখে আমারও কিছু কথা মনে পড়লো, ফের।
২০০৪ সালে, কানাডায় বসে ভয়ংকর সেই হামলার দৃশ্য টিভি পর্দায় দেখে এবং বিবিসিতে শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার ও কান্না শোনার পর একটা ছড়া লিখেছিলাম পরেরদিন, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার ঘোর কাটতে না কাটতেই। ছড়াটা পাঠিয়ে দিয়েছিলাম জনকণ্ঠে, তখন তখনই। কিন্তু জনকণ্ঠ অজ্ঞাত কারণে এটা ছাপতে দেরি করেছিলো। সাধারণত আমার ছড়া জনকণ্ঠে ছাপা হতো চতুরঙ্গ পাতায়, অতিদ্রুত, রাজনৈতিক কলামের পাশে। আমার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক-সম্পাদক তোয়াব খান আমার বহু রাজনৈতিক ছড়া বছরের পর বছর ছেপেছেন সেই পাতাতেই। কিন্তু বিস্ময়কর ঘটনা–এই ছড়াটি জনকণ্ঠ ছেপেছিলো তাদের হাস্যরসের পাতা ‘রঙ্গভরা বঙ্গদেশ’-এ। জনকণ্ঠের সেই রঙ্গ আমি মেনে নিতে পারিনি। আমি জানি একটি দৈনিক পত্রিকা হচ্ছে নানান কুতুবের ঘুঁটাকেন্দ্র। কোন্ কুতুব কোন্ ঘুঁটা মেরে সেদিন প্রচন্ডভাবে সমসাময়িক রাজনৈতিক সেই ছড়াটিকে হাস্যরসের হাস্যকর পাতায় ছেপেছিলেন তা জানার আর রুচি হয়নি আমার। তোয়াব খান একাই তো ছিলেন না জনকণ্ঠে! কতিপয় ছদ্মপ্রগতিশীল জামাত-বিএনপিবান্ধব ছাগলও ছিলো তাঁর আশেপাশে! এই ছাগলদের কারণেই পরবর্তীতে জনকণ্ঠে লিখতে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছিলাম, ধিরে ধিরে। সে আরেক কাহিনি।
বিস্মরণপ্রিয় জাতি হিশেবে আমরা তুলনারহিত। আমরা সব কিছু ভুলে যাই দ্রুত। আর সেকারণেই জাস্টিজ ডিলেইড জাস্টিজ ডিনায়েড ফর্মূলায় মহামহিম গোলাম আযমের কেশাগ্র ছোঁয়ারও পথ খোলা থাকেনি আর। প্রলম্বিত বা বিলম্বিত বিচার মানেই ঘাতকের শেকড় গজিয়ে যাবার সমূহ সম্ভাবনা। সেই শেকড়ে মানবতার র্যাপিং করার দায়িত্বপ্রাপ্ত র্যাপ-রা ক্ষ্যাপ মারতে আসবেই। সুতরাং—আর বিলম্ব নয়। একাত্তরের/পঁচাত্তরের/দুহাজার চারের ঘাতকদের বিচার প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতেই হবে। এই মামলার সাক্ষী প্রায় সাড়ে চারশ। দশ বছরে জনা পঞ্চাশেক সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে! এই গতিতে চললে মামলা শেষ হতে তো একশো বছর লেগে যাবে! এই ফাঁকে আসামীদের বয়েস নব্বুই পেরুলেই তো কেল্লা ফতে! পিজি হাসপাতালে আমৃত্যু রাজকীয় অতিথির জীবন!
২১ আগস্ট স্মরণে পাঠকবন্ধুদের জন্যে দশ বছর আগে লেখা আমার সেই ছড়াটা এখানে তুলে দিলাম–
[ ও হাসিনা দোহাই লাগে
লুৎফর রহমান রিটন
[২১ আগস্ট ২০০৪ জনসভায় গ্রেনেড হামলার পর বিবিসিতে শেখ হাসিনার কান্না শুনে]
জোট সরকার জামাতিদের দাস ও বশংবদ
‘আওয়ামী লীগ নিধন এবং শেখ হাসিনা বধ’–
ওদের প্রধান কর্মসূচি, তাই তো এ-বাংলায়
আবার একটা ‘পনেরোই আগস্ট’ তৈরি করতে চায়।
বাংলাদেশকে চায় বানাতে পেয়ারা পাকিস্তান
টার্গেট তাই শেখ হাসিনার রক্ত এবং প্রাণ।
ও হাসিনা দোহাই লাগে কান্না রাখো চেপে
এগিয়ে যেতে হবেই তোমায় দৃঢ় পদক্ষেপে।
গ্রেনেড-বোমার ধোঁয়ায় আকাশ হোকনা যতোই ফিকে
বাংলাদেশ আজ তাকিয়ে আছে শুধুই তোমার দিকে।
বিপন্ন আজ বাঙালি আর প্রিয় স্বদেশভূমি
ও হাসিনা রুখে দাঁড়াও, রুখে দাঁড়াও তুমি।
ছিন্নভিন্ন মানবদেহ লুটিয়ে সারি সারি
সহযোদ্ধার রক্তে তোমার লাল হয়েছে শাড়ি।
আহতদের আর্তনাদে খোদার আরশ কাঁপে
নিরপরাধ মানুষগুলো লাশ হলো কার পাপে?
ও হাসিনা দোহাই লাগে কান্না চেপে রাখো
সহযোদ্ধার রক্ত দেখে থমকে যেও নাকো।
এদেশ তোমার বাবার মায়ের ভায়ের রক্তে আঁকা
তুমিই পারো ফের ঘোরাতে ইতিহাসের চাকা।
তোমার চোখে অশ্রু কেনো? অশ্রু ফেলো মুছে
সূর্য উঁকি দিচ্ছে, আঁধার যাবেই যাবে ঘুঁচে।
অমানিশার অন্ধকারে তুমিই আশার আলো
ও হাসিনা আন্দোলনের দীপ্ত মশাল জ্বালো।
একাত্তরের শকুনগুলো বসেছে মসনদে
লিপ্ত ওরা আওয়ামী লীগ আর হাসি না বধ-এ।
ধর্মান্ধ মৌলবাদের থাবার নিচে জাতি
দুঃখিনী মা বাংলা কাঁদে গুমরে, দিবস-রাতি।
ও হাসিনা দোহাই লাগে আর কোরো না ক্ষমা
প্রতিশোধের অগ্নিতে ক্রোধ অনেক হলো জমা।
দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে রোখো ওদের থাবা
ঠিক যেমনটি করেছিলেন মুজিব, তোমার বাবা…।
দেশ ও জাতি সঙ্গী তোমার, তোমার কিসের ভয়?
স্বাধীনতার প্রতীক তুমি, জয় বাংলার জয়।
অটোয়া, কানাডা
