মন্ট্রিয়লের মাতাল হাওয়ায়,কথায় কথায় রাত হয়ে যায়

আলোকচিত্রতাজুল ইমাম

কানাডার নিস্তরঙ্গ প্রবাস জীবনে আমার বন্ধুর সংখ্যা খুব বেশি নয়। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ কানাডা। সেই হিশেবে কানাডাজুড়ে আমার বন্ধুর সংখ্যা বিপুল হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে সেটা হয়নি। কানাডা তো আর ফেসবুক নয় যে পাঁচ হাজার বন্ধু থাকবে। তবে আমি আমার সীমিত সংখ্যক বন্ধু নিয়ে ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’ ভালোই আছি। অটোয়া ছাড়াও কানাডার নানা প্রভিন্সে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে আমার বন্ধুরা। অটোয়া থেকে দু’ঘন্টার ড্রাইভ-দূরত্বের মন্ট্রিয়লেও আমার কিছু বন্ধু আছে। সেই বন্ধুদের সান্নিধ্যের প্রলোভনে পড়ে মাঝেমধ্যেই মন্ট্রিয়ল চলে যাই আমি। এই তো সেদিন, ২২ আগস্ট বিকেলে চলে গিয়েছিলাম সেখানে। দু’তিনটে অসাধারণ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিবস আর অপরূপ মদিরাসুষমারঞ্জিত ঝিঁঝিঁডাকা গাঢ়তমিস্রঘন রাত্রির কোলাহল গায়ে মেখে অটোয়া ফিরে এসেছি।

মন্ট্রিয়লের স্মৃতির পাতা উল্টাতে গেলে সবার আগে যে স্মৃতিটা সামনে এসে দাঁড়ায় সেটা ২০০৪ সালের। মন্ট্রিয়ল নিবাসী পারকেশন আর্টিস্ট বাবলু এক বিকেলে ফোন করে বললো– তোমার সঙ্গে কথা বলবে এন্ড্রু দা। ফোনের অপর প্রান্তে বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী এন্ড্রু কিশোরের হিরন্ময় কণ্ঠ–অনেকদিন দেখি না তোমাকে। পারলে চলে আসো। দুটো দিন একসঙ্গে কাটাই।

- Advertisement -

সত্যি বলতে কি–বন্ধু এন্ড্রু কিশোরের এরকম আন্তরিক আহবানে হৃদয় আমার ব্যাকুল হয়ে উঠলো। কাজ থেকে জরুরি নোটিশে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে পরের দিন চলে গেলাম শৈল্পিক রসে ধুসর শহর মন্ট্রিয়লে।বহুদিন পর এন্ড্রুর সঙ্গে দেখা হলো। বহুদিন পর তাঁর গান শুনলাম সরাসরি। সেবার ঢাকা থেকে আঁখি আলমগীরও এসেছিলো। সন্ধ্যায় রিহার্সাল রুমে আঁখি আমাকে দেখে এবং আমি আঁখিকে দেখে হইহই করে উঠলাম। ছোট্ট আঁখি ওর মা খোশনূর আলমগীরের সঙ্গে বইমেলায় আসতো। তারপর আমার আঙুল ধরে হাঁটতো মেলার এইপ্রান্ত থেকে ওই প্রান্ত। সেই আঁখি কতো বড় হয়ে গেছে! কতো বিখ্যাত হয়ে গেছে! অডিটোরিয়াম জুড়ে সুন্দরী আঁখির ভক্তের সংখ্যাও দেখলাম বিপুল। এন্ড্রুর সঙ্গে আঁখি একটা ডুয়েট গাইলো–”সব সখিরে পার করিতে নেবো আনা আনা/তোমার বেলায় নেবো সখি তোমার কানের সোনা সখি গো আমি প্রেমের ঘাটের মাঝি/তোমার কাছে পয়সা নেবো না…।” মঞ্চে চাচা-ভাতিজি এন্ড্রু-আঁখি ‘প্রেমিক-প্রেমিকা’র কী অসাধারণ পারফরম্যান্সই না করলো! দেখে তো আমি মুগ্ধ হবোই।

এলিজাবেথ হোটেলের প্রশস্ত কক্ষে দু’দুটো নির্ঘুম রাত এন্ড্রুর সঙ্গে গল্পে আড্ডায় কোনদিক দিয়ে চলে গেলো টেরও পেলাম না। সকালে এন্ড্রুরা ফিরে গেলো। আরো একটা দিন আমার রুম বুকিং দেয়া আছে। আমি সারাদিন ভিনদেশী পর্যটকের মতো ঘুরে বেড়াবো শহরটার এমাথা ওমাথা। তারপর রাতে হোটেলকক্ষে ঘুমিয়ে পরদিন ফিরে যাবো নিজের শহরে। কিন্তু সকাল এগারোটার দিকে সেই হোটেল লবীতে আমার সঙ্গে দেখা করতে এলো অনুজপ্রতীম কবি ও আঁকিয়ে রাকিব হাসান। রাকিব আমার খুবই প্রীতিভাজন। ওর স্ত্রী নাহার মনিকাও একজন লিখিয়ে। গল্প লেখে, কবিতা লেখে। মনিকাও আমার বিশেষ স্নেহভাজন। রাকিব বললো–চলেন, বাসায় চলেন। আমি বললাম–আমার তো এই হোটেলে রুম বুকিং দেয়া আছে আগামীকাল পর্যন্ত। রাকিব বললো–না। আপনি বাসায় চলেন। রুম থেকে লাগেজ নিয়া আসেন। আমি বললাম–মনিকা আর চারণ-চিত্রণকে না দেখে আমি যাবো না ঠিকই। কিন্তু লাগেজটা থাকুক না এখানেই।

রাকিবের সঙ্গে একজন সাংবাদিক ছিলো। রাকিব সেই সাংবাদিককে বললো–দামি হোটেলের আরাম আয়েশ ছেড়ে রিটন ভাই আমার বাড়িতে কষ্ট করে থাকতে যাবেন না আমি জানতাম। স্পষ্ট অভিমান ছিলো ওর কণ্ঠে। ওর সঙ্গী সাংবাদিকটিও বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়লো। যার অনুবাদ–আমিও জানতাম। এমনটাই হবে।

সময়টা অক্টোবর ছিলো। বাইরে প্রচণ্ড শীত আর বরফের ছোবল। রুম থেকে জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে আসি বলে হোটেল লবিতে ওদের বসিয়ে এলিভেটরে চেপে তিনতলায় গেলাম। তারপর খুব দ্রুতই নেমে এলাম নিচে। কাউন্টারে চাবি জমা দিয়ে হ্যান্ড লাগেজ টানতে টানতে রাকিবের সামনে আসতেই শিশুর সরল-নিষ্পাপ হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো রাকিব—আপ্নে পাল্টান নাই রিটন ভাই!আমি বললাম—দামি হোটেলের গুল্লি মারি। তারপর হাসতে হাসতে গিয়ে বসলাম ওর গাড়িতে। সারাদিন সারারাতের দীর্ঘ আড্ডা আর বিস্তর খানাখাদ্যের পর খানিকক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম রাকিব-মনিকাদের ছোট্ট এক বেডের এপার্টমেন্টের লিভিংরুমের ফ্লোরে।রাকিবদের ছোট্ট দুই রাজকন্যার সঙ্গে আমার খুব ভাব হয়ে গেলো। আমি বরিশাইল্লা এক্সেন্টে জিজ্ঞেস করি–অ মনু ডাইলে লবণ দ্যাছো? দুই রাজকন্যা হাসতে হাসতে গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘদিন দুই রাজকন্যা আমাকে দেখলেই বলতো–অ মনু ডাইলে লবণ দ্যাছো? তারপর হিহিহি হিহিহি।

এরপর রাকিবরা বাড়ি পাল্টেছে। ওদের বেডরুমের সংখ্যাও বেড়েছে। আমি মন্ট্রিয়ল গেলে ওদের টুইন কন্যা চারণ-চিত্রণের বেড রুমটি আমার জন্যে বরাদ্ধ হয়ে যায় এখন। ছোট্ট চারণ-চিত্রণ ধাঁই ধাঁই করে বড় হয়ে যাচ্ছে!

২০০৯ সালের মধ্য জুনে মন্ট্রিয়লে নিজের একটা গ্যালারি বা স্টুডিও উদ্বোধনের আয়োজন করেছিলো রাকিব-মনিকা জুটি। রাকিবের একক চিত্রপ্রদর্শনীর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করেছিলো স্টুডিও ‘উঠান’। সেই অনুষ্ঠানে টরন্টো-অটোয়া-মন্ট্রিয়ল ছাড়াও নিউইয়র্ক থেকে এসেছিলেন সাহিত্য ও শিল্পানুরাগী একগুচ্ছ উজ্জ্বল-উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত নারীপুরুষ। চিত্রপ্রদর্শনীর পর অতিথিদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো মন্ট্রিয়লের বিখ্যাত পার্ক বোয়া দ্য লিয়েজ-এর চমৎকার একটা কটেজে। সেখানে অতিথিদের জন্যে অপেক্ষা করছিলো দু’রাত দুদিনের প্রায় নির্ঘুম ‘অরন্যবাস’-এর আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা। হইহুল্লোড় আড্ডায়-পানে-গানে-ফানে দু’টোরাত দু’টোদিন কোন দিক দিয়ে কেটে গেলো আমরা টেরই পাইনি। সেই থেকে শুরু আমাদের বাৎসরিক ‘অরন্যবাস’। অরণ্যে, আবার অরণ্যে, উঠান থেকে অরন্যে ইত্যাদি শিরোনামে এ পর্যন্ত পাঁচটি আড্ডা হয়েছে মন্ট্রিয়লে। ভ্যেনু সেই বোয়া দ্য লিয়েজ-এর দোতলা কটেজ। যার সামনে পেছনে অজস্র বৃক্ষ আর পত্রপল্লবের কোলাহল মিশ্রিত সবুজ গন্ধমাখা আলো আর ছায়ার অপরূপ বিন্যাস। যেখানে আমাদের ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’গুলো আশ্চর্য এক মাদকতা মেশানো হুল্লোড় নিয়ে জেগে থাকে।

প্রবাসের ছকেবাঁধা একঘেঁয়ে জীবনটা পানসে হয়ে যায় অজান্তেই। তখন সেই পানসে হয়ে যাওয়া জীবনে নতুন কিছু মরিচ-তেঁতুল আর গুড়ের মিশেল দিতে হয়। নতুন স্বাদের সৌরভে জীবনটা তখন অনেক টেস্টি হয়ে ওঠে। রাকিবদের পঞ্চম আড্ডায় শামিল হতে গত ২২ আগস্ট তাই তো গিয়েছিলাম প্রিয় মন্ট্রিয়ল শহরে। ২২-২৩-২৪ আগস্টের শুক্র-শনি-রবি এই তিনদিনের মন্ট্রিয়ল নিবাস আমাদের নিস্তরঙ্গ প্রবাস জীবনে সঞ্জীবনী সুধা ঢেলে দিয়েছে। মন্ট্রিয়লের ব্যোয়া দ্য লিঁয়েজে পার্কের বিশাল সেই কটেজটা এবারও ভাড়া করে রেখেছিলো মনিকা-রাকিবরা। ওখানে অটোয়া-টরন্টো-মন্ট্রিয়লের আড্ডাবাজদের সঙ্গে আমেরিকা থেকেও যুক্ত হয়েছিলেন কতিপয় আড্ডারু। প্রতিবারের মতো এবারো এই আড্ডায় অংশ নিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছিলেন কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত এবং তাঁর স্ত্রী পূরবী বসু। জ্যোতিপ্রকাশ এই আড্ডার অলিখিত সভাপতি। সকলের মান্যজন। এবারের আড্ডার নাম ছিলো ‘উঠান থেকে অরন্যে’। আড্ডায় আড্ডায়,গল্পে-কবিতায়,-গানে গানে, পানে পানে, আর ফানে ফানে কোন দিক দিয়ে যে দিন গড়িয়ে রাত নেমেছে আর রাত পেরিয়ে ভোর হয়েছে তা টেরই পাওয়া যায়নি। শনিবার রাতটি ছিলো ‘সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে’ গাঁথা। নজরুল গীতির তারকা শিল্পী ফেরদৌস আরা ব্যাক্তিগত কাজে টরন্টোতে ছিলেন। তিনিও এসে শামিল হলেন সেই আড্ডায়। তাঁর আগমনে আমাদের বোয়া দ্য লিয়েজ পার্কে নতুন একটা ফুল যেনো ফুটে উঠলো সহসা। বাংলা সিনেমার স্নিগ্ধ নায়িকার মতো দেখতে রূপসী এই গায়িকার কণ্ঠসুধা আমরা উপভোগ করেছি মধ্যযামিনী পেরিয়ে বলা চলে ভোর পর্যন্ত। ফেরদৌস আরা বড় শিল্পী। বড় শিল্পীর বড় মনের পরিচয় পেয়েছে সবাই সেই রাত্রিতে। অসীম ধৈর্য তাঁর। মাইক্রোফোনে গোলযোগ দেখা দিয়েছিলো তাঁর পরিবেশনার সময়টাতেই, একাধিকবার। তিনি কোনো রকম বিরক্তি প্রকাশ না করেই পরিস্থিতি সামলে নিয়েছেন। তিনি গাইলেন–লাইলি তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনু গো আঁখি খোলো, একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ওগো বন্ধু কাছে থেকো কাছে থেকো। আমার অনুরোধে গাইলেন—কুহু কুহু কুহু কুহু কোয়েলিয়া কুহরিলো মহুয়া বনে মহুয়া বনে। আহা! ঝিঁঝিঁ ডাকা নিকশ আঁধারে আমাদের সেই ঘন অরণ্যে মহুয়ার নেশা ধরানো সেই গান। গানের পর্ব শেষ হলে সবাই যখন ডিনার সারছে তখন সেহরী টাইম। ঘড়িতে সময় ভোর চারটা! ফেরদৌস আরার আগে মন্ট্রিয়লের তিনকন্যা রুমা-অনুজা আর সোমার গানেও মুখর ছিলো পরিবেশ। বিশেষ করে সোমার রবীন্দ্রসঙ্গীত সবার মন ভরিয়ে দিয়েছিলো। গেলোবার ওকে ওর বাড়ি থেকে আনতে গিয়েছিলাম রাকিবের সঙ্গে। রাকিবের কাছেই জেনেছিলাম মেয়েটি সন্তান সম্ভবা। সে কারণেই ওকে আনতে যাওয়া। প্রেগনেন্ট মেয়েদের প্রতি আমার বাড়তি একটা মায়া এবং শ্রদ্ধা থাকে। এবার সঙ্গে ওর বাচ্চাটা ছিলো। একটা স্ট্রলারে বসে আমার দিকে খুব ঔৎসুক্য নিয়ে তাকাচ্ছিলো বারবার, সোমার এইটুকুন ছেলেটা। আমি ওর নাক টিপে আদর করে বলেছিলাম—ওরে পিচ্চি তোকে আমি দেখেছি এক বছর আগে, তুই তখন তোর মায়ের পেটে ছিলিরে! সোমা খুব হাসছিলো তখন। নিউইয়র্ক থেকে সস্ত্রীক এসেছিলো তাজুল ইমাম। তাজুল ইমামের গান সবাইকে মাতিয়ে দিয়েছিলো বললে কম বলা হবে। বলা উচিৎ–তাজুলের গান নাচিয়ে দিয়েছিলো রীতিমতো। তাজুল ইমাম সদানন্দ। সত্যিকারের বহুমুখী প্রতিভা। গাইতে পারে, আঁকতে পারে, লিখতে পারে আর পারে অবিরাম কৌতুক করতে। তাজুলের উপস্থিতি আড্ডায় প্রাণের সঞ্চার করে।

বিটিভির এককালের প্রতিশ্রুতিশীল অভিনেত্রী আমাদের বন্ধু শান্তা ইসলামের সঙ্গে দেখা হলো দীর্ঘকাল পর, এই আড্ডার সুবাদে। শান্তা এসেছিলো টরন্টো থেকে ওর পুত্র সৌমিককে নিয়ে। সৌমিককে আমি দেখেছিলাম যখন সে এই এতোটুকুন ছিলো। এখন টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। সময় কতো দ্রুত বয়ে চলে! আমরা বুড়ো হয়ে যাচ্ছি! আমার কেন্দ্রীয় ছোটভাই (বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সুবাদে)এবং আমার পত্রিকা ‘ছোটদের কাগজ’এর ‘মৃদু ভালোলাগা মৃদু মন্দলাগা’ লেখক মৃদুল আহমেদ এসেছিলো নিউইয়র্ক থেকে। প্রচন্ড আড্ডাবাজ আর তুমুল মেধাবী ছেলেটা। গান গায় ছবি আঁকে গল্প-ছড়া লেখে আরো কতো কী যে করে! শনিবার রাতে শান্তার সঙ্গে ‘যুদ্ধ এবং যুদ্ধ’ নাটকের পাঠাভিনয়েও অংশ নিলো।

শনিবার বিকেল তিনটে থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ম্যারাথন সাহিত্য সভা চলছিলো। আমি সেখানে অল্প কিছুক্ষণ থেকেছি। সাহিত্যপাঠের আনুষ্ঠানিকতা আমাকে টানে না। রাকিবদের এই আড্ডায় গেলো বছর নাছোড় একজন সাহিত্যরসিক নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে প্রায় ঘন্টাকালব্যাপি স্বরচিত প্রবন্ধ পাঠ করেছিলো! এই জীবনে জোর করে কেউ আমাকে নিজের লেখা কবিতা কিংবা গল্প-প্রবন্ধ শোনাতে পারেনি। তবে মন্ট্রিয়লে সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিলো এবারো। সাহিত্যের নামে মানুষকে বিরক্ত করার অধিকার কে কাকে দিয়েছে? আমি তাই কিছুক্ষণ অবস্থানের পর সটকে পড়েছি। তবে এই কিছুক্ষণের মধ্যেই নাহার মনিকা আর তুষার গায়েনের কবিতা এবং মুফতি ফারুকের গল্প পাঠ শুনেছি অমনোযোগী শ্রোতা হয়ে। শুনেছি সকাল অনন্তের চমৎকার আবৃত্তি। বাংলা একাডেমীর বইমেলা, নিজের বই, প্রকাশক আর বইমেলার সময় পত্রিকায় বইয়ের বিজ্ঞাপন বিষয়ে কিছু ভ্রান্ত তথ্য দিচ্ছিলেন সালমা বানী। খুব ঘনিষ্ঠ ভাবে বিষয়গুলো জানি বলেই আমি তার কিছু কিছু খন্ডন করার চেষ্টা করেছি। বিশাল প্রবন্ধ আর দীর্ঘ গল্পপাঠ শোনার চাইতে লেখকদের সঙ্গে আড্ডা দিতে বরং আমি বেশি সাচ্ছন্দ বোধ করি। পাঠ আমি আমার মতোন করে করি। আমি পাঠ করি আমার রুচি ইচ্ছে আর প্রয়োজন অনুসারে। পাঠের ক্ষেত্রে বা শ্রুতির ক্ষেত্রে জবরদস্তি আমার অপছন্দ। আড্ডা তারচে বহু আকাঙ্খিত ও প্রার্থিত। অপরাহ্ন সুসমিতো, ইকবাল কবীর এবং ইফতেখার হোসেনের সঙ্গে এক সন্ধ্যায় বিস্তর গল্প করেছি রাকিবের স্টুডিও উঠান-লাগোয়া পার্কিং লটে হাঁটতে হাঁটতে। আমি সিগারেট টানি না কিন্তু ওরা তিনজন টানতে টানতে কাহিল না হওয়া পর্যন্ত থামে না! সিলেটের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখক তাজুল মোহাম্মদের সঙ্গে আড্ডা দিতেও আমার ভালো লাগে। এই লোকটার সারল্য আর সিলটি এক্সেন্টে শুদ্ধ বাংলা উচ্চারণসমৃদ্ধ কথোপকথন আমার ভীষণ প্রিয়।

মন্ট্রিয়লের তরুণ কবি মাশরাফ মাহমুদ আমাকে ওর একটা কবিতার বই উপহার দিয়েছে। বইটা এখনো পড়া হয়নি। এবারের মন্ট্রিয়ল যাত্রা এবং অটোয়া ফেরার সময় আমার সঙ্গী ছিলো মেসবা আলম অর্ঘ্য নামের এক তরুণ কবি। ছটফটে হাসিখুশি স্বভাবের অর্ঘ্য গদ্য কিংবা কবিতায় নতুন ভাষাভঙ্গি প্রয়োগের ব্যাপারে দেখলাম খুবই আগ্রহী এবং কনফিডেন্ট।

এবার খুব মিস করেছি ইকবাল হাসান আর সুমন রহমানকে। ২০০৯ সালের প্রথম আড্ডায় আমরা খুব মজা করেছিলাম। গত আড্ডায় সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলালও ছিলেন। ছিলেন সঙ্গীতশিল্পী তপন চৌধুরী। এবার ওদের দেখলাম না। টরন্টো থেকে দেলওয়ার এলাহী এসেছিলো। দেলওয়ারকে আমি খুব পছন্দ করি তাঁর বিস্ময়কর সারল্যের কারণে। এক গাঢ়ঘনঅন্ধকারমোড়া মধ্যরাতে পার্ক ঘেঁষা প্রেইরি নদীর তীরে বসে দেলওয়ারের সঙ্গে পুরনো আধুনিক বাংলা গান নিয়ে কতো যে গালগল্প হলো! মুখে মুখে প্রিল্যুড ইন্টারল্যুড মিউজিকসহ তা দ্বৈত কণ্ঠে গীতও হলো। আমাদের একমাত্র সঙ্গী বা শ্রোতা ছিলো তুষার গায়েন। এক পর্যায়ে একদঙ্গল মশা আমাদের সমবেত সঙ্গীত শোনাতে এতোটাই ব্যাকুলতা প্রকাশ করতে থাকলো যে আমরা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হলাম। দেলওয়ার বারবার থান্ডার বে তে থাকা ইকবাল হাসানকে স্মরণ করছিলো। এটা ঠিক যে ইকবাল এলে আমিও আরো বেশি আনন্দ পেতাম। আড্ডার সঙ্গী হিশেবে ইকবাল হাসান সত্যিই চমৎকার।

নিউইয়র্কের মুস্তাফা আরসাদ তারু একজন চারু ও কারুশিল্পী। এসেছিলেন সপরিবারে। আমাকে জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্‌ক্তি উৎকীর্ণ একটা নেমপ্লেট ধরণের বস্তু উপহার দিয়েছেন। অটোয়া এসে দেখি তাতে বেশ ক’টা বানান ভুল। ওখানে মুদ্রিত তিনটে চন্দ্রবিন্দুর দুটো চন্দ্রবিন্দুই বিন্দুহীন! (ভাই তারু/পিয়ো মাত ইত্‌না দারু। হাহ হাহ হাহা।) গানপ্রিয় তারুও ভীষণ আড্ডাবাজ ও হাসিখুশি মানুষ। এই তারুর প্ররোচনা ও কুবুদ্ধিতে আমাদের কয়েকজনকে বৃক্ষ হিশেবে প্রদর্শন করেছে তাজুল ইমাম। কিংবা বলা যায় পাঁচটি বৃক্ষকে আমাদের নামে নামকরণ করেছিলো তাজুল। যেমন রাকিব বৃক্ষ, মনিকা বৃক্ষ, জ্যোতি বৃক্ষ, পূরবী বৃক্ষ এবং রিটন বৃক্ষ। নামকরণকৃত সবক’টা বৃক্ষই লম্বা উঁচু দীর্ঘ। কিন্তু ‘রিটন বৃক্ষ’টা খাটো বেঁটে ছোট। কী অবিচার!! প্রকৃতি আমাকে লম্বাকৃতি হতে বাধ সেধেছিলো। তাতে আমার কোনো হাত ছিলো না। আমি যে যথেষ্ঠ লম্বা নই সেটা অনেক কষ্টে ভুলতে পেরেছিলাম। কিন্তু তাজুল-তারুদের যৌথ দুশমনি আমার সেই বেদনার স্মৃতিকে পুনজাগরুক করেছে! অবশেষে ভগ্ন হৃদয়ে আমি আবিস্কার করেছি নামকরণকৃত আকারে অহেতুক লম্বা বৃক্ষগুলো সীমিত পত্রপল্লবে ছাওয়া, বাকল খসে যাওয়া! তুলনায় ছোট বৃক্ষটি সবুজপত্রপল্লবে ঠাঁসা, সজীব সতেজ আর প্রাণবন্ত, এককথায় খাসা! এর বাকলও বিপুল তারুণ্যপ্লাবিত এবং অপেক্ষাকৃত মসৃণ! আমার মনখারাপের ব্যাপারটা উপলব্ধি করে পার্কের পাতাগন্ধী উদাসী বাতাস আমার কানে কানে ফিসফিস করে বলেছিলো–‘ফলবান বৃক্ষেরা লম্বা নয়। কিন্তু তারা সুঠাম। ফলভারে নত এবং ঋজু।’ আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছিলাম মন্ট্রিয়লের মানুষগুলোর মতো এর সবুজ প্রকৃতি আর বাতাসও দারূণ বন্ধুবৎসল! সেই কারণেই মন্ট্রিয়লকে আমার এতো ভালো লাগে!

- Advertisement -

Read More

Recent