
বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন শুল্কনীতি এবং সম্ভাব্য বাণিজ্য সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ ২০২৬ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেছে। “আ প্ল্যান টু প্রোটেক্ট অন্টারিও” শিরোনামের এই বাজেট কেবল একটি আর্থিক নথি নয় বরং এটি অর্থনৈতিক প্রতিরোধ, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবিলার একটি কৌশলগত রূপরেখা।
বাজেটটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে, যখন বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবেশ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্যিক অবস্থান এবং সম্ভাব্য শুল্ক নীতির প্রভাব এখনও আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিফলিত হচ্ছে। এই বাস্তবতায় অন্টারিও সরকার আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নিতে চেয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য প্রদেশটি ১২.৩ বিলিয়ন ডলার ঘাটতির পূর্বাভাস দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা কম। তবে ২০২৬-২৭ সালে ঘাটতি বেড়ে ১৩.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে এটি ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক চাপের একটি ইঙ্গিত। এরপর ২০২৭-২৮ সালে ঘাটতি কমে ৬.১ বিলিয়ন ডলারে নামার আশা করা হচ্ছে, এবং ২০২৯ সালে ৬০০ মিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ, স্বল্পমেয়াদে ব্যয় বৃদ্ধি হলেও দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
বাজেটে সাধারণ নাগরিকদের জন্য কিছু উল্লেখযোগ্য সুবিধা রাখা হয়েছে। নতুন বাড়ি ক্রেতাদের জন্য এইচএসটি রিবেট বাড়ানো হয়েছে ১৫ লাখ ডলার পর্যন্ত মূল্যের বাড়ির ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১,৩০,০০০ ডলার পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হবে। তবে বাড়ির মূল্য যত বাড়বে, রিবেটের পরিমাণ তত কমবে।
এছাড়া গণপরিবহন ব্যবস্থায় “ওয়ান ফেয়ার” কর্মসূচির মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ানো হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় যাত্রীরা একাধিক ট্রানজিট ব্যবস্থায় ভ্রমণ করলেও একবারই ভাড়া পরিশোধ করতে হয়। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, চালুর পর থেকে এই উদ্যোগে নাগরিকরা প্রায় ২৩৩ মিলিয়ন ডলার সাশ্রয় করেছেন যা বছরে একজন যাত্রীর জন্য গড়ে ১,৬০০ ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
অন্টারিওর অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো ছোট ব্যবসা। তাদের জন্য কর হার ৩.২% থেকে কমিয়ে ২.২% করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালের জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে। এই সিদ্ধান্তের ফলে প্রতি বছর একটি ছোট ব্যবসা গড়ে প্রায় ৫,০০০ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় করতে পারবে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য এই করছাড় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রণোদনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী পিটার বেথলেনথালভি বাজেটের ভূমিকায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, অন্টারিও এখনও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে নতুন চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। তাই সরকার এখনই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে যাতে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও সুরক্ষিত থাকে।
এই বাজেটের মূল দর্শন হলো “প্রতিরোধের মাধ্যমে অগ্রগতি”। একদিকে যেমন পরিবার ও ব্যবসার ব্যয় কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ধাক্কা সামলানোর জন্য ঘাটতি বাড়ানোর ঝুঁকিও নেওয়া হয়েছে।
অন্টারিও সরকার একটি ভারসাম্যপূর্ণ পথ বেছে নিয়েছে স্বল্পমেয়াদে আর্থিক সহায়তা দিয়ে অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তবে এই পরিকল্পনার সাফল্য অনেকাংশেই নির্ভর করবে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির ওপর।
২০২৬ সালের বাজেট অন্টারিওর জন্য একটি সতর্ক কিন্তু কৌশলগত পদক্ষেপ যেখানে অনিশ্চয়তার মাঝেও স্থিতিশীলতা খোঁজার চেষ্টা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
