
বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে আগ্রহ মরে গেছে বহু আগেই, তারপরও মাঝেমধ্যে দেখা হয়, দেখতে হয়, বেশিরভাগ সময়ই আগ্রহটা চুপসে যায় এবং সময়ের অপচয়ের জন্য নিজেকে দায়ি করে সান্তনা খুঁজি। “বনলতা এক্সপ্রেস” দেখতে গিয়ে একই অভিজ্ঞতা হলো। হুমায়ুন আহমেদের গল্পে সমস্যা নতুন না, তাকে চলচ্চিত্রে রূপ দিতে যে মেধা লাগে, সেটা আসলে আমাদের নাই, তারপরও কে যেন বলল, নতুন প্রজন্ম বানিয়েছে, দেখে আসেন, ভালো লাগবে।
ভালো না ছাই! সময়ের এক বিশাল অপচয় কাঁধে নিয়ে বাসায় ফেরা, লাভের লাভ এটাই।
অনেকগুলো ছোটছোট গল্প জোড়াতালি দিয়ে বানানো দুই ঘন্টার অত্যাচার, সবই গাঁজাখুরি, যার শুরু মার্কিন দেশে কর্মরত গনিতের নোবেল পাওয়ার মতো এক বাংলাদেশি অধ্যাপক কর্তৃক ট্রেনের কামরায় আসা নতুন যাত্রীর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া তাচ্ছিল, যা কিনা পুরো সিনেমাজুড়ে বহমান ছিল। সেই অধ্যাপক, গোয়েন্দা সিনেমার মতো পরে জানা গেল ২৪ বছর বয়সী একমাত্র পূত্র সন্তানের লাশকে নিয়ে যাচ্ছে তার গ্রামে দাফন করার জন্য। পূত্রশোকের চিহ্নহীন মধ্যবয়সী একজন মানুষ পুরো সিনেমাজুড়ে যেভাবে ধুমপান আর মদ্যপান করে গেল, তাকে কোন মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে ফেলা সম্ভব না। বস্তুত, কোন চরিত্রেরই মনস্তাত্ত্বিক গঠন ঠিক নেই। পাগলেরও মনস্তত্ত্ব থাকে, হুমায়ূন আহমেদের গল্পের চরিত্রদের সেটাও থাকে না। ফ্রয়েড বেঁচে থাকলে ‘হুমায়ূন’ নামে একটা স্বতন্ত্র ক্যাটাগরি নির্মান করতেন, সন্দেহ নাই।
বাংলাদেশে এবং প্রবাসের বাংলাদেশিরা নাকি সিনেমাটি দলবেঁধে দেখছে। বাংলাদেশে কেন ইনুচের বাটপারি সম্ভব হয়, সেটা পরিষ্কার হলো। এই সিনেমার সকল চরিত্র একেকটা ইনুচ। কোন নায়ক নেই, কোন খলনায়ক নেই, আছে অসংখ্য বাটপার।
দুই.
সুরা আল-কাহফে গুহায় ঘুমিয়ে থাকা কয়েকজন তরুণের কথা আছে, যারা কিনা ৩০৯ বছর ঘুমিয়ে থাকার পরে লোকালয়ে এসে তাদের ঘুম-পূর্ববর্তী সময়ের সাথে বর্তমানকে মেলাতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়ে পড়ে; প্রধানমন্ত্রী তারেকের কারবার দেখে সারাদেশের অসংখ্য গ্রামের মতো আক্কেলপুর উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের মানুষদেরও ওই গুহাবাসী তরুণদের কথা মনে পড়ে গেল, তার কথা-বার্তা, চাল-চলন সবই বর্তমানের সাথে বেমানান–কোদাল হাতে খাল খনন করছে আর পাশে দাড়িয়ে আছে দৈত্যাকার এক্সকাভেটর, বাঙালিরা আদর করে ভেপু বলে ডাকে; গ্রামের মানুষদের মনে হয়, তারেক হয়তো জানে না, শহীদ জিয়া কিংবা খালেদা জিয়ার বাংলাদেশে কৃষকরা যে গরু দিয়ে হাল চাষ করতো কিংবা কোদাল দিয়ে খাল খনন, তা বহুবছর আগেই বিদায় নিয়েছে; কৃষি পুরোটাই যন্ত্র ও টেকনলজি নির্ভর; গ্রামে যে গরু এখন দেখতে পাওয়া যায়, তারা হালচাষ করে না, তারা দুধেল গাই–যন্ত্র চাষ করে, যন্ত্র নিড়ানি দেয়, যন্ত্রই ধান তোলে, মাড়াই করে, আর যন্ত্রচালিত গাড়িতে করে ধান চলে যায় অটোমেটিক রাইসমিলে; গ্রামের মানুষ স্বীকার করে এবং তাদের আলোচনায় এটিও উঠে আসে যে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশ কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনই করেনি, কৃষি-অর্থনীতিকে করেছে আধুনিক যন্ত্র-নির্ভর; গ্রামের মানুষ অনেক বেশি অগ্রসর এবং তারা যখন দেখে, দেশের প্রধানমন্ত্রী কোদাল হাতে খাল খনন করছে, তখন তাদের মাথা আউলা হয়ে যায়, তারা বুঝতে পারে না লোকটি এতদিন কোন গুহায় ছিল, তখন তারা নানা কথা বলে, তখন কেউ হয়তো বলে, লোকটি লন্ডনে ছিল, আর তা শুনে কেউ হয়তো বলে, লন্ডনে কি কোদাল দিয়ে খাল কাটে? তখন তারা বিভ্রান্তবোধ করে এবং তাদের মধ্যে কেউ হয়তো তার লন্ডন-প্রবাসী ভাতিজা বা ভাগিনাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন দিয়ে লন্ডনে কোদাল দিয়ে খাল কাটার ইতিহাসটা জানতে চায়, আর সেই প্রশ্ন শুনে লন্ডন-প্রবাসী ভাতিজা বা ভাগিনা হয়তো বলে, লন্ডনে কোদাল নাই; তখন গ্রামবাসীর মধ্যে সন্দেহ ছড়িয়ে পড়ে যে, তাদের প্রধানমন্ত্রী আসলে লন্ডনে ছিল নাকি অন্য কোন গ্রহে; বস্তুত, গ্রামের চায়ের আড্ডা জমে ওঠে লন্ডন ও কোদাল নিয়ে এবং মসজিদের ইমাম সাহেব তাতে যুক্ত হয়ে বলে, আল্লাহর অপার মহিমা, তিনি হয়তো কোরআনে বর্ণিত সেই গুহার মতো কোনো গুহায় ছিলেন; এভাবে, ইমামের কথায় গ্রামের মানুষ পুণরায় বিভ্রান্তবোধ করে এবং তারা পরষ্পরের দিকে তাকায়; এভাবে রাত গভীর হয় এবং কোদাল সংক্রান্ত আলোচনায় তারা একসময় ক্লান্তবোধ করে এবং পরদিন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে প্রত্যেকে যে যার বাড়িতে ফিরে যায়।
ক্যালগেরি, আলবার্টা
