
কানাডায় দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ফেডারেল সরকারের বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) ভর্তুকি কর্মসূচি পুনরায় চালু হওয়ায় দেশটির অটোমোবাইল বাজারে নতুন প্রাণ ফিরে এসেছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে কানাডাজুড়ে নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রণোদনা, তুলনামূলক কমে আসা মূল্য এবং পরিবেশবান্ধব যানবাহনের প্রতি জনগণের আগ্রহ সব মিলিয়ে এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কাজ করেছে।
কানাডার সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মার্চ মাসে দেশটিতে মোট ২১ হাজার ৫৪৭টি নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরের পর এটিই সর্বোচ্চ বিক্রির রেকর্ড। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ডিসেম্বরের পরপরই সরকার ইভি রিবেট বা ভর্তুকি কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছিল, যার ফলে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে বাজারে কিছুটা স্থবিরতা দেখা দেয়।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, আগের কর্মসূচির বরাদ্দ শেষ হয়ে যাওয়ায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ভর্তুকি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে অটোয়া ১৬ ফেব্রুয়ারি পুনরায় নতুন ইভি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ভর্তুকি চালু করে। এই কর্মসূচির আওতায় ক্রেতারা নতুন বৈদ্যুতিক গাড়ি কিনলে সর্বোচ্চ ৫ হাজার কানাডিয়ান ডলার পর্যন্ত প্রণোদনা পাচ্ছেন। দেখা গেছে, মার্চে বিক্রি হওয়া নতুন ইভির সংখ্যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৭৫ শতাংশ বেশি। শুধু তাই নয়, ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় মার্চে বিক্রি বেড়েছে ৮৩ শতাংশ। অর্থাৎ, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাজারে বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটেছে।
পরিষ্কার জ্বালানি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লিন এনার্জি কানাডার নীতি ও কৌশল বিভাগের পরিচালক জোয়ানা কিরিয়াজিস মনে করেন, শুধুমাত্র সরকারি ভর্তুকিই এই বিক্রিবৃদ্ধির একমাত্র কারণ নয়। তাঁর ভাষায়, “নতুন গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে ৫ হাজার ডলার ভর্তুকি অবশ্যই বড় প্রণোদনা। তবে একই সঙ্গে মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির গড় দাম সাধারণ গাড়ির গড় মূল্যের কাছাকাছি চলে এসেছে। ফলে ক্রেতারা ইভির দিকে ঝুঁকছেন।”
গত কয়েক বছরে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, ব্যাটারির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং চার্জিং অবকাঠামোর সম্প্রসারণও ইভির জনপ্রিয়তা বাড়াতে সহায়তা করেছে। আগে যেখানে বৈদ্যুতিক গাড়িকে উচ্চমূল্যের বিলাসপণ্য হিসেবে দেখা হতো, এখন তা ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে চলে আসছে। তবে আশাব্যঞ্জক প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কানাডার সামগ্রিক গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির অবস্থান এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। মার্চ মাসে দেশটিতে বিক্রি হওয়া মোট নতুন গাড়ির মধ্যে ইভির অংশ ছিল মাত্র ১২ শতাংশের কিছু বেশি। অর্থাৎ, বাজারে প্রচলিত পেট্রোল ও হাইব্রিড গাড়ির আধিপত্য এখনো বজায় রয়েছে।
এদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে সরকার যে বাধ্যতামূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল, সেটিও সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি প্রদেশগুলোর সরকার ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর চাপের মুখে গত শরতে এই নীতির বাস্তবায়ন স্থগিত করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকেই কানাডায় বিক্রি হওয়া নতুন গাড়ির অন্তত ২০ শতাংশ বৈদ্যুতিক হওয়ার কথা ছিল। এছাড়া ২০৩৫ সালের মধ্যে শতভাগ নতুন গাড়িকে বৈদ্যুতিক করার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছিল।
অটো শিল্প বিশ্লেষকদের মতে, বাস্তবতা বিবেচনায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এখনো বেশ চ্যালেঞ্জিং। কারণ কানাডার বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক অঞ্চল, শীতপ্রধান আবহাওয়া এবং চার্জিং স্টেশনের সীমাবদ্ধতা এখনো অনেক ক্রেতাকে প্রচলিত জ্বালানিচালিত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল করে রেখেছে।
তবে সামগ্রিক গাড়ি বিক্রির দিক থেকেও মার্চ মাস ছিল ইতিবাচক। স্ট্যাটিস্টিকস কানাডার তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে সব ধরনের নতুন গাড়ি বিক্রি ৪২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, শুধু ইভি নয়, পুরো অটোমোবাইল বাজারেই চাহিদা বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, সুদের হার স্থিতিশীল হওয়া, সরবরাহ সংকট কিছুটা কমে আসা এবং নতুন মডেলের আগমন এসব কারণও গাড়ির বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তবে বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে সরকারি নীতি ও আর্থিক সহায়তাই এখনো সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। তাই ভবিষ্যতে সরকার যদি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল ভর্তুকি নীতি বজায় রাখতে পারে, তাহলে কানাডায় ইভি বাজার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হতে পারে।
