সিআরটিসির নিয়মের সমালোচনা মার্কিন স্ট্রিমিং শিল্পের

Aerial view of firefighters and trainees looking up at a firefighter descending a tall ladder from a tower.
কানাডার সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিআরটিসি সম্প্রতি যে নতুন রাজস্ব নীতি ঘোষণা করেছে তা ঘিরে দেশটির সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং শিল্পের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে

কানাডার সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (সিআরটিসি) সম্প্রতি যে নতুন রাজস্ব নীতি ঘোষণা করেছে, তা ঘিরে দেশটির সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং শিল্পের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিওসহ বড় আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোকে কানাডা থেকে অর্জিত রাজস্বের ১৫ শতাংশ বাধ্যতামূলকভাবে কানাডিয়ান কনটেন্ট তৈরিতে বা সমর্থনে বিনিয়োগ করতে হবে। এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন মার্কিন স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো তীব্র আপত্তি জানিয়েছে, অন্যদিকে কানাডার শিল্প ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো একে দীর্ঘদিনের দাবি পূরণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে।

সিআরটিসি বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। সংস্থার মতে, ডিজিটাল যুগে আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যাপক বিস্তারের ফলে কানাডার স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাতারা প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন। ফলে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও নিজস্ব গল্প বলার ধারাকে টিকিয়ে রাখতে বিদেশি স্ট্রিমিং সেবাগুলোর কাছ থেকেও অবদান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

- Advertisement -

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, স্ট্রিমিং প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কানাডীয় আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ স্থানীয় সংবাদ, টেলিভিশন অনুষ্ঠান, চলচ্চিত্র, ফরাসি ভাষার কনটেন্ট এবং আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উপস্থাপনাকে সমর্থন করার জন্য ব্যয় করতে হবে। এই হার ২০২৪ সালে নির্ধারিত অবদানের তুলনায় প্রায় তিনগুণ বেশি।

তবে এই সিদ্ধান্তে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক লবি সংগঠন ‘দি মোশন পিকচার অ্যাসোসিয়েশন’ (এমপিএ), যারা নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিওসহ একাধিক আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সেবার প্রতিনিধিত্ব করে। শুক্রবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি দাবি করে, এই নতুন নীতি নজিরবিহীন এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলোর ওপর বৈষম্যমূলক আর্থিক চাপ সৃষ্টি করবে।

এমপিএর ভাষ্য অনুযায়ী, কানাডা ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মার্কিন স্টুডিও এবং স্ট্রিমিং সেবাগুলো প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ কানাডার চলচ্চিত্র ও টিভি শিল্পে বিনিয়োগ করে থাকে। তাদের মতে, এই অতিরিক্ত বাধ্যবাধকতা ব্যবসার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেবে এবং ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।

সংগঠনটি আরও বলেছে, বর্তমানে আমেরিকান স্টুডিওগুলো কানাডিয়ান শিল্পী, প্রযুক্তিবিদ এবং প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কাজ করে হাজার হাজার কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। সেই বাস্তবতায় নতুন এই নীতি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এর আগেও ২০২৪ সালে সিআরটিসি আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি আর্থিক অবদানের নীতি প্রণয়ন করেছিল। সেই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে অ্যাপল, অ্যামাজন এবং স্পোটিফাই। তাদের অভিযোগ, এসব নীতি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর অযৌক্তিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

অন্যদিকে কানাডার সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল শিল্পের প্রতিনিধিরা বলছেন, বহু বছর ধরে দেশের সম্প্রচার খাত স্থানীয় কনটেন্ট নির্মাণের জন্য যে আর্থিক সহায়তা পেয়ে এসেছে, ডিজিটাল যুগে সেই একই দায়িত্ব থেকে আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং কোম্পানিগুলোকে অব্যাহতি দেওয়া যুক্তিসঙ্গত নয়।

তাদের মতে, কানাডিয়ান দর্শক ও গ্রাহকদের কাছ থেকে আয় করা প্রতিষ্ঠানগুলোরও দেশের সংস্কৃতি ও সৃজনশীল খাতের বিকাশে অবদান রাখা উচিত। স্থানীয় প্রযোজক সংগঠনগুলোর দাবি, এই পদক্ষেপের ফলে নতুন শিল্পী, নির্মাতা এবং স্বাধীন প্রযোজনা সংস্থাগুলোর জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে কানাডার নিজস্ব গল্প ও সংস্কৃতির উপস্থিতিও আরও শক্তিশালী হবে।

এই বিরোধ কেবল কানাডার অভ্যন্তরীণ নীতিগত প্রশ্ন নয়; বরং এটি বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর বিতর্কের অংশ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশও ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং সেবাগুলোকে স্থানীয় কনটেন্টে বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতার আওতায় এনেছে। ফলে কানাডার এই পদক্ষেপকে বৈশ্বিক প্রবণতারই একটি ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে আগামী মাসগুলোতে বিষয়টি আদালত, নীতিনির্ধারক এবং শিল্প সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে আরও বড় বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কানাডার এই অবস্থান ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে।

- Advertisement -

Read More

Recent