
কানাডা ডে’র ভয়াবহ বন্যার ধাক্কা সামলাতে এখনও লড়াই করছেন অটোয়ার বহু বাসিন্দা। বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং অবকাঠামোর বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির পর এবার ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে অটোয়া সিটি কাউন্সিল। একই সঙ্গে নগর কর্তৃপক্ষের বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতি ও তৎপরতা নিয়ে যে জনঅসন্তোষ তৈরি হয়েছে, সেটিও প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বুধবার অনুষ্ঠিত সিটি কাউন্সিলের বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে মোট আটটি পৃথক প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে চারটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন মেয়র মার্ক সাটক্লিফ। বাকি প্রস্তাবগুলো আনেন কাউন্সিলর শন ডিভাইন, লেইন জনসন এবং থেরেসা কাভানাঘ। এসব সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থিক চাপ কমানো এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় শহরের প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা।
মেয়র মার্ক সাটক্লিফের প্রস্তাবগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য আর্থিক সহায়তার পরিধি বৃদ্ধি। বিশেষ করে যেসব পরিবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে, তাদের জন্য সহানুভূতিমূলক অনুদান দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির পানি দ্রুত সরিয়ে ফেলতে প্রয়োজনীয় ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশন পাম্প কেনার ক্ষেত্রে সহায়তা দেওয়া হবে। পুনর্নির্মাণ প্রক্রিয়া সহজ করতে ভবন ভাঙা, পুনর্নির্মাণ এবং নির্মাণ-সংক্রান্ত বিভিন্ন অনুমতির ফিও মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন ব্যয় অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়ার লক্ষ্যেও একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সিটি কাউন্সিল। অনুমোদিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে : জরুরি পরিকল্পনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা। উদ্ধার কার্যক্রম ও জরুরি আশ্রয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়ন। শহরের স্টর্মওয়াটার বা বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সক্ষমতা পরীক্ষা। ভবিষ্যতে একই ধরনের অতিবৃষ্টির পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুপারিশ তৈরি। কাউন্সিলের সদস্যদের মতে, সাম্প্রতিক বন্যা দেখিয়ে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে চরম আবহাওয়া এখন আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ফলে নগর পরিকল্পনা ও অবকাঠামোতেও নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি।
মেয়র মার্ক সাটক্লিফ আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার জন্য অটোয়া সিটি কর্তৃপক্ষ কানাডিয়ান রেড ক্রসের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলছে। এই সহযোগিতার আওতায় ক্ষতিগ্রস্তরা বিমা দাবির প্রক্রিয়ায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পাবেন। পাশাপাশি প্রকৌশলী, ভবন সংস্কার বিশেষজ্ঞ এবং অন্যান্য পেশাদার সেবার সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তৈরি করা হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সামাজিক ও মানবিক সহায়তাও দেওয়া হবে। মেয়রের ভাষায়, অনেক পরিবার এখনও অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে। তাই শুধু তাৎক্ষণিক সহায়তা নয়, পুনরুদ্ধারের পুরো প্রক্রিয়াতেই তাদের পাশে থাকা প্রয়োজন।
এনভায়রনমেন্ট কানাডার তথ্য অনুযায়ী, কানাডা ডে’তে অটোয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এলাকায় ১১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওইদিন দুপুর ২টার দিকে শুরু হওয়া বৃষ্টিই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে। তবে শহরের সব এলাকায় পরিস্থিতি এক ছিল না। সিটি কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কোর এলাকার পশ্চিমাংশে আরও বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটানিয়া এলাকায় প্রায় পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে ১৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এত স্বল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত সাধারণত ২০০ বছরে একবারের মতো বিরল ঘটনা। এ কারণেই বিদ্যমান ড্রেনেজ ও স্টর্মওয়াটার ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয় এবং অনেক এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়।
বন্যার পর অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেন, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর ছিল না এবং জরুরি সাড়া দিতেও বিলম্ব হয়েছে। সিটি কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন যে, নাগরিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ রয়েছে এবং সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বসহকারে মূল্যায়ন করা হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে কানাডার বিভিন্ন শহরে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। ফলে শুধু ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দিলেই হবে না, বরং শহরের অবকাঠামো, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং জরুরি সেবার সক্ষমতা নতুন বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। অটোয়া সিটি কাউন্সিলের সর্বশেষ সিদ্ধান্তগুলো সেই দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এখন নজর থাকবে, ঘোষিত সহায়তা কত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্তদের হাতে পৌঁছায় এবং ভবিষ্যতের দুর্যোগ মোকাবিলায় এসব পরিকল্পনা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
