একাকী একজন : চার

ছবি আরিফুর রহমান

সাজিদ এত ব্যস্ততায় সময় কাটায়, দিন দিন ব্যস্ততা বাড়ছে বৈ কমছে না। সব সময় মানুষ যেন ওর জন্য অস্থির হয়ে আছে। নিজের জন্য কোনো সময়ই নাই। কিন্তু ওর নিজের মনে অলস সময় কাটাতে খুব ভালো লাগে। দু-একজন খুব কাছের মানুষের সাথে গল্প গাঁথায় ওর স্বাচ্ছন্দ্য। ও বুঝে পায় না। মানুষ কেন ওকে ঘিরে রাখতে চায়। গান করতে গেলে ধাক্কাধাক্কি লেগে যায় মানুষের ওর কাছে আসার জন্য। কিন্তু কিছু তো বলার নাই তাদের। খুব ভালো গান করলেন, কেমন আছেন। এইসব প্রশ্নের বাইরে দু-একজন প্রশ্ন করে ফেলে, ভাবীকে আনলেন না ? আরে ভাবী তো নাই। আমার কোনো ভাই নাই, ভাবী আসবে কোথা থেকে? না মানে আপনার স্ত্রী। হয় নাই। এসব প্রশ্ন কথাবার্তা খুব বোকা বোকা। কেন যে মানুষ এসব কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে এগিয়ে আসে। সাজিদ বুঝতে পারে না। ওর খুব কাছের তেমন কোনো বন্ধু নাই আসলে।
ওর স্বাচ্ছন্দ্য কথা বলায় আবেদিন আহমেদের সাথে, উনার সাথে ও সব রকমের কথাবার্তা বলে বন্ধুর মতন। যদিও দেখাসাক্ষাৎ এখন খুব কম হয়। তবে দেখা হলে দুজনে এমন গল্প জুড়ে দেয় যেন গতকালই দেখা হয়েছে। এছাড়া তাতাইর সাথে কথা বলতে ওর খুব ভালো লাগে। মেয়েটা ছোট কিন্তু বোঝে ভালো। দুষ্টামি, মজা হয় ওর সাথে কিন্তু দেখা হয় কত বছরে একবার। লন্ডনের সময়টা খুব ভালো ছিল। এবার তাতাই আসায় অনেকদিন পর পুরনো দিনের মতন জমেছে। লিমাটা যদি স্বাভাবিক হতো ওর সাথে সুন্দর একটা সম্পর্ক থাকতে পারত কিন্তু ওর সাথে কথা বলা অসম্ভব। কেন যে এমন হয়ে গেল মেয়েটা। গানটা যদি করত। অনেক শুকিয়ে গেছে লিমা। বিয়ে করল না, ও কি সত্যি ভালোবাসে আমাকে ? কি জানি আমার পক্ষে সংসার করা সম্ভব না। আমি আউলা টাইপের মানুষ। এক এক মুচড়ে এক এক জায়গায় চলে যায় আমার জীবন। আমার কি কিছু ঠিক আছে ? বাদশা মিয়ার কথা খুব মনে হচ্ছে। গ্রামে আসার পর। দু-একজনের সাথে কথা বলে জেনেছে ও খুব ভালো গান করত। অথচ এতদিন একসাথে থেকে ওর মুখে গানের সুর শুনলাম না কোনোদিন। বাদশা মিয়ার লেখা গানগুলোয় সুর করেছে সাজিদ অনেক যত্ন করে অনেক দিন ধরে। আধ্যাত্মিক ধরনের অন্যরকম কথা। এবারের অনুষ্ঠানে বাদশা মিয়ার গানের খাতায় পাওয়া গানগুলো গাইবে ঠিক করেছে। এই কয়দিন বেশ ভালো কাটছিল জয় আর তাতাইর সাথে। জয়কে ওর খুব পছন্দ হয়েছে। ওর সাথে গল্প করে মজা পাচ্ছে। তবে জয়ও বিদেশে থাকে। বিভিন্ন দেশে ওর কিছু ভালো বন্ধু আছে। আবেদিন আহমেদ আরো দুজন মানুষ নিয়ে এসেছেন বাসায়। আবেদিন আহমেদের কাজই মানুষ খুঁজে বেড়ানো মনে হয়। আজ নাকি আরো কারা আসছেন বাসায়।
সাজিদ আজ একটু বাজারের দিকে যাবে। সেই যেখানে চা-পানের দোকানটা ছিল। সে জায়গাটা কি তেমনি আছে ? দেখতে যাবে। প্রতিদিন যাই যাই করে আর যাওয়া হচ্ছে না। গল্পে আনন্দে সময় কেটে যাচ্ছে। আগামীকাল গানের অনুষ্ঠান হয়ে গেলে চলে যাওয়া হবে আর কখনো আসা হয় কি না হয়।
কাল রাতের আড্ডাটা ভালো হয়েছে। ভোর হয়ে গেল গল্পে-গল্পে নরওয়ে, কানাডা, লন্ডন, বাংলাদেশের মানুষ মিলে। বিভিন্ন দেশের বহু বিষয়ের অবতারণা হয়েছিল। কোথা থেকে কোথায় যে ছুটে যাচ্ছিল ওদের কথাবার্তা। জিনিয়া মহিলা একজন বিদেশি ভদ্রলোকের সাথে ভালো আছেন। বেশ লাগল। স্যামুয়েল মানুষটা ভালো মনে হলো। খুব হাসি-খুশি।
সাজিদ আর জয় ঘরে এসে আরো অনেক বিষয়ে কথা বলে সকালে ঘুমাল। ওরা যখন জাগল শুনল মেহমানরা এসেছেন। খেয়েদেয়ে বিশ্রাম করছেন। সাজিদ নিজের মতন বেরিয়ে যাচ্ছিল কিন্তু জয়ও ওর সঙ্গী হলো।
ওরা বাজারে বেশ ভালো সময় কাটাল। কালু মিয়ার দোকানের বাক্স কোথাও পাওয়া গেল না। এমনকি সেই ফাঁকা বটতলা জায়গাটাও দোকানপাটে ভরপুর। বিশাল বটবৃক্ষটাও নাই যে ছায়া দিয়ে ছিল বাদশা মিয়ার দোকানটাকে। সাজিদ একটা মিষ্টির দোকান দেখিয়ে জয়কে বলছিল, এইখানে বিশাল বটগাছের নিচে কালু মিয়া চা-পান বিক্রি করত। জয় অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
কালু মিয়া কে ?
এই যে তোমার সামনে দাঁড়ানো।
এরপর নিজের জীবনের গল্প বলতে বলতে অনেক দূরে হেঁটে চলে গিয়েছিল ওরা। প্রায় গ্রামের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত।
পৌষের শীতের আকাশে কুয়াশা ঢাকা পূর্ণিমার চাঁদ হাঁটছিল ওদের সাথে আলো দিয়ে।
ফিরে এসে দেখে আজ কোনো আড্ডা নেই বাড়িতে। যে যার ঘরে ঢুকে পড়েছে। খেয়ে-দেয়ে ওরাও চটপট চলে এসেছিল নিজেদের রুমে।

টরন্টো, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent