নদী আর ডেভিড অফিসে চলে গেলে সারাটা দিন কিটক্যাট একা একা থাকে। ওর নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে আরেকটা বেড়াল নেবার পরিকল্পনা ছিলো নদীদের। কিছুদিন আগে হিউস্টনের শেল্টারে গিয়ে পিচ্চি একটা কালো বেড়ালবাচ্চাকে পছন্দও করে এসেছিলো। কিন্তু পরদিন গিয়ে দেখে ওটা অন্য এক বেড়ালপ্রেমী পরিবার নিয়ে গেছে।
করোনার এই গ্রহণকালে অতিসম্প্রতি ওরা দু’জন সেই একই শেল্টারের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখলো–খুব ছোট্ট দু’মাস বয়েসী পিচ্চি একটা বেড়ালবাচ্চাকে কেউ একজন দিয়ে গেছে। ওজন মাত্র দুই পাউন্ড। ও এতোই ছোট যে ওকে অনায়াসে হাতের মুঠোয় দাঁড় করানো যায়।
কোনো এক নির্দয় মানুষ দুমাস বয়েসী খুদে এই বাচ্চাটাকে শেল্টার থেকে সামান্য দূরের রাস্তায় ফেলে গিয়েছিলো। বাচ্চাটা চিল-শকুনের আক্রমনের শিকার হতে পারতো। কুকুরের খপ্পরে পড়তে পারতো। কিংবা পিষ্ট হতে পারতো গাড়ির চাকায়। এতোগুলো বিপদ মাথায় নিয়ে অবুঝ বাচ্চাটা কাঁদছিলো রাস্তার ওপরে। তাই দেখে কোনো এক হৃদয়বান মানুষ ওকে রাস্তা থেকে তুলে এনে রেখে গেছে শেল্টারে। শেল্টারের লোকজন ওকে সাদরে গ্রহণ করেছে। খাবার এবং চিকিৎসা দিয়েছে। ভ্যাকসিন দিয়েছে। তারপর দিয়েছে টয়লেট ট্রেনিং। তারপর ওর নিউটার সার্জারি সম্পন্ন করে ওদের ওয়েবসাইটে ওর একটা ছবি আপলোট করে জানিয়েছে–আদুরে বেড়ালবাচ্চাটা একটা নতুন বাবা মায়ের জন্যে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।
নদীরা ছুটে গেলো। ওদের দেখে বাচ্চাটা অস্থির হয়ে উঠলো। সে কোলে উঠবে। ওদের সংগে বাইরে যাবে। আগেরবারের মতো বোকামি না করে অনস্পট বাচ্চাটাকে এডপ্ট করলো ওরা। তারপর নিয়ে এলো বাড়িতে। বাড়িতে নিয়ে আসার সময় গাড়িতে অবিরাম ইঁয়ো ইঁয়ো করে কথা বলে গেছে বাচ্চাটা। শেল্টারে অফহোয়াইট বাচ্চাটার নাম রাখা হয়েছিলো ‘স্নো বল’। বাড়িতে এনে ওর নতুন নামকরণ করা হলো ‘ক্যাটস্বি’। কিন্তু পরে সেটা পালটে করা হলো ‘ক্যাটবেরি’। পৃথিবী বিখ্যাত চকোলেট ‘ক্যাডবেরি’র বেড়াল সংস্করণ–‘ক্যাটবেরি’। Kitkat যেমন Kitcat হয়েছে তেমনি Cadburyও হয়েছে Catbury. শুধু একটা অক্ষরের হেরফেরে বদলে গেলো দুইটা চকোলেটের আত্মজীবনী.
কিটক্যাট এমনিতে খুব ভদ্র বেড়াল হলেও ওর একক সাম্রাজ্যে আরেকটা বেড়ালকে সে মেনে নেবে কী না কে জানে! নতুন বেড়ালটার ওপর কিটো জেলাস হয়ে উঠতে পারে। ওকে মারধর করতে বেপরোয়া হয়ে উঠতে পারে। আবার হতে পারে উল্টোটাও।
প্রথম দিনেই তাই কিটোকে একটা ঘরে আটকে রেখে অন্য আরেকটা ঘরে ঠাঁই হলো ক্যাটবেরির। ওর লিটারবক্স খেলনাসামগ্রী খাবার-দাবার-পানির পাত্র সবই আলাদা। ওগুলো আগেই কিনে রাখা হয়েছে।
বাড়িতে এসেই কিটোকে আটকে ফেলায় কিটোর খুব সন্দেহ হলো। ওর বাবা মা তো কখনোই এমনটা করে না! কয়েক মিনিটের মধ্যেই কিটো বুঝে গেলো এই বাড়িতে খুব রহস্যজনক কিছু একটা ঘটছে যেটা কিটোকে জানতে দিচ্ছে না ওরা। রহস্য উণ্মোচনে চোখ-কান-লেজ খাঁড়া করে কিটো পুরো বাড়ি চক্কর দিতে থাকলো। ওদিকে নতুন পিচ্চিটা প্রাণপণে ইঁয়ো ইঁয়ো করে ওকে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি দিতে জোর দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। ওর ইঁয়ো ইঁয়ো শুনে কিটো ওর দরোজায় গিয়ে উঁকি মারতে শুরু করলো। ফ্লোরে মাথা ঠেকিয়ে দরোজার তলা দিয়ে দেখার চেষ্টা চললো–ভেতরে ইঁয়ো ইঁয়ো করা জিনিসটা আসলে কি। বেড়াল তো মিঁয়ো মিঁয়ো করে কিন্তু এইটা করে ইঁয়ো ইঁয়ো। আরেকটা বেড়াল না তো!
নদী বা ডেভিড ইঁয়ো ইঁয়োর ঘরে ঢুকে দরোজা বন্ধ করে দেয়। কিটোকে ঢুকতে দেয়া হয় না সেই ঘরে। কৌতূহলী অতি কিউরিয়াস কিটো বসে থাকে ইঁয়ো ইঁয়োর দরোজায়। এভাবে চললো কয়েকটা দিন। দরোজার ফাঁক দিয়ে কিটো ওর হাত ঢুকিয়ে দেয়। পিচ্চিটা ওর হাতে এসে টোকা দেয়। পিচ্চিটা ওর এইটুকুন হাতটার কিছু অংশ দরোজার তলা দিয়ে বাইরে বের করে। কিটো সেইটা স্পর্শ করে করে দেখে। একটা বেড়াল আরেকটা বেড়ালের গন্ধ টের পায় সবার আগে। কিটোও বুঝে গেছে দরোজার ওপাশে আরেকটা বেড়াল আছে। কিন্তু সেই বেড়ালটাকে দেখা যাচ্ছে না। নদীরা ওকে লুকিয়ে রেখেছে।
একদিন পর ডোর স্টপার দিয়ে ইঁয়ো ইঁয়োর দরোজাটা সামান্য ফাঁক করে রাখে নদীরা। দু’পায়ে দাঁড়িয়ে কিটো সেই ফাঁকে চোখ রেখে আপ্রাণ চেষ্টা করে ভেতরের বেড়ালটাকে দেখতে। ভেতরের বেড়ালটাও সেই সামান্য ফাঁকে এসে কিটোকে দেখে আর ইঁয়ো ইঁয়ো করে।
কিটোকে কিছুটা অভ্যস্ত করে অবশেষে মুখোমুখি করা হলো তাদের।
দুই বেড়ালের প্রথম দেখা। কিটোর চোখ সবুজ আর এইটার হালকা নীল। সামান্য ট্যারা। আমি ওকে টেগরু বললে শার্লি সংশোধনী দিয়ে বলে লক্ষ্মী ট্যারা।
কিটো খুব অবাক হয়ে পিচ্চিটাকে দেখে। পিচ্চিটা দৌড়ে ছুটে আসে কিটোর কাছে। লাফিয়ে পড়ে কিটোর শরীরে। স্বভাবে ভীতু আর ভদ্র কিটো সরে দাঁড়ায়। কিন্তু পিচ্চিটা ছুটে এসে হামলে পড়ে কিটোর ওপর। সাইজে একটা ইঁদুর থেকে খানিকটা বড় নতুনটার খুদে শরীর যেনো বা একটা স্প্রিং। ওটা সারাক্ষণ পিংপং বলের মতো লাফায়। আর লাফটা দেয় সে কিটোর ঘাড়ের ওপর। কিটো ওকে হাত দিয়ে সরিয়ে দেয়। নিজে সরে যায়। কিন্তু পিচ্চিটা নাছোড়বান্দা–আমার সঙ্গে খেলো।
কিটো হাত দিয়ে সরিয়ে দেয় ওকে–বিরক্ত করিস না। যা সর।
কিন্তু পিচ্চিটা কি আর সেই কথা কানে তোলে! দ্বিগুণ শক্তিতে সে লাফিয়ে পড়ে কিটোর ওপর। সে যেনো এক খুদে মাস্তান। এক পর্যায়ে তিতিবিরক্ত কিটো ওকে এক থাবায় পায়ের তলায় নিয়ে আসে। তারপর ঠেঁসে ধরে রাখে। ছাড়া পাবার জন্যে পিচ্চিটা হাত পা ছুঁড়তে থাকে। ইঁয়ো ইঁয়ো করে কাঁদে। কিটো ওকে ছেড়ে দেয়। ছাড়া পেয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে এক হাজার কিলোমিটার ক্ষিপ্রতায় দৌড়ে এসে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ে কিটোর পিঠে। কিটোর লেজে কুটুস করে কামড়ে দিয়ে ছুট লাগায়। কিটো ওর পিছু নেয়। পিচ্চিটা শোকেসের তলায় ঢুকে পড়ে সুড়ুৎ করে। শোকেসের তলাটা একেবারের ফ্লোর ঘেঁষা। কিটোর সাধ্য নেই ওর ভেতরে ঢোকার। সে থাবা মারার চেষ্টা করে। কিন্তু পারে না।
কিটো সরে যায় পাশের রুমে। শোকেসের তলা থেকে বেরিয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় পিচ্চিটা কিটোর কাছে। তারপর এক লাফে কিটোর ঘাড়ে।
কিটো ওকে দৌড়ানি দেয়। দৌড়ানি খেয়ে আবার সে পালিয়ে আসে।
এভাবেই চলছে।
নদী বলে–ছোটোটা একটু বেহায়া টাইপের। এত্তো আছাড় খায় কিটোর হাতে বারবার তবুও ওর কাছেই যাবে। লজ্জা নেই একটুও। ভয়ও পায় না সে কিটোকে।
আমি বলি–ওর বয়েস মাত্র দুইমাস। এখনো ভয় পেতে শেখেনি বাচ্চাটা।
সারাটাদিন সে কিটোর পেছন পেছন ঘোরে। কিটোর পায়ে পায়ে ঘোরে। কিটোর জন্যে রাখা খাবারই সে খাবে। খাবে কিটোর জন্যে রাখা পানি। সোফা কিংবা টেবিলের যে জায়গাটায় সাধারণত বসে কিটো, ঠিক ঠিক সেই জয়গাটাতেই বসতে হবে তাকে। কিটো যেখানে বসে টিভি দেখে ঠিক সেই জায়গাটাতে বসেই তাকেও দেখতে হবে টিভি।
কিটোকে সারাক্ষণ বিরক্ত করাই ওর একমাত্র ধ্যান-জ্ঞান। কিটো ওকে সমানে আছাড় মারে, পায়ের তলায় ঠেঁসে ধরে, কামড়ে দেয় ঘাড়ে-গলায়-পেটে। কিন্তু তবুও পিচ্চিটা দমে যায় না একটুও। কারণ খুদে মাস্তানটা বুঝে গেছে–এসব আছাড় মারা ঠেঁসে ধরা কামড়ে দেয়া সবই কপট। কিটক্যাট নামের ভদ্র শিক্ষিত মার্জিত বেড়ালটা সব সময় খেয়াল রাখে বাচ্চাটা যেনো ব্যথা না পায়।
অটোয়া, কানাডা

