বিপর্যস্ত অনুভব

ছবিসাশা ফ্রি মাইন্ড

নানান রকম পিঠার পরিচিতি চলছে। টুকটাক কথাবার্তা। হালকা পরিবেশ। আবেদিন আহমেদ জানতে চাইলেন,
– আজ কি আমরা রেকর্ডিং শুরু করব ?
সবাই মত দিলেন আজ শুরু করার।
– আউটডোর শুটিং করি ?
– তাই ভালো হবে, বাগানে, পুকুরপাড়ে, লনে, বারান্দায়, আপনার বাড়ির সব জায়গা সুন্দর আংকেল। তিতাস বলে,
– আমি তবে আয়োজন শুরু করি। তাতাই, মা তোমরাও প্রস্তুত হয়ে যাও।
– আচ্ছা মামা। তাতাই উঠে নাশতার টেবিল থেকে। জয় আর সাজিদের ঘরে যায়। দুজনে শুয়ে শুয়ে গল্প করছে।
– কি ব্যাপার, তোমরা কোথায় হারিয়েছো? কাল থেকে দেখা নাই।
– এই তো আমরা বিছানায়।
– ওঠো এক্ষুনি শুটিং শুরু করবে মামা।
– আমার তো শুটিং নাই, আমি ঘুমাতে পারি তাতাই ?
– কে বলল তোমার শুটিং নাই ?
– আমি কি করব ?
– তোমার গান গাওয়ার কথা না সাজিদ ভাইর সাথে ?
– ও তাই তো ভুলে গিয়েছিলাম। জয় তড়াক করে লাফিয়ে উঠে।
ওর কাণ্ড দেখে হাসে তাতাই।
– সাজিদ ভাই তুমি কোনো গান করবে।
– একদম নতুন কিছু গান করব, বাদশা মিয়ার লেখা।
– আচ্ছা তোমরা তৈরি হও। আমিও চেঞ্জ করে আসি। মামা রেকর্ডিংয়ের আয়োজন করতে ব্যস্ত সহযোগীদের নিয়ে। তাতাই সেখানে যেয়ে দাঁড়ায় খানিক। মামার দিকে চেয়ে হেসে বলে,
– তুমি কি ক্যামেরায় আসবে ?
– দূর পাগলী আমি কেন ?
– এমনি বললাম হেসে উঠে তাতাই।
– তুই তৈরি হসনি এখনো ?
– তুমি সব সাজাও আমি আসছি এখনি মামা। চঞ্চল পায়ে ভিতরে চলে যায়।
তাতাই মনে মনে সাজিয়ে নিয়েছে কীভাবে কাকে উপস্থাপন করবে। তিতাসকে কোথায় দেয়া যায় ? কুলসুম বিবিকে খুঁজে আনার ব্যাপারে ওর ভূমিকা আছে। তিতাসের মায়াময় চোখ দুটো মনে পড়ল। আর যখন কাল রাতে অনেক সান্ত্বনা দিচ্ছিল বড় আপন মনে হয়েছিল, কাছের মানুষ যেন। এই তাতাই কি ভাবছো, ওর ব্যাপারে এখনো কিছু জানাই হয়নি। বউটা নিশ্চয়ই অপেক্ষায় আছে ঢাকায়। আচ্ছা ওর বউটা কেমন ? আনলেই তো পারত─আনমনা ভাবতে ভাবতে ফিক করে হেসে ফেলে তাতাই।
মুক্তির মন্দির সোপান তলে…কত প্রাণ হলো বলিদান.. গুনগুন করতে করতে তাতাই বেরিয়ে আসে ঘর থেকে। সাজিদের ঘরের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছে। জয় ডাকল,
– তাতাই।
– বলো জয়।
– হেল্প করো আমাকে ।
ঘরে ঢুকে দেখে অনেক শার্ট বিছানার উপর সাজিয়ে দেখছে জয়।
– কোনোটা পরি বল তো। ওরা সবাই যেমন ট্রেডিশনাল ড্রেস পরল, আমার তো তেমন নেই।
মজা করে বলেছে অথচ জয় যে সত্যি তৈরি হচ্ছে এটা ভালো লাগে তাতাইর। ওকে ঢুকিয়ে দিতে হবে একটা জায়গায়।
– তাইতো ভুল হয়ে গেছে। তোমার জন্য একটা পাঞ্জাবি কিনতে হতো। দাঁড়াও সাজিদ ভাইর কাছ থেকে একটা ধার করি আপাতত। সাজিদ ভাই কই ?
– বাইরে গেল।
আচ্ছা আমি ওর ব্যাগ দেখছি।
একটা পাঞ্জাবি পেয়ে যায় সুন্দর।
– এই নাও জয় পরো দেখি। জয়ের গায়ে সবুজ পাঞ্জাবিটা দারুণ লাগছে। একটু খাটো হয়েছে। ও সাজিদ ভাইর চেয়ে বেশ লম্বা। খারাপ লাগছে না।
– বাহ! চমৎকার লাগছে।
– ঠিক করে বলো।
– ঠিক বলছি ইউ লুক রিয়েলি নাইস।
হঠাৎ তাতাই বলে,
– জয় তোমাকে একটা কথা বলব। তাতাইর কন্ঠের গভীরতা টের পেয়ে জয় তৈরি হওয়া বাদ দিয়ে তাকায় ওর দিকে।
– সিরিয়াস কিছু ?
– খুব সিরিয়াস, হতেও পারে নাও হতে পারে। তুমি এক্সাইটেড হয়ো না।
– কি বলো তো পাঞ্জাবি পরা জয় চুল আঁচড়ানো বাদ দিয়ে এগিয়ে আসে তাতাইর কাছে।
– কাল দুজন মহিলা এখানে এসেছেন। তাদের একজনের নাম কুলসুম বিবি। সে তার ছেলে জয়কে একজন বিদেশি মহিলার কাছে দিয়েছিল জন্মের পরে।
কোথায় সে, তাতাই ওর কাছে আমাকে নিয়ে চল প্লিজ। এই সময় আয়শা এসে বলে,
– সব রেডি আপনাদের আসতে বলছে।
আয়শার পিছে পিছে বেরিয়ে যায় জয় ঘর থেকে দ্রুত। তাতাইও ছুটে ওদের পিছু পিছু। বাইরে লনে ক্যামেরা নিয়ে তৈরি ক্যামেরাম্যান। আবেদিন আহমেদ সবাইকে নির্দেশ দিচ্ছেন। চেয়ারে বসে আছেন কুলসুম আর সামিয়া। পাশে আরেকটা চেয়ার খালি। জয় ছুটতে ছুটতে ওদের দুজনের কাছে চলে যায়। অস্থির হয়ে বলে কুলসুম বিবি কে ? কুলসুম নামটা বুঝে কিন্তু জয়ের ভাষা বুঝে না। সামিয়া দেখিয়ে দেন কুলসুম বিবিকে। জয় ওদের সামনে মাটিতে বসে পড়ে আবার বলে,
আমি জয়। আমি বিদেশি মায়ের কাছে বড় হয়েছি। আমার বাংলাদেশী মা আমাকে তার কাছে দিয়ে দিয়েছিল। সামিয়া জয়ের কথা অনুবাদ করে দেন। কুলসুম বিবির শুষ্ক, ঘোলা চোখ দুটো জয়ের মুখের উপর ঘুরাফেরা করে। খুঁজে সেই ছোট শিশুর আদল। এই কি তার জয়? একি সেই শিশু যার ভাষা সে বুঝতে পারছে না।
জয় আবার বলে তোমার বাড়ি কি রাধানগর ? এ্যালেনের কাছে তুমি তোমার জয়কে কি তুলে দিয়েছিলে?
কুলসুম বিবি মাথা উপর নিচে নাড়াতে থাকেন। তার শুষ্ক চোখ বেয়ে অশ্র“ গড়াতে থাকে। ঠোঁট দুটো থরথর কাঁপতে থাকে। দুটো খসখসে হাতের পাতায় তুলে ধরেন জয়ের মুখ নিজের দিকে। ভালো করে দেখতে থাকেন। কাঁপা কন্ঠে বলেন জ-য়।
মা মাম মা, জয় বারবার বলতে থাকে, জড়িয়ে ধরে কুলসুম বিবিকে। এই কথাটা বুঝতে পারেন কুলসুম বিবি। পৃথিবীর সব জায়গায় এই ডাক এক। তিনিও দু হাতে আঁকড়ে ধরেন জয়কে। আর যেতে দিবেন না, কখনো না। চোখের পানি কারো বাধা মানছে না।
তবে ক্যামেরাম্যান বুদ্ধি করে পুরো বিষয়টা ধারণ করে ফেলেছে কোনো নির্দেশ ছাড়া। সেটা জানালো চোখের জল মুছে। পিঠ চাপড়ে দিয়ে আবেদিন আহমেদ বলেন,
এমন উপস্থিত বুদ্ধির জন্যই তোমাকে এত পছন্দ করি। তোমার বেতন বাড়িয়ে দিলাম। সবাই হাত তালি দিয়ে অভিনন্দিত করল। আবেদিন আহমেদ বলেন, আমি এই আনন্দের সময়ে আরেকটা ঘোষণা দিতে চাই, আপনাদের সবার সামনে। আমার এই বাড়ির আমার অংশের উত্তরাধিকারী আমি আমার আদরের মা মণি নভেরা ইউসুফ তাতাইকে করছি। এই আনন্দের আতিসহ্যে তাতাইর এত ভালো লাগছে যে সে কিছুই বলতে পারছে না। খুশি আর কান্নার মাঝে এক অদ্ভুত অভূতপূর্ব মিলন সবাইকে এত আনন্দ দেয়।
এই সময় মামার এই ঘোষণা শুনে সে অরো অবাক হয়। জয় এসে তাতাইকে হাগ করে বলে ইউ আর গ্রেট, ইউ আর গ্রেট। কুলসুম বিবি বলে, হু মাইয়াটার বড় মায়া।
তাতাই মামার কাছে এগিয়ে এসে বলে, মামা, আমি যে প্রজেক্ট করতে চেয়েছিলাম তার ধারণা আমি পেয়ে গেছি।
কি করবে তাতাই সবাই প্রশ্ন করে, জানতে চায় ?
মামা আমাকে এই বাড়িটা দিল আমি এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করব। যারা খেতে পরতে পারছে না। যাদের থাকার জায়গা নাই তাদের খুঁজে এনে আমি এখানে তাদের থাকার ব্যবস্থা করব। আপাতত এ বাড়ির প্রচুর গাছগাছলি, পুকুর ক্ষেতের আয়ে চলবে। সবাই নিজে কাজ করবে। আরো নতুন কিছু আয়ের উৎস আমরা ধীরে ধীরে গড়ে তুলব। একটা পরিবার হয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ক্যাম্পের নতুন যাত্রা শুরু হবে।
সবাই এত উৎফুল­ হয় যে তাদের আনন্দ যেন বাধ মানছে না। মনে হচ্ছে সেই দেশ স্বাধীন হওয়ার আনন্দ যেন তারা ফিরে পেয়েছে। স্যামুয়েল এগিয়ে এসে তাতাইকে হাগ করে বলে, রিয়েলি ইউ আর গ্রেট তাতাই।
তুমি জান না স্যামুয়েল তুমি কতটা মহান।
আবেদিন আহমেদ বলেন,
সাজিদ কোথায় ওকে দেখছি না যে ?
আমি এখানেই আছি পিছন থেকে সাজিদ এস্রাজে টুংটাং শব্দ তুলে বলে,
এদিকে আসো তোমার সাথে ইনাদের পরিচয় হলো না।
বাদশা মিয়ার এস্রাজ হাতে, মেরুণ রঙের পাঞ্জাবি গায়ে লম্বা চুলের দীর্ঘ সুদর্শন সাজিদ টুংটাং করে এস্রাজ বাজিয়ে এগিয়ে আসে, সবার চোখ সাজিদের দিকে ওর মুখে, দ্রুত লয়ে খেলে বেড়ান আঙ্গুলে, লম্বা চুলের ঝাঁকুনিতে ঘুরে যাচ্ছে। শুধু সামিয়ার চোখ চলে যাচ্ছে। ওর গলায় দুলানো চেইন আর লকেটের দিকে। এক অদৃশ্য শক্তি যেন টেনে নিচ্ছে সামিয়াকে। পায়ে পায়ে এগিয়ে চলেছেন তিনি সাজিদের দিকে। ক্যামেরাম্যান সাজিদকে ফোকাস করতে পারছে না ঠিকএতো সামিয়া এসে যাচ্ছেন। সামিয়ার হাত সাজিদের গলার লকেটে, চোখে স্পষ্ট দেখছেন লেখা আল­াহু। সাজিদের বাজনা থেমে গেছে, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সামিয়ার মুখে।
তিতাস ভাবছে মা কি করছে, আবার কি এলোমেলো ভাবছে, অন্যমনস্ক হয়ে গেছে। তিতাস মাকে ধরার জন্য যেতে পা বাড়ায় আর তক্ষুণি শোনে মা বলছে বাবুয়া, বাবুয়া,
হারুন দ্রুত এগিয়ে এসে বলেন,
ও সাজিদ মেহরা।
আবেদিন আহমেদ বলেন,
বাবুয়া কে ?
বাবুয়া আমার হারিয়ে যাওয়া ভাই, যুদ্ধের সময় যাকে আমি অন্ধকারে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
সাজিদের মাথায় ভেসে যায় অন্ধকার আগুন, শব্দ।
আবেদিন আহমেদ বলেন,
বাদশা মিয়া যুদ্ধের সময় কুড়িয়ে পেয়েছিল।
মা এই লকেটটা ওর তিন বছরের জন্মদিনে দিয়েছিলেন।
এই লকেটটা বাদশা মিয়ার ট্রাংকের ভিতর সযত্নে রাখা ছিল, ছোট ছোট শার্ট-প্যান্টের সাথে।
লাল চেক শার্ট চিৎকার করে উঠেন সামিয়া।
হ্যাঁ, নীল প্যান্ট, সাজিদ বলে।
হ্যাঁ বাবুয়া, বাবুয়া, বাবুয়ার বুকে মাথা রেখে কেঁদে উঠেন সামিয়া।
এস্রাজ ধরা হাতে জড়িয়ে ধরে সামিয়াকে সাজিদ।
তিতাস এগিয়ে এসে বলে,
সাজিদ মেহরার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য কত চেষ্টা করেছি, তুমি তবে বাবুয়া মামা ?
বুবু আমার জন্মদিন কবে ?
আঠারো মার্চ উনিশশো উনোসত্তর। ছোট চাচা মোর্শেদ চৌধুরী, চাচী নিলুফার চৌধুরীর একমাত্র পুত্র সন্তান জন্ম নেয় বিয়ের ছয় বছর পরে। পরিবারের সবার ছোট এই ছেলে ছিল সবার আদরের বাবুয়া, শাহনেওয়াজ চৌধুরী।
এইবার আসল নামটা পেয়ে গেছো বাবুয়া, তাতাই বলে চোখের জল মুছতে মুছতে।
মা শাহরিয়ার মামাকে টেলিফোন করছি তিতাস বলে।
রাত না অনেক এখন… হোক.. হ্যাঁ কর…এখনি কর..

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent