দুঃসহ করোনাকাল এবং ‘গেম অব থ্রোন্স’

আর তো ভালো লাগে না চার দেয়ালের বন্দী জীবন। প্রতিদিন নতুন নতুন মৃত্যু সংবাদ। টিভি পর্দার দিকে তাকাতে পারি না। স্ক্রল পড়তে ভয় লাগে। ট্রাম্পকে দেখলেই ব্লাডপ্রেসার ফ্লাকচুয়েড করে। সিনেমা দেখি প্রচুর। নাটক দেখি। গান শুনি। তবে খুব মনোসংযোগ থাকে না তাতে। কেমন একটা ছাড়া ছাড়া ভাব। বাংলাদেশের সব ক’টা চ্যানেলই আমার রিমোটের আওতায়। তাই বুঝতে পারি দেশে করোনা বিশেষজ্ঞের প্রাদুর্ভাব ঘটেছে ভয়াবহ ভাবে। টকশো পণ্ডিতদের দেখলে সংসার ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে যেতে ইচ্ছে করে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিককে দেখলে ঢাকাই সিনেমার দিলদারের কথা মনে পড়ে।
লেখালেখিতে টানা মনোসংযোগ ধরে রাখতে পারি না।
প্রিয় কারো সঙ্গেই দেখা হয় না কতোদিন!। কবে দেখা হবে জানি না। আদৌ দেখা হবে কি না তাও জানি না।

- Advertisement -

বাংলা হিন্দি ইংরিজি মিলিয়ে কতো যে মুভি দেখা হচ্ছে এই করোনাকালে! বহুবার দেখা পুরনো প্রিয় মুভিগুলো আবারও দেখছি।
নিয়ম করে প্রতিদিন দেখছি নিকট অতীতের বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘গেম অব থ্রোন্স’। দুনিয়া কাঁপানো সিরিজ। বিশাল ক্যানভাসে অজস্র চরিত্রের সমাবেশ। গল্পটা অন্য পৃথিবীর। লেখক জর্জ আর আর মার্টিন সাতটা কিংডম নিয়ে এমন একটা সাম্রাজ্য কল্পনা করেছেন যার অস্তিত্ব এই পৃথিবীতে নেই। গল্পের প্রয়োজনে আলাদা মানচিত্র, আলাদা ভাষাও তৈরি করে নিয়েছেন লেখক।
সিংহাসন, পরিবারতন্ত্র আর ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে গল্প। প্রতিটি পর্বেই চক্রান্ত-লোভ-নগ্নতা-যৌনতা-নৃশংসতা-রক্ত আর মৃত্যুর হোলিখেলা।
কাল্পনিক অন্য একটা পৃথিবীর গল্প হলেও এর অচেনা কুশীলবদের সঙ্গে অনেক দূরবর্তী কিন্তু আবছা কিছু চেহারা মনে পড়ে যায়। ষড়যন্ত্র আর অনৈতিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত আমার খুব কাছের কিছু বন্ধুর কদর্য চেহারাও দেখতে পেয়েছি কাহিনীর কোথাও কোথাও। ডোনাল্ড ট্রাম্প-দামোদর মোদি-ভ্লাদিমির পুতিন-কিম জং উনকেও দেখা গেছে আবছা অবয়বে।
আর প্রায় সব ক’টা পর্বের কোনাকাঞ্চিতেই একজন খন্দকার মোশতাকের প্রবল উপস্থিতি।
আটটা সিজনে ভাগ করা সিরিজের প্রতিটি সিজনে ১০টি পর্ব। মোট পর্ব সংখ্যা ৭৩। আমি আছি সমাপ্তির দিকে।
‘গেম অব থ্রোন্স’-এর কাহিনি চিত্রনাট্য আর ডিরেকসনের বাইরে চরিত্রগুলোর দুর্দান্ত অভিনয়শিল্পীর পাশাপাশি এর অনিন্দ্যসুন্দর সিনেমাটোগ্রাফী,আলো, মিউজিক আর সম্পাদনাও দুর্দান্ত। বিশেষ করে রামিন জাওয়াদীর সূচনা সঙ্গীতটি দুর্ধর্ষ রকমের হৃদয়গ্রাহী। সূচনা সঙ্গীতটির প্রেমেই পড়ে গেছি আমি। মাঝখানে অনেকগুলো দিন আমার কেটে গেছে শুধু এর সূচনা সঙ্গীতটি শুনতে শুনতেই। এমন কোনো দেশ বোধ হয় নেই যে দেশের মিউজিশিয়ানরা তাদের নিজেদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ যন্ত্রানুষঙ্গে এই সূচনা সঙ্গিতটি বাজানোর চেষ্টা করেননি। ইউটিউবে তার অসংখ্য নমুনা ছড়ানো ছিটানো।
নিজেকে খুব মোটা মনে হলে অপেক্ষাকৃত মোটাসোটা মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হয়। তাতে করে নিজেকে অনেক স্লিম লাগে। চারদেয়ালের একঘেয়ে বন্দী জীবন এবং করোনার থাবায় প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর খবর আমাকে একটা ট্রমার ভেতরে নিয়ে যাচ্ছে। ‘গেম অব থ্রোন্স’এর অজস্র মৃত্যু কি তাহলে আমাকে করোনার মৃত্যুর ট্রমা থেকে বের করে আনছে? মোটাসোটা মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্লিম ভাবার মতো? কে জানে!

অটোয়া, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent