বাংলাদেশের রেল বিভাগে একটি কাকতালীয় ব্যাপার আছে। এই বিভাগের যিনি মন্ত্রী হন তার যতই বয়স হোক না কেন তার বিয়ের ভাগ্য খুলে যায়। এমনকি যিনি চিরকুমার ছিলেন তার ভাগ্যেও নতুন বউয়ের আগমণ ঘটে। বিয়ে করা খারাপ কিছু নয়। বাংলাদেশে বিয়ে বলতে বৈধ স্ত্রীর মর্যাদা বুঝায়।
কথা সেটা নয়। সাম্প্রতি রেলমন্ত্রীকে নিয়ে হৈচৈ হচ্ছে। তিন জন যাত্রী রেলমন্ত্রীর আত্নীয় পরিচয় দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় মাগনা ভ্রমন করতে চাইছিলেন কিন্তু টিটিই তাদেরকে নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা করে শোভন কামরায় বসিয়ে দেন।
এই পর্যন্ত ঠিকি ছিল। বিপত্তি ঘটেছে, টিটিইকে বরখাস্ত করা নিয়ে। টিটিই নিয়ম অনুযায়ী কর্তব্য পালন করলে বরখাস্ত হবেন কেন?
পত্রিকা হতে জানতে পারলাম, টিটিই বরখাস্ত হয়েছেন রেলমন্ত্রী নরুল ইসলাম সুজনের স্ত্রীর নির্দেশনার ভিত্তিতে। পরে তিনজন যাত্রীর মধ্য থেকে টিটিইর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার করার লিখিত অভিযোগ করা হয়। উল্লেখ যে, রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর নির্দেশনার ভিত্তিতে রেল বিভাগের কর্মকর্তা তাৎক্ষণিক ভাবে কোন তদন্ত ছাড়াই টিটিইকে বরখাস্ত করে। পরে এটিকে একটি আইনগত ভিত্তি দেওয়ার জন্য তিনজন যাত্রীর মধ্য থেকে টিটিইর বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহার করার লিখিত অভিযোগ করা হয়।
কথা হচ্ছে, যাত্রীরা বিনাটিকেটে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামরায় বসে থাকলে টিটিই স্বাভাবিক কারনেই তাদেরকে টিকিট প্রদর্শন করতে বলবেন। তিন জন যাত্রী বিনাটিকেটে অবস্থান করলে তাদেরকে নিশ্চয়ই টিটিই জামাই আদর করবেন না। টিকেট চাওয়ার পর ওই তিনজন যাত্রী নিজেদেরকে রেলমন্ত্রীর আত্নীয় পরিচয় দেন। টিটিই সেটিকে পাত্তা না দিয়ে তাদেরকে জরিমানা করে শোভন কামরায় প্রেরন করেন। ধারণা করা যায়, তখন সেই তিনজন যাত্রী টিটিইর সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হয়। সেইরকমই হবার কথা। কারন, তারা মন্ত্রীর আত্নীয় বলে পরিচয় দিয়েছেন কিন্তু টিটিই সেটিকে পাত্তা দিচ্ছেন না। সেই অবস্থায় তারা নিশ্চয়ই আরো ক্ষিপ্ত হয়ে আরো কিছু বলেছেন। টিটিইও সেগুলির উত্তর দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই বলে থাকতে পারেন, আপনারা যারই আত্নীয় হন না কেন টিকেট দেখাতে হবে এবং নিয়ম মানতে হবে। বাকবিতন্ডায় টিটিইও একটু ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিলেন, হয়ত বলেছেন, আপনারা প্রেসিডেন্টের আত্নীয় হন না কেন তাতে আমার কিছু আসে যায় না। টিকেট দেখাতে হবে….
তা,এইরকম একটা চিত্র কল্পনা করলে আপনি বুঝতে পারবেন দুর্ব্যবহার আসলে কে করে থাকতে পারে।
যাই হোক,পরে বিষয়টি ভাইরাল হওয়ায় এবং এর বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি হওয়ায় টিটিইর বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হয়েছেন।
পরে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন এই ঘটনার পর অনেক কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি এর কিছুই জানতেন না। পরে তিনি বিষয়টি জানতে পরেছেন। তিনি নয় মাস হলো নতুন বিয়ে করেছেন। নতুন বউয়ের মন্ত্রীর কাজকর্ম বুঝে উঠতে সময় লাগবে। তার স্ত্রী রেল কর্মকর্তাকে কোন কিছু বলে থাকলে তাকে জানানো উচিত ছিল। স্ত্রীর নির্দেশে টিটিইকে বরখাস্ত করা ঠিক হয়নি। রেল কর্মকর্তাকে শো কজ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন, রেল কর্তৃপক্ষকে লিখিত নির্দেশনা দেওয়া আছে, কেউ মন্ত্রী বা অন্য কারো পরিচয় দিয়ে কোন সুবিধা নিতে চাইলে তা যেন উপেক্ষা করা হয়।
তাহলে কথা হচ্ছে, এমন নির্দেশনা থাকলে টিটিই নিয়ম অনুযায়ী ঠিক কাজটিই করেছেন। টিটিই এটাও নিশ্চয়ই জানেন মন্ত্রীর কেউ যাত্রী হলে সেক্ষেত্রে বিশেষ কোন নির্দেশ তার কাছে আসতো। যেহেতু তেমন কোন নির্দেশ নেই সেহেতু টিটিই ওই তিনজনের বিরুদ্ধে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়েছেন।
মন্ত্রীর কথা মেনে নিলেও কিছু কথা থেকে যায়। তিনি বিয়ে করার নয় মাসের মধ্যে তার মন্ত্রীত্বের ক্রিয়াকর্ম গুলি কি স্ত্রীকে একটু বুঝিয়ে বলা উচিত ছিল না? মন্ত্রীর নতুন স্ত্রী আইনজীবী বলে পত্রিকায় এসেছে। একজন আইনজীবি রেলের নিয়ম নীতি বুঝিয়ে বললে বুঝবেন না,এমন কি হতে পারে? আর একজন আইনজীবি স্ত্রী তার স্বামীকে না জানিয়েই রেল কর্মকর্তাকে ফোন করেছেন!! এখানেও কেমন খটকা লাগে।
আর রেক কর্মকর্তাও বা কেন রেল মন্ত্রীর স্ত্রীর নির্দেশ পালন করবেন?
তবে পত্রিকায় জেনেছি, রেলমন্ত্রীর আইজীবি স্ত্রী নাকি বলেছেন, তিনি তার আত্নীয়দের প্রতি টিটিইর দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, বরখাস্ত করার কোন কথা বলেননি।
এখানেও ধরে নিচ্ছি, রেল কর্মকর্তা রেলমন্ত্রীর স্ত্রীকে খুশি করার জন্য হয়ত ধরে আনতে বলায় বেধে এনেছেন। বাংলাদেশে তো এমনই কালচার চালু আছে।
মানুষের দৃষ্টি অন্য দিকে নেওয়ার জন্য টিটিই নেশায় আসক্ত এমন কিছু প্লট সাজানো হয়েছিল। সেগুলি খুব একটা কাজে আসেনি। নিরিহ দেখতে সেই ভদ্রলোক এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি জীবনে কখনো সিগারেটে একটা টানও দিয়ে দেখেননি।
যাই হোক বিষয়টি খুব গোজামেলে। আশা করি আসল সত্য বেরিয়ে আসবে। তবে এই সব ঘটনায় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক হবার এবং তা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ করে দেয়? তারা কি সেই সুযোগটি নিবেন? নাকি অনিয়ম গুলি যেভাবে চলছে সেইভাবেই চলতে দিবেন?
স্কারবোরো, অন্টারিও, কানাডা

