চশমা-এক

ছবি ডেভিড তেরাভিস

মতিঝিল শাপলা চত্ত্বরে সিএনজিতে চড়ে বসার কিছুক্ষণ পরেই আব্দুল মতিন বুঝতে পারে যে প্রকৃতির বড় ডাকটি তলপেটের কোনা থেকে উঁকি মারতে শুরু করেছে। দুপুরে হাসপাতাল থেকে হাঁটার দূরত্বে একটা রেঁস্তোরায় বিরিয়ানি খেয়েছিল, তখন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয় নি, কিন্তু এখন সেটার পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া শুরু হওয়াতে সে ভেতরে ভেতরে ঘামতে শুরু করে। পাকস্থলির অনেক গভীরে ভুট-ভুট আর গুড়-গুড় শব্দগুলো পরষ্পরের হাত ধরে চারুকলা শিল্পীদের মতো বৃত্তাবন্ধ ছন্দে খেলা শুরু করে দিয়েছে এবং সহসা এই শব্দমালা যে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘকে প্রসারিত করে প্রলয় নাচে রূপান্তরিত হবে, সে বিষয়ে আব্দুল মতিন মোটামুটি নিশ্চিত।  সিএনজি থেকে গলা বের করে আসেপাশের ভবনগুলোর দিকে তাকালো সে। সিএনজি তখন বায়তুল মোকাররম পার হয়ে তোপখানার দিকে ছুটছে। বিকালের এই সময়টাতে রাস্তায় ট্রাফিক একটু বেশিই থাকে। কিন্তু, যে কোনো কারণেই হোক রাস্তায় ট্রাফিক বেশ কম, ফলে মুক্ত বিহঙ্গের মতো সিএনজি ছুটছে তো ছুটছেই। মুক্ত রাস্তা পেয়ে সিএনজি-চালক তার গাড়ির গতি বাড়াতে যাবে, হঠাৎ প্রেসক্লাবের দিক থেকে মাঝবয়সী একজন নারী রাস্তা পার হওয়ার উদ্দেশ্যে দৌড় দেয়, আর তাকে রক্ষা করতে সিএনচি-চালক সজোরে ব্রেকে পা দিলে আব্দুল মতিনের কর্ম সারা হবার জোগাড় হয়। প্রবল নিম্নচাপে তাঁর শরীরে ঘাম চলে আসে এবং কোনোরকমে সে বলে, ‘এই যে ভাই, আশে-পাশে কোনো টয়লেট আছে?’

নির্বিকার সিএনজি চালক তার দৃষ্টিকে রাস্তার উপর রেখে উত্তর দেয়, ‘বড়ডা না ছোডডা?’

- Advertisement -

বড়। বড়। কোনো টয়লেট আছে কি না বল, সহ্য করতে পারতেছি না।’

বায়তুল মোকাররমের আগে কইতে পারলেন না! যত্তসব ঝামেলা।’

দম বন্ধ করে সিএনজি-চালকের হম্বিতম্বি সহ্য করে যায় আব্দুল মতিন।  এছাড়া কী করারই-বা আছে? ঠিক তখন কিছু বুঝে উঠার আগেই ডানে সেগুনবাগিচার গলিতে গাড়ি ঢুকিয়ে দেয় সিএনজি-চালক এবং কিছুক্ষণ চলার পরে একটা ভবনের সামনে গাড়ি থামিয়ে বলে, ‘এইহানে একখান জাদুঘর আছে। টয়লেট পাইবার পারেন। জলদি করেন।’

তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভবনের সামনের নামফলকটি ভালো করে দেখা হয় না আব্দুল মতিনের। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা একজনকে টয়লেট কোথায় জিজ্ঞেস করলে তার দেখিয়ে দেয়া পথে ত্রস্ত পায়ে টয়লেটে প্রবেশ করে সে। তারপর খাঁচা ছাড়া পাখির মতো সুখের আনন্দে ভাসতে ভাসতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে খানিকটা বেশী সময় ধরে কমোডের সিটে বসে থাকে সে।  এমন সময় বরাবর যা হয়, আব্দুল মতিনের বেলায় সেটাই ঘটলো। হারানো দিনগুলোর সাথে মিলেমিশে গত কয়েকদিনের স্মৃতি তার মাথায় ঘুরপাক খেতে শুরু করল। একসাথে পাঁচটা মক্কেল ধরে আনা এবং সকলকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দেয়া চাট্টিখানি কথা না; কিন্তু সেটা সে করতে পেরেছে এবং আনন্দের আতিশয্যে ভরপেট বিরিয়ানি খেয়ে ফেলেছে। সাথে দুই গ্লাস বোরহানি।

সাফেল্যের চুড়ায় ওঠার সময় বড়-বড় গাছগুলো যেমন আসেপাশের গাছগুলোর দিকে করুণাভরে তাকায়, আব্দুল মতিনও তার বন্ধুদের দিকে সারাক্ষণ তেমন একটা করুণার দৃষ্টি প্রসারিত করে রাখে। বন্ধুরা ইদানিং বাঁকা চোখে তাকায়, তাদের কেউ-কেউ আড়ালে-আবডালে তাকে নিয়ে কথা বলে এবং তারা যা বলে তার সাথে রঙ মিশিয়ে অনেক কথা আব্দুল মতিনের কানে ভেসে আসে। ওসব কথায় কান দেয়ার মতো সময় আব্দুল মতিনের নাই, প্রয়োজনও বোধ করে না। এখন সুখের ঠেলায় টয়লেটে বসে থাকতে থাকতে বন্ধুদের কথায় কেন জানি তার মনে ভেসে উঠলে আব্দুল মতিনের গান গাইতে ইচ্ছে করল। হোস্টেল জীবনে টয়লেটে বসে গুন-গুনিয়ে গান গাওয়ার অভ্যাস ছিল, বাসার টয়লেটে সেই অভ্যাস অদ্যাবধি ধরে রেখেছে সে। অচেনা-অজানা জায়গায় গান গাওয়া ঠিক হবে কিনা তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগই পেল না সে, তার আগেই মুখ দিয়ে গজল বের হয়ে এল, ‘মুঝে তুম নাজারসে গিরাতো রাহে হো মুঝে তুম কাভিভি ভুলানা সাকোগে।’

কিন্তু আব্দুল মতিনের সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। হঠাৎ করেই তার গজল বন্ধ হয়ে যায়। এরপর কী, এরপর কী― মনে ভাবতে থাকে সে; কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও গজলের পরের লাইনগুলো মনে করতে পারলো না। এমন তো হওয়ার কথা না, মনে মনে ভাবে আব্দুল মতিন। শুধু এই গজল তো না, ওই গায়কের সব গজল তার মুখস্ত এবং অনন্তকাল ধরে মগজের স্তরে স্তরে সেগুলোকে সাজিয়ে রেখেছে সে ওয়াড্রোবে কাপড় সাজিয়ে রাখার মতো করে। সেখানে কোনো কারণ ছাড়াই সেই সাজানো ওয়ার্ডড্রোব যেন এলোমেলো হয়ে গেছে! ঝড়ের তাণ্ডবের পরে স্বজন খুঁজে বেড়ানোর মতো করে গজলের লাইনগুলো খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করে আব্দুল মতিন; কিন্তু পণ্ডশ্রম! কী মনে করে ডান হাত দিয়ে মাথার একপাশে আলতো করে বারি মারে সে, দেখে মনে হবে মগজের কোথাও ওটা আটকে আছে এবং ঝাঁকি দিলে গাছে কুল পড়ার মতো তা পড়তে শুরু করবে। তো ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। আব্দুল মতিন বুঝতে পারে তার মগজ থেকে কিছু একটা গল-গল করে নেমে যাচ্ছে। তার মনে হল যেন গজলগুলোই নেমে যাচ্ছে; কিন্তু নিষ্কৃত মলের মতো মাথা থেকে গজলও যে নেমে যেতে পারে এটা তার বিশ্বাস হল না। সেজন্য আবারও চেষ্টা করল সে। কিন্তু অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও যখন একটা গজলও মনে করতে সক্ষম হলো না, তখন আব্দুল মতিন এই ভেবে সান্তনা লাভ করল যে অনাবিল প্রশান্তি লাভের কারণে মস্তিষ্কের কোষে সাময়িক স্মৃতিভ্রম হয়েছে এবং স্বাভাবিক সুখের সময় আবার গানগুলো ফিরে আসবে।

স্বস্তি আর অস্বস্তির মাঝামাঝি একটা অনুভূতি নিয়ে টয়লেট থেকে বের হয় আব্দুল মতিন। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে তার মধ্যে বিভ্রম জাগে― এ কোথায় এসেছি? জায়গাটা যে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অভ্যর্থনাকক্ষ, সেটা বুঝতে একটুও বিলম্ব হয় না তার। মুহূর্তে শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা একটা স্রোত নামতে শুরু করে। মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযোদ্ধা শব্দসমূহের প্রতি উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিতৃষ্ণার অনুভূতিগুলো তখন তার মস্তিষ্কের কোষ থেকে শরীরময় ছড়িয়ে পড়ত শুরু করে।

এমনিতে আব্দুল মতিন সাবধানী মানুষ। স্থান, কাল ও পাত্রের যে সচেতনতা তাকে এতটা পথ টেনে এনেছে তা তাকে সাবধান করে দেয়, বলে― মাথা গরম করলে চলবে না। ঠাণ্ডা মাথায় চারপাশের সবকিছু ভালো করে বুঝে নিতে চেষ্টা করে সে। সামান্য ভুলের জন্য মহা বিপর্যয় ঘটে যেতে পারে― ভাবে আব্দুল মতিন এবং খুব সন্তর্পনে বাইরে বেরুবার জন্য পা ফেলতে যাবে, হঠাৎ কোত্থেকে কেউ ডেকে ওঠে, ‘মতিন সাহেব!’

আব্দুল মতিন এদিক-ওদিক তাকায়; কিন্তু ডাকটি কোত্থেকে এসেছে সেটা বুঝে উঠতে পারে না সে। সামনে এগুবার জন্য আবারও পা বাড়াতে যাবে, সেই একই ডাক আবারও ভেসে আসে, ‘আব্দুল মতিন সাহেব!’

আব্দুল মতিন আবারও চারিদিকে তাকায়; কিন্তু কাউকে দেখতে পায় না। এবার তাই সাপ-বেজি খেলার মতো একটু কৌশলী হয়ে ওঠে সে, অদৃশ্য মানুষটিকে দেখতে পেয়েছে তেমন একটা ভাব নিয়ে বলে, ‘জ্বি বলুন!’

আপনি এখানে কেন এসেছেন?’

দেখুন। আমি মহাবিপদে পড়ে এখানে এসেছিলাম।’

বিপদে পড়লেই মানুষ এখানে আসে।’

কিন্তু আপনি কে?’

আমি ডাক্তার মতিন!’

দেখুন, আপনি হেঁয়ালি করছেন। আমিই ডাক্তার মতিন। আপনি আমার নাম জানেন সেটা ভালো কথা, কিন্তু আপনি সামনে আসছেন না কেন?’

আপনি ডাক্তার! শুনে ভালো লাগল। কীভাবে ডাক্তারি করেন মতিন সাহেব?’

কেন সবাই যেভাবে করে আমিও সেভাবে করি। মফস্বল শহরে থাকি, সেখানে আমার অনেক নাম-ডাক। রুগি আসে, তাদের ব্যবস্থাপত্র লিখে দেই।’

গতকাল পাঁচজনকে নিয়ে ঢাকায় এসেছেন। ঠিক?’

হ্যাঁ ঠিক।’

যাদের এনেছেন, তাদের কারও অপারেশন করার দরকার নাই, এটা জেনেও আপনি এনেছেন। ঠিক?’

 

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent