
নাইন ইলেভেন। ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। এখনো মনে পড়লে গা শিউরে ওঠে। উড়োজাহাজ চালিয়ে ভবন ধ্বংস.. কেউ কোনোদিন কল্পনা করেনি। এই অকল্পনীয় সন্ত্রাস চলেছিলো সেদিন। ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়া হয় নিউ ইয়র্ক নগরীর লোয়ার ম্যানহাটানের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। বিশ্বখ্যাত বাণিজ্য কেন্দ্র ছিলো এটি। অসংখ্য অফিস ছিলো ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি টাওয়ারে। নর্থ টাওয়ার এবং সাউথ টাওয়ার। প্রায় তিন হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় এই পৈশাচিক হামলা। আহত হন আরো হাজার ছয়েক মানুষ।
২০০১ সালের এগারো সেপ্টেম্বরের মর্মান্তিক ঘটনার পর ভবন দুটোর ধ্বংসাবশেষ তুলে ফেলা হয়। পরিকল্পনা নেয়া হয় ওই স্থানে নতুন ভবনের। এরই ধারাবাহিকতায় নর্থ টাওয়ারের স্থানে নির্মাণ করা হয় অর্ধ কিলোমিটারের বেশি উচ্চতার নতুন টাওয়ার। নাম দেয়া হয় ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার।
নির্মাণ শেষে উত্তর আমেরিকা মহাদেশে ভবনটি পেয়ে যায় সর্বোচ্চ ভবনের মর্যাদা। এখন পর্যন্ত রেকর্ডটি টিকে রয়েছে। টরন্টোর সিএন টাওয়ার এরচে’ উঁচু। তবে সেটি ভবন নয়। তাই ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার এখন পর্যন্ত উত্তর আমেরিকার উচ্চতম দালান।
এর কাজ শুরু করা সহজ ছিলোনা। ধ্বংসস্তুপ সরিয়ে জায়গা খালি করতে হয়েছে। ছিলো স্মৃতি বিজড়িত অনেক ঘটনা। ছিলো আবেগ, ভালোবাসা এবং আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সংকল্প।
এই ভবন ঘিরে মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। নাইন ইলেভেনের স্মৃতি, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে নতুন আইকন, নান্দনিক স্থাপত্য সৌন্দর্য আর ইমোশনাল ভ্যালু মিলে অন্যরকম আবেদন তৈরী করেছে এই ইমারত। এর স্থাপত্য নকশা করেছে এসওএম (SOM)। স্কিডমোর, উয়িংস এন্ড মেরিল। বাঙালির গর্ব মহান প্রকৌশলী এফ আর খানের প্রতিষ্ঠান স্কিডমোর, উয়িংস এন্ড মেরিল। এখানে কর্মরত অবস্থাতেই তিনি সিয়ার্স টাওয়ার ডিজাইন করেছিলেন। বর্তমান নাম উইলিস টাওয়ার।
বান্ডেল টিউব পদ্ধতিতে নির্মিত সিয়ার্স টাওয়ার সেসময় বিশ্বের উচ্চতম ভবনের মর্যাদা লাভ করেছিলো। যা ভাঙতে সময় লেগেছিলো ২৫ বছর। ১৯৭৩ সালে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর সিয়ার্স টাওয়ার উচ্চতম মর্যাদা হারায় ১৯৯৮ সালে। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাস টাওয়ার নির্মাণ শেষ হলে সিয়ার্স টাওয়ারের মুকুট বদল হয় তাদের কাছে।
পৃথিবীর বাঘাবাঘা আর্কিটেক্ট কাজ করেছেন এবং এখনো করছেন স্কিডমোর, উয়িংস এন্ড মেরিলে। বুর্জ খালিফার স্থপতি এড্রিয়ান স্মিথ এ প্রতিষ্ঠানে থাকাকালীন সময়ে বুর্জ খালিফা ডিজাইন করেন। আর এই প্রতিষ্ঠানের আরেক খ্যাতনামা স্থপতি ডেভিড চাইল্ডস। যিনি ডিজাইন করেন ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। সাথে ছিলেন স্থপতি ড্যানিয়েল লিন্ডসকাইন্ড এবং স্থপতি টি জে গত্তেস দিনার।
টি জে গত্তেস দিনারের একটি উক্তি তখন ভাইরাল হয়েছিলো। তিনি বলেছিলেন, “Designing a building is never easy. Designing a super-tall building is even harder. Here we were faced with designing a super-tall building in New York City with the world watching us.” এ কথা সত্য যে সেসময় সারাবিশ্বই এই ভবনের নকশা প্রণয়নের দিকে তাকিয়ে ছিলো।
স্থাপত্য নকশা স্কিডমোর, উয়িংস এন্ড মেরিল তৈরী করলেও এর স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করে বিশ্বখ্যাত ইঞ্জিনিয়ারিং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডব্লিউএসপি (WSP)। ঘটনাচক্রে এটি আমার নিজের জীবন জীবিকার প্রতিষ্ঠান। তবে এই ভবন নির্মাণের কোনো প্রক্রিয়ার সাথে আমি জড়িত ছিলাম না। ভবনটি যে সময়কালে নির্মিত হয়, সেই সময়কালে এখানে আমার কর্মজীবন শুরু হয়নি। ওয়ান ওয়াল্ড ট্রেড সেন্টারের নির্মাণ শুরু হয় এপ্রিল ২৭, ২০০৬। আর শেষ হয় মে ১০, ২০১৩। ৮ বছর লেগেছিলো বিশাল এই নির্মাণযজ্ঞ শেষ করতে।
WSP ভবনের ‘স্থাপত্য নকশা’ হাতে পাবার পর এর ‘অবকাঠামো নকশা’ প্রণয়ন করে। সুউচ্চ ভবন হলেও তুলনামূলক সহজ জ্যামিতিক হিসাব এর স্থাপত্য নকশায়। ডব্লিউএসপির ভাষায় “সিম্পলিসিটি এন্ড জিওমেট্রি।” ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার শুরু হয়েছে ভূমিতে ২০০ ফুট বর্গাকার ফুটপ্রিন্টের উপর। প্রথম টুইন টাওয়ারের সমান ক্ষেত্রফলের উপর।
আগের টুইন টাওয়ারের জায়গায় নির্মিত হলেও নতুন টাওয়ারের আর্কিটেকচারাল ডিজাইন এবং স্ট্রাকচারাল ডিজাইন সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভবনের ফাউন্ডেশন মাটির উপরে আসার পর ভূমি থেকে উপর দিকে ১৮৫ ফুট (৫৬ মিটার) পর্যন্ত বিশেষ সুরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এ অংশটি পুরোটাই নিরেট কংক্রিট ঢালাই দ্বারা নির্মিত। তবে জরুরি বহির্গমনের নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এধরণের ডিজাইন আধুনিক ভবনে সচরাচর দেখা যায়না।
নিরেট কংক্রিটের দেয়াল নান্দনিকতা বৃদ্ধির সহায়ক নয়। আর্কিটেক্টগণ এটি পছন্দ করেন না। তাঁরা যেটি করেছিলেন, তা ছিলো কাঁচের ঝকঝকে দেয়াল। যাতে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়ে ভবনটিকে আরও উজ্জ্বল দেখায়।
পরবর্তীতে বিশেষ কারণে ডিজাইন পরিবর্তন করা হয়। ঐতিহাসিক এবং আবেগীয় প্রতীকি কারণ। ভূমি সংলগ্ন দেয়ালে বৈমানিক হামলা না হলেও গাড়িবোমা হামলার সম্ভাবনা থাকে। সেই হামলা কল্পনায় এনে তার প্রতীকি প্রতিরোধ ও প্রতিবাদে নীচের ১৮৫ ফুট বা ১৮ তলা উচ্চতা নিরেট কংক্রিট দিয়ে নির্মাণ করা হয়।
আর্কিটেকচারাল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন শেষ হবার পরও ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নির্মাণ কাজ দেরীতে শুরু হয়েছিলো। পর্যাপ্ত তহবিল সংগৃহিত না হওয়া পর্যন্ত গ্রাউন্ড ব্রেকিং বা মাটি কাটা ছিলো ঝুঁকিপূর্ন। আনুমানিক ৩ বিলিয়ন ডলার খরচ ধরে ২০০৬ সালের এপ্রিল মাসে কাজ শুরু হয়। ফাউন্ডেশন নির্মাণ শুরুর পর আরেকটি বাস্তব বাজেট তৈরী করা হয়। সেখানে নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বজায় থাকে।
এতো বড় তহবিল আসবে কোথা থেকে? যুক্তরাষ্ট্র সরকার কোনো অর্থ বিনিয়োগ করেনি এখানে। তবে নিউ ইয়র্ক স্টেট গভর্নমেন্ট ২৫০ মিলিয়ন ডলার অনুদান দেয়। সন্ত্রাসী হামলায় ভবন ভেঙে যাওয়ায় ইন্সুরেন্স বাবদ ডেভেলপার সিলভারস্টেইন কোম্পানি পেয়েছিলো ১ বিলিয়ন ডলার। এরপরেও বহু টাকার মামলা। কোত্থেকে আসবে তা? ভবন মালিকানা প্রতিষ্ঠান দ্য পোর্ট অথরিটি অব নিউ ইয়র্ক এন্ড নিউ জার্সি তখন অন্য এক পরিকল্পনা আঁটে। বাজারে বন্ড বিক্রয় করে দ্রুতই ১ বিলিয়ন ডলার জোগাড় করে ফেলে।
বন্ডের লভ্যাংশ প্রদান করতে পোর্ট অথরিটিকে ব্রিজ এবং টানেলগুলোর উপর অতিরিক্ত সারচার্জ বসাতে হয়। সেকারণে ২০১১ সাল থেকে ২০১৫ পর্যন্ত পোর্ট অথরিটির অধীনে পরিচালিত ব্রিজ এবং টানেলে ৫৬ শতাংশ বেশি হারে টোল আদায় করা হয়। বাকি অর্থ ফ্লোর লীজের আগাম থেকে সংগ্রহ করা হয়।
কিন্তু নির্মাণ বাজেট ততদিনে আরও স্ফীত হয়েছে। এপ্রিল ২০১২তে বাজেট সংশোধন করা হয়। তাতে সম্পূর্ণ নির্মাণ শেষ হতে খরচ দেখানো হয় ৩.৯ বিলিয়ন ডলার। মে ২০১৩, যখন নির্মাণ সম্পন্ন হয়ে ভবনের অপারেশন শুরু হয়, তখন খরচ মিলিয়ে দেখা হয়। শেষতক তিন দশমিক নয় শূন্য বিলিয়নেই ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের নির্মাণ কাজ শেষ করতে পেরেছিলো বিশ্বের অন্যতম ধনী বন্দর কর্তৃপক্ষ।
গ্রাউন্ড ব্রেকিংএর আগেই একটি সিম্বোলিক কর্নারস্টোন পোতা হয়েছিলো ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসে। অর্থাৎ ৪ জুলাই, ২০০৪। তখন ভবনের নাম ছিলো ফ্রিডম টাওয়ার।
জুন ২৩, ২০০৬ অস্থায়ী সিম্বোলিক কর্নারস্টোন সরিয়ে ফেলা হয়। এরপরই এক্সপ্লোসিভ সামগ্রী এবং যন্ত্রপাতি সাইটে নেয়া হয়। এক্সপ্লোসিভ দিয়ে বেডরক (শক্ত পাথুরে মাটি) কাটা হয়। এর উপর কংক্রিটের ফাউন্ডেশন নির্মিত হয়। প্রথম ৩১০ ঘনমিটার বা প্রায় ১১ হাজার ঘনফুট কংক্রিট ঢালাই করা হয় নভেম্বর ২০০৭।
ফাউন্ডেশন শেষ হতে সময় লেগেছিলো ২ বছর। অব্যবস্থাপনা হয়েছিলো টাওয়ার ক্রেন স্থাপনকে কেন্দ্র করে। টাওয়ার ক্রেন বসানোর ফাউন্ডেশন নির্মাণ শেষ হয় টাওয়ার ক্রেন সাইটে পৌঁছানোর পরে। এটি ২০০৮ সালের জানুয়ারি মাস হতে মে মাস পর্যন্ত নির্মাণ চলাকালীন ঘটনা। ততদিনে ফাউন্ডেশন থেকে পিলারের মাথা রাস্তা লেভেলে উঠে এসেছে।
২০০৯ সালে নিউ ইয়র্ক ও নিউ জার্সি পোর্ট অথরিটি ভবনের নাম বদলে ফেলে। ফ্রিডম টাওয়ারের পরিবর্তে নাম রাখা হয় ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেডিং সেন্টার। নাম পরিবর্তন বেশ কাজে দিয়েছিলো বোধহয়। কেনোনা এরপর থেকে ভবনে লীজের পরিমান বাড়তে থাকে। আগ্রহী বণিকদের রিয়েল এস্টেট এজেন্টরা এখানে অফিস পেতে ভিড় জমাতে শুরু করে।
নির্মাণ চলাকালীন সময়েও ভবনে আলোকসজ্জা করা হতো। ১১ সেপ্টেম্বর ২০১১ টুইন টাওয়ার হামলার ১০ বছর পূর্ন হয়। এদিন যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার সাজে ভবনের নির্মাণাধীন ওয়ালে আলো জ্বলে ওঠে। স্মরণ করা হয় দুঃসহ হামলার কথা। একই বছর ২৭ অক্টোবর ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্যাম্পেইনে নির্মাণাধীন ওয়াল গোলাপী আলোয় সজ্জিত করা হয়।
১৪ জুন, ২০১২ ভবনের আলোক সজ্জায় লাল, সাদা এবং নীল ব্যবহার করা হয়। এদিন ছিলো পতাকা দিবস। পতাকা দিবসের সম্মানে এ আলো জ্বালানো হয়েছিলো। কাকতালীয়ভাবে পরবর্তীতে নির্বাচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মদিন ১৪ জুন।
এপ্রিল ২০১২ একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটে। বিশ্বের ইতিহাসে সবচে দীর্ঘ সময় ধরে সর্বাধিক উঁচু দালানের অধিকারী এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিংকে ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার অতিক্রম করে। এম্পায়ার এস্টেট বিল্ডিং টানা চল্লিশ বছর (১৯৩০-১৯৭০) বিশ্বের সবচাইতে উঁচু ভবন ছিলো। অতিক্রম করার মাস দুয়েক পর এটি উদযাপনে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা সাইট ভিজিটে এসেছিলেন। একটি স্টিল বীমে তিনি লিখেন, We remember, we rebuild, we come back stronger! এই বীমটি টাওয়ারের সবোর্চ্চ তলায় বসানো হয়।
ডিজাইন মোতাবেক ওয়ান ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের মূল স্ট্রাকচারের উচ্চতা ১৩৬৮ ফুট বা ৪১৭ মিটার। ফ্লোরের হিসাবে এখানে রয়েছে ১০৪টি ফ্লোর। এগুলির ভেতর মেকানিক্যাল ফ্লোর অন্তর্ভুক্ত। স্পেস হিসাবে ব্যবহৃত ফ্লোরের সংখ্যা ৯৪।
মূল স্ট্রাকচার শেষ হবার পর এর রুফটপে বিশাল স্পায়ার বসানো হয়। যেটি দেখতে একটি স্বতন্ত্র রেডিও টাওয়ারের মতো। মে ১০, ২০১৩ স্পায়ারের সর্বশেষ অংশটি স্থাপন করা হয়। ভবনের চূড়ান্ত উচ্চতা দাঁড়ায় ১৭৭৬ ফুট বা ৫৪১ মিটার। এ সময় এটি বিশ্বের চতুর্থ উচ্চতম ভবনের মর্যাদা লাভ করে। যদিও পরবর্তীতে আরও উঁচু ভবন নির্মিত হওয়ায় এটি এখন বিশ্বের নবম উঁচু ভবন।
সব স্কাইস্ক্র্যাপার ভবনের মতো এখানেও রয়েছে অবজারভেশন ডেক। পুরো তিনটি ফ্লোর জুড়ে ট্যুরিস্ট এট্র্যাকশন। ১০০ তলায় অবজারভেশন ডেক। ১০১ তলায় ফুড কোর্ট। ১০২ তলায় বিভিন্ন ইভেন্ট স্পেস।
১০০ তলার উপরে উঠে খেতে চাইলে এরচে ভালো জায়গা দুনিয়াতে নেই। সুস্বাদু খাবারের সাথে আছে হাডসন নদীর চোখ জুড়ানো দৃশ্য।
ব্রামটন, অন্টারিও, কানাডা
