পদ্মা সেতুর কারিগরি শিল্পীরা


২৭ জানুয়ারি ২০২০। রাত দশটার দিকে স্যানডিয়াগোর এরিয়া কোড ভেসে এলো ফোনের পর্দায়। ধন্ধে পড়লাম ধরবো কিনা! ভাবতে ভাবতেই ফোনটা রিসিভড হয়ে যায়।
হ্যালো….
মিল্টন, রজব আলী বলছি।
চমকে উঠলাম। ওঁর এখন স্পিড বোটে পদ্মা নদী দাবড়ে বেড়াবার কথা। স্যানডিয়াগোতে কি করে? নাকি ভয়েস ওভার ইন্টারনেট প্রটোকলের চক্করে ঢাকা’র কল স্যানডিয়াগো ঘুরে টরন্টো পৌঁছলো?
আরে রজব আলী? কেমন আছো বন্ধু?
ভালো।
কিন্তু.. ৮৫৮ এরিয়া কোডের নম্বর কেনো ভাই? কোত্থেকে কথা বলছো?
আমি স্যান্ডিয়াগোতে। ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার স্যান্ডিয়াগো ক্যাম্পাসে।
কি করো ওখানে?
পদ্মা ব্রিজের পাইলিংএর কিছু টেস্ট করাতে এসেছি।
কোন্ টেস্ট?
স্কিন ফ্রিকশন পেন্ডুলাম টেস্ট….।
কেনো এন্ডবিয়ারিং কি কম? বেডরকে পৌছায় না কেইশন? সকেট ডেপথ কতো?
দুজনেই আমরা সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএর জিওটেকনিক্যাল বিশেষায়িত শাখায় কাজ করি। দুজন দুজনের ভাষাটা ভালোই বুঝি। তবে টেকনিক্যাল বিষয় উপস্থাপনের প্ল্যাটফর্ম ফেসবুক নয়। সুতরাং বিস্তারিত ফোনালাপ নাইবা শোনালাম।
জুন ১৬, ২০২২। টরন্টো সময় দুপুর বারোটা। তিনবার রিং হবার পর ওপার থেকে ফোন ধরলো রজব আলী। ব্যস্ত কন্ঠে বললো, “বিস্তারিত আলাপের সময় নেই বন্ধু। সংক্ষেপে প্রশ্ন করো।”
বললাম, “ঢাকায় রাত দশটা বাজে। ঘুমোতে এখনও বেশ দেরী। এতো তাড়া কিসের বন্ধু?
“না, মানে মিটিং ছিলো নয়টা পর্যন্ত। ভোর থেকে দৌড় চলছে। ক্লোজিংএ যা হয়”। রজব আলীর গলায় ক্লান্তির ছাপ সুস্পষ্ট।
সেতুর পাইলিং নিয়ে একটা কনস্ট্রাকশন থ্রিল লিখতে চেয়েছিলাম। আরো তথ্য দরকার।
“২৫ তারিখের পর ফোন দাও বন্ধু। টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন আর কনস্ট্রাকশন প্রসেস নিয়ে ডিটেইল আলোচনা করা যাবে”। বলেই লাইন কেটে দিলো রজব আলী।
সদা সুস্থির শীতল মস্তিষ্কের রজব আলী কথাপ্রিয় মানুষ। দুই বাক্যের পর ফোন তুলে রাখা ওঁর স্বভাবে নেই। কিন্তু ওঁকে রাখতে হলো। সকাল সন্ধ্যা পদ্মা সেতুর ক্লোজিং ডকুমেন্ট তৈরী করতে হচ্ছে। কবছর হলো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে কাজ করেছে রজব আলী এবং পুরো পদ্মাসেতু টিম।
পুরো নাম সৈয়দ রজব আলী। পদ্মা সেতু প্রকল্পের নির্বাহী প্রকৌশলী। বৃহৎ প্রকল্প হওয়ায় প্রেষণে আসা পদবীটি অন্যান্য নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে গুলিয়ে ফেলা যাবেনা। কেনোনা যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগে তাঁর মূল পদবী তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী।
প্রকৌশলী রজব আলীর কথা কেনো বলছি তার একটা স্বপ্রণোদিত ব্যাখ্যা দিতে চাই। যেকোনো বড়ো স্থাপনায় সবার প্রথম কৃতিত্বের দাবিদার এর উদ্যোক্তা। তবে সে উদ্যোগ কেবল স্বপ্নদেখা অবাস্তব উদ্যোগ নয়, বাস্তবসম্মত সফল উদ্যোগ। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার চেতনায় গেঁথে ছিলো। তিনি বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প নিয়েই পদ্মা সেতুর স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাই শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও এর সফল বাস্তবায়ন করতে পেরেছেন। সুতরাং ইতিহাসে এর রাজনৈতিক স্থপতি তিনিই থাকবেন।
তবে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন ও নির্মাণ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ অরাজনৈতিক এবং ফলিত বৈজ্ঞানিক বিষয়। কারিগরি অর্থে পদ্মা সেতুর স্থপতি কে, তা নিয়ে জিজ্ঞাসা থাকতে পারে। প্রথাগত স্থপতি বা আর্কিটেক্টগণ সাধারণত সেতু ডিজাইনে জড়িত থাকেননা। সেতুর স্ট্রাকচারাল প্রকৌশলীকে অনেকে এর প্রধান স্থপতি গণ্য করেন। কিন্তু নির্মাণে অন্য যেসকল প্রকৌশলী জড়িত, তাঁরা কি এর স্থপতি নন? রজব আলীরা কি এই কৃতিত্বের দাবীদার নন?
পদ্মা সেতুর নির্মাণ প্রক্রিয়ায় জড়িয়ে আছেন অসংখ্য দেশী বিদেশী প্রকৌশলী। তাঁদের কেউ ডিজাইন টিমে, কেউবা নির্মাণ তত্ত্বাবধানে, কেউ আবার সমন্বয় করার দায়িত্ত্বে। প্রতিটি দায়িত্ত্ব সমান গুরুত্ত্বপূর্ণ। একটি ইভেন্টের ভুল পদক্ষেপ প্রপাগেট করে অন্যান্য ইভেন্টে।
নির্বাহী প্রকৌশলী রজব আলীর কাজ ছিলো তত্ত্বাবধান এবং সমন্বয় দুটোই। ভীষণ জটিল এবং ভয়াবহ চ্যালেঞ্জিং কাজ। দেশী কন্ট্রাক্টর নিয়ন্ত্রণ করা যতো সহজ, বিদেশী কন্ট্রাক্টরের বেলায় ততো সহজ নয়। কাগজে কলমে ডিজাইন করতে যতোটুকু চ্যালেঞ্জ সামলাতে হয়, নির্মাণ বাস্তবায়নে এবং মান নিয়ন্ত্রণে তারচে বেশী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়। এই চ্যালেঞ্জের ফিল্ডলেভেল সৈনিক প্রকৌশলীদের নেতৃত্বে থাকেন নির্বাহী প্রকৌশলী। সম্মুখযুদ্ধের তুফান তাঁকেই সামলাতে হয়। সেই তুফানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জিতেছেন প্রকৌশলী রজব আলী।
নির্মাণ যুদ্ধে আরো ছিলেন নাম না জানা ব্যাটলফিল্ড সোলজার প্রকৌশলী। তবে রজব আলীকে কাছ থেকে দেখেছি। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংএ স্নাতক রজব আলী অসংখ্য ব্রিজ নির্মাণ করে হাত পাকিয়েছেন। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলে প্রেষণে এখানে যোগদান করেন।
সেতু নির্মাণে সম্মুখযোদ্ধা অন্য প্রকৌশলীদের গল্প হয়তো ভিন্ন। তবে এক জায়গায় তাঁদের দারুণ মিল। তা হলো যুদ্ধ শেষে এই বীর সন্তানদের স্বীকৃতির অভাব।
বিদেশী কন্ট্রাক্টর, বিদেশী প্রকৌশল সংস্থা, এমনকি নির্মাণ কার্যে ব্যবহৃত বিদেশী যন্ত্রপাতিরও প্রশংসা উচ্চারিত হয়! কেবল এপ্রিসিয়েশন পায়না দেশীয় প্রকৌশলীরা!

ব্রামটন, অন্টারিও, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent