প্রতিদিন বদলে যায় পরিস্থিতি

ছবিরাজীব রাজু

ইন্ডিয়ার সাথে পাকিস্তানের যুদ্ধ শুরু হলো চার ডিসেম্বর। দিনটা মনে পড়ে সামিয়ার। ভোর থেকে প্রচণ্ড শব্দ আকাশে। প্লেন উড়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সীমানায়। ওরা বোমা ফেললে, দেশের ভিতরে যারা আছে তাদের ক্ষয়ক্ষতি হবে, এত মুক্তিযোদ্ধা দেশের ভিতরে বোমা তাদের বাঁচিয়ে কীভাবে মারবে? ভয়ে দুরুদুরু বুক। দু’দিন পর খবর এলো ইন্ডিয়া নাকি বাংলাদেশকে স্বাধীন দেশ হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
ভয়, উল্লাস, আনন্দ, আতংক সব মিলিয়ে প্রতিদিন বদলে যায় পরিস্থিতি। কি হচ্ছে সঠিক খবর কেউ কি এনে দিতে পারে? কতদূরে সেই পরিচিত বাড়িতে বেঁচে আছে কি মা-বাবা, ভাই? কোনোদিন কি দেখা হবে তাদের সাথে?
ষোল ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। উল্লাস করছে সব মানুষ। পাকিস্তানি আর্মি সারেন্ডার করেছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। সামিয়ার চোখ ভরে উঠছে জলে। এতদিনের ভয় আতংক উদ্বিগ্নতা শেষ, অস্থিরতার সময় শেষ। কিন্তু ওর বড় ফাঁকা লাগছে সবকিছু। সব কাজ শেষ। সবাই ফিরে যাবে নিজের বাড়িতে, আপন মানুষের কাছে। ও কোথায় যাবে, কেমন করে যাবে? কোনো পথ কোনো অলিগলি বেয়ে সে এখানে এসেছিল। শাহরিয়ার কি আসবে ওকে নিতে? ইসরাত, শিবু, সাদেকীন, হারুন, কলিম কেউ আর ফিরে এলো না। বেঁচে আছে না মরে গেছে? জীবনে কোনোদিন কি দেখা হবে এদের কারো সাথে? কারো বাড়ির ঠিকানা রাখা হয়নি। এতগুলো মাস অস্থির উত্তেজনায় কেটে গেছে। এই ক্যাম্প ছিল সবার ঠিকানা। এখন এই ক্যাম্প উঠে যাবে, কেউ আর এখানে ফিরে আসবে না। কাউকে খুঁজে পাবে না। কারো সাথে দেখা হবে না। শিবু যখন দিদি বলে ডাকতো, মনে হতো ছোট ভাইটি যেন এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। কলিম এত অসুবিধার ভিতরও সামিয়ার সুখ-সুবিধার খবর নিত। অবকাশে বউ আর মেয়ের গল্প করত। ইসরাতের সুন্দর পরিবারে সবার কথা জানা হয়ে গেছে। বড় বোন, দুলাভাই, ভাই-ভাবী, দাদী, মা-বাবা সবাইকে ফাঁকি দিয়ে সবার ছোট ছেলেটি যুদ্ধে চলে এসেছে। এতগুলো মাস কারো কোনো খবর জানে না। ওরাও জানে না ওর খবর। সাদেকীন প্রেমিকার কথা ভেবে উদাস হয়ে যেত। হারুন বন্ধু পলাশের গল্প করত বেশি। কেমন আপন এক পরিবারের মতন হয়ে গিয়েছিল সবাই। এইসব পরিচিত মুখ। বাংলাদেশের এক একটা কোণে বসে নিজের জীবনযাপন করবে। আবার কি কোনো মিলন মেলায় দেখা হবে কোথাও এদের কারো সাথে কোনোদিন?
একে একে বিদায় নিচ্ছে সবাই ক্যাম্প থেকে। নিজের বাড়ির টানে আর একদিনও থাকতে চায় না কেউ এখানে। সামিয়া মনে মনে ভাবে দু-একদিন অপেক্ষা করে। যদি কেউ ফিরে আসে? একসময় মনে হয় সবাই নিজের বাড়ি যাবে যুদ্ধ শেষে। ক্যাম্পে কে ফিরে আসবে ওকে দেখতে। ঢাকায় ফিরছে একটা দল। লিলিবু, টুলু আপা ওদের ভাইয়ের সাথে ক্যাম্প থেকে যাবে। ওদের সাথেই ফিরবে ঠিক করল সামিয়া। নৌকায়, হেঁটে, বাসে, নানান রকম যানবাহনে চড়ে, বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট পুল পেরিয়ে ঢাকায় পৌঁছাল সামিয়ার দল সন্ধ্যাবেলা। লিলিবুদের বাড়িতেই উঠল প্রথমে। কিছুই জানে না সামিয়া বাড়ির খবর এখনো।
টেলিফোনে বাড়ির নাম্বার ঘুরায়ে রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছে সামিয়া। কেউ ধরবে তো ফোনটা, কেউ যদি না বেঁচে থাকে তবে কোথায় যাবো আমি? মা বাবা ধরো ধরো ধরো, নীরবে প্রার্থনা করতে থাকে সামিয়া। সময় যেন অনন্তকাল হয়ে যাচ্ছে। ওপাশ থেকে কেউ একজন ফোন উঠাল, হ্যালো ফ্যাসফ্যাসে ফিসফিসে কণ্ঠ।
মা মা সামিয়ার কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে যায়। টান টান ভয় ভেঙে যেন গলে পড়ে বৃষ্টি। কোনোমতে আবার বলে, মা গো..
সামিয়া, তোরা সবাই কেমন আছিস? কথা বল কিছু বলিস নাতো…সামিয়ার চোখ বেয়ে ঝরে অবিরল ধারায় জল,
মা বেঁচে আছে আমার মা, অনেক কষ্টের মাঝে এক টুকরো শান্তি।
ঠিকানা নিয়ে তক্ষুণি মা-বাবা, সাব্বির চলে আসে লিলিবুদের বাড়ি সামিয়াকে নিতে। কতযুগ পরে যেন পরিচিত ভালোবাসার স্বাদ পায় সামিয়া। কান্না, হাসি, প্রতিদিনের গল্প আর ফুরায় না। দিন দশ পরে শাহরিয়ার আসে। সাব্বির একটা স্যালুট ঠুকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখে শাহরিয়ারের কাঁধে ঝুলান চাইনিজ স্টেনগান। সারাক্ষণ শুনে ওর অপারেশনের গল্প। সাব্বিরের বড় আফসোস ও যুদ্ধে যেতে পারেনি। এই ন’টা মাস বন্দি হয়ে থেকেছে ঘরের ভিতর। ও বাড়িতে থেকে গেলে শাহরিয়ার ভাই’র সাথে যুদ্ধে চলে যেতে পারত। ও বাড়ির কথায় ভয়ে যন্ত্রণায় নীল হয়ে উঠে সামিয়া, শাহরিয়ার। সেই কালরাতের স্মৃতি কিছুতেই ভুলে না ওরা। সেই পালিয়ে বেড়ানোর দিনগুলি আর বাবুয়ার কথা।
জীবনযাত্রা শুরু হয় ধীরে ধীরে। শাহরিয়ার চলে যায় লন্ডনে ওর পড়ালেখা শেষ করতে।
মাস ছয় পরে হারুন আসে একদিন। এত খুশি হয় সামিয়া যেন আপন মানুষ ফিরে এসেছে এতদিন পরে। গল্প আর ফুরায় না। কেমন ছিল ? ওর পরিবারের সবাই কেমন আছে। সবাই ভালো আছে। বোন, আব্বা, মা। কলকাতায় চলে গিয়েছিল। তবে ওদের বাড়িঘর সব দখল করে নিয়েছিল রাজাকার। সব ভেঙেচুরে একাকার, জিনিসপত্র লুটে নিয়েছে। তবে জানের কোনো ক্ষতি হয়নি।

টরন্টো, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent