দীর্ঘায়ুর সাধ কার নাই?

এ বিশ্বে যত প্রাণ আছে, তা সেটা উন্নতমানের মানুষ হোক কি অতি ক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট, ফাঙাস বা ভাইরাস― এসব প্রাণের অতি গভীরে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষ, তাদের প্রত্যেকের মনে একই আকুতি ’মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’। তাই হয়তো কবির কণ্ঠ ব্যথিত হয় এভাবে :
তৃণ ক্ষুদ্র অতি
তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী
কহিছেন প্রাণপণে ’যেতে নাহি দিব’।
আয়ুক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব-নিব,
আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে
কহিতেছে শতবার ‘যেতে দিব না রে’।
এ অনন্ত চরাচরে স্বর্গমর্ত ছেয়ে
সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন ‘যেতে নাহি দিব’। হায়
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়।
চলিতেছে এমনি অনাদি কাল হতে।
প্রলয়সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে
প্রসারিত-ব্যগ্র-বাহু জ¦লন্ত-আঁখিতে
’দিব না দিব না যেতে’ ডাকিতে ডাকিতে
হু হু করে তীব্রবেগে চলে যায় সবে
পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত কলরবে।

- Advertisement -

আসলেই তাই। সৃজনের স্বার্থে পুরোনো সকল কিছু চলে যায়, যেতে দিতে হয়। কিন্তু ওই যে টান, সেটাই সমস্যা আসলে বাইরের জগতে যেমন তেমনি কোষের গভীরেও। কোষ বিভক্তির সময় ডিএনএগুলো দুই কোষের মাঝে ভাগ হয়ে যেতে যেতে কী মনে করে দাঁড়ায়, পুরোনো বন্ধন ছেড়ে তাদের হয়তো যেতে ইচ্ছে করে না। সেজন্য প্রতিবার কোষ বিভক্তির সময় ক্রোমোজোমকে সুরক্ষার মমতায় ঢেকে রাখা ডিএনএ’র দুইপাশের ঘোমটা (ইংরেজি নাম টেলামিইর)ক্ষয়ে যেতে থাকে, মনে হবে যেন দুষ্টু কেউ আঁচল ধরে টান মেরেছে অথবা অদৃশ্য কোনো ভূত খেয়ে ফেলছে দুপাশ থেকে। জীববিজ্ঞানের পাঠ থেকে আমরা জানি যে, প্রজননকোষ ছাড়া মানুষের শরীরের প্রতিটি কোষে ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম থাকে, যার অর্ধেক আসে বাবার কাছ থেকে আর বাকি অর্ধেক মায়ের। আমাদের বেঁচে থাকার পুরো সময় জুড়ে প্রজননকোষ ছাড়া শরীরের আর সকল কোষের বিভাজনের বেলায় ক্রোমোজোমের এই ভারসাম্য বজায় রাখাটা অত্যন্ত জরুরি। একটা সুস্থ শরীর তা ধরে রাখতে সক্ষমও বটে। কিন্তু ডিএনএ’র দুইপাশের ঘোমটা পড়ে যাওয়াটা ঠেকাতে না পারলে বিভাজিত কোষগুলো পথ হারায়, তখন বার্ধক্য এবং বার্ধক্যজনিত নানারোগ এসে শরীরে হানা দেয়। ডেভিড সিনক্লিয়ারের মতো বিজ্ঞানীরা দেখেছে যে, ডিএনএ’র ঘোমটা পড়ে যাওয়াটা ঠেকানো গেলে আত্মপরিচয়ের সংকটে ভুগতে থাকা কোষগুলোর মরে যাওয়াটা বিলম্বিত করা সম্ভব, আর এভাবে সম্ভব হয় যৌবনকে ধরে রাখা।
ডিএনএ’র ঘোমটা পড়ে যাওয়ার পেছনে নানা উপাদানকে সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে বিজ্ঞানীরা, এর মধ্যে ৩টি বিশেষ উপাদানের ব্যাপারে তাদের আগ্রহ বেশি। এগুলো হচ্ছে এম-টর, এনএডি+ এবং এএমপিকে। তাঁরা এদের নাম রেখেছে লংজিভিটি বা দীর্ঘায়ু ঘটক।
এম-টর এক ধরনের প্রোটিন যার ব্যাপারে বলা হয় যে, এটা রক্তের স্রোতে ভেসে আসা গøুকোজ, গ্রোথ হরমোন এবং বিশেষ করে প্রোটিন থেকে পাওয়া অ্যামিনো অ্যাসিডের কার্যক্রম সমন্বয় করা ছাড়াও আমাদের কোষের পুষ্টি, অক্সিজেন ও এনার্জির পরিমাণ সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখে এবং মগজে সংকেত পাঠায়। শরীরের মাংসপেশি বৃদ্ধি করার মূল কারিগর বিধায় বডিবিল্ডারদের প্রোটিনশেকে এটিকে যুক্ত করে বিক্রি করা হয়। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এম-টরের কাজকামও বৃদ্ধি পায় এবং একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়ে। কার্বের বেলায় যেমন ইনসুলিন, প্রোটিনজাত খাবারের বেলায় তেমন এম-টরঅ্যামিনো অ্যাসিডকে কোষের দরজায় হাজির করতে এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকে। ওদিকে শরীরের মৃত কোষের মধ্যেও যে প্রোটিন আছে এবং সেটাকে যে টেনে আনা যায়, সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই রাখে না। অটোফ্যাজিতে মৃতকোষ থেকে প্রোটিন সংগ্রহের কাজটি হয়, কিন্তু এম-টর জেগে থাকলে অটোফ্যাজি কাজই শুরু করতে পারে না। বিজ্ঞানিগণ মনে করে, এমটর-এর কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অকেজো বা দুর্বল অর্গান মেরামত করার পাশাপাশি মানুষের আয়ুও বাড়ানো সম্ভব।
এনএডি+ এর ব্যাপারে বলা হয় যে, এটা কোষের পাহারাদার। কাজেই পাহারা বাড়াও, তাদের সংখ্যা বাড়াও। এমন কিছু করো যেন প্রতি ফাগুনে সংখ্যায় তারা দ্বিগুণ হয়। ফাগুন এখানে কথার কথা। অনেক আগে জহির রায়হায় তার এক উপন্যাসে এই রূপকটি ব্যবহার করেছিলেন, যেখানে ভাষা আন্দোলনে শহিদদের সংখ্যাকে ভিন্ন মাত্রায় উপস্থাপনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কোষের বেলায় এই দ্বিগুণ হওয়াটা কেনো বিশেষ সময়ের জন্য নির্ধারিত না। চাইলে যেকোনো সময়ই তা সম্ভব।
এএমপিকে’র ব্যাপারে বলা হয় যে, এটা কোষের বিপদের বন্ধু। নিরন্তর তার কাজ হচ্ছে কোষ থেকে যে শক্তি উৎপাদন হয়, তার উৎসের দিকে খেয়াল রাখা এবং অভাবের সময় পেটে যখন দানাপানি না পড়ে, তখন সেই মহা দুর্যোগে এই এএমপিকে নামক বিপদের বন্ধুই কোষের জন্য শক্তি উৎপাদনে ত্রাতার কাজ করে। নিজে অংশ নেয় না, কিন্তু কাকে দিয়ে কী করাতে হবে, সেটা তার ভালো করে জানা, ফলে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’ উপন্যাসের সেই অপুর মায়ের মতো সে তৎপর হয়ে ওঠে। মন্দাকালে কলিজা যদি গ্লুকোজ সরবরাহ করে তো সেই গ্লুকোজ (অবাক মনে হলেও এটাই সত্য যে, অনাহারে থাকার সময় লিভার মাঝে মাঝে নিজ থেকেই গ্লুকোজ উৎপাদন করে। আর এটা সে করতে পারে আগেই জমিয়ে রাখা গ্লাইকোজেন থেকে। আমাদের মাংসপেশিতেও কিছু গ্লইকোজেন জমা রাখার ব্যবস্থা আছে।) নিয়ে সে কোষের কাছে হাজির হয়, আর তা যদি না হয় এবং কলিজা থেকে গ্লুকোজের পরিবর্তে কিটোন এসে পড়ে, তখন এএমপিকে বুঝে ফেলে সময় খারাপ, ফলে সে শরীরে জমানো চর্বির কাছে হাজির হয়। এভাবে যখন যাকে দরকার তখন তার কাছে ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে হাজির হয় এই এএমপিকে। এখানেই শেষ না, কোষের দুয়ারে অক্সিজেন সরবরাহের অনুরোধ নিয়ে রক্তের কাছে যাওয়া থেকে শুরু করে প্যানক্রিয়াসের কাছে হাজির হয়ে বলা― ইনসুলিন আমার চাই তা না হলে গ্লকাগন! কলিজার কাছে গ্লুকোজ অথবা গ্লাইকোজেন না পেলে বের থেকে খাবার আসবে সেই আশায় সে দিন গোনে না, বরং প্রোটিন কিংবা শরীরের চর্বি গলিয়ে কোষের জন্য শক্তি উৎপাদন করে যে উপাদানগুলো, তাদেরকে তখন সে হাতে পায়ে ধরে। শরীরে চর্বি আর প্রোটিন জমা থাকতে মানুষ তো মানুষ কানো প্রাণী না খেয়ে মারা যাবে, এটা এএমপিকে মানবে কেন! এই বন্ধু আছে বলেই শীতকালে বহুসংখ্যক প্রাণী ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে বেঁচে থাকতে পারে। বহু বছর আগে মানুষও সেভাবেই বাঁচতো। এখন খাদ্যের অভাব নেই, হলেও তা ক্ষণিকের, তাই মানুষ এমন পরম বন্ধুর খবর ভুলে গেছে।
শরীরের ইনসুলিন ও অ্যামিনো এসিডকে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এম-টরের কার্যক্রম সীমিত হয়। তখন ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখা ছাড়া তার কোনো উপায় থাকে না। এম-টর নিয়ন্ত্রণের সহজ পথ হচ্ছে খাবারে কার্ব এবং বিশেষ করে প্রোটিন কমিয়ে ফেলা এবং খেলেও যেসকল কার্ব বা প্রোটিন চর্বির মায়ায় জড়িয়ে শরীরে ঢুকতে পারে, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া। মজার বিষয় হচ্ছে, অভাবের সময় যাকে সক্রিয় হতে দেখা যায়, সেই বিপদের বন্ধু এএমপিকে কিন্তু শরীরচর্চার সময় ইনসুলিনের কোনো খোঁজই নেয় না। ইনসুলিন ঘুমিয়ে আছে না কি করছে, সেই খবরের চেয়ে তার কাছে তখন বড় হয়ে ওঠে শরীরের কোষগুলোয় খাবার ও অক্সিজেন সরবরাহ করা। সেজন্য কলিজা থেকে গøুকোজ নিয়ে দ্রæত হাজির হয় কোষের কাছে। ইনুসলিনের কাছে হাত না পাতাটা তার পুরোনো অভ্যাস, কাজেই ইনসুলিন কখন কোষের কাছে খাবার পৌঁছাবে সেই আশায় বসে থাকলে কোষ বাঁচবে? যারা শরীরচর্চা করে তারা কত সহজেই না ইনসুলিনকে ফাঁকি দিতে সক্ষম হয়। এই সময় প্রোটিন না খেলে এম-টর চলে যায় বিশ্রামে। এম-টরকে বিশ্রামে রাখার বেলায় এএমপিকে কিন্তু বেশ তৎপর।
কোষের দুয়ারে খাবার ও অক্সিজেন নিয়ে আসার কাজ শেষ হয়ে গেলে এনএডি+ নামক কোষের পাহারাদারের কাজ শুরু হয়ে যায়। স্বল্পাহার, দৌড়ঝাঁপ, উষ্ণতা কিংবা শীতের মতো শারীরবৃত্তিক চাপে রাখলে কেন জানি এই পাহারাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়, ফলে সে ব্যস্ত হয়ে পড়ে কোষ রক্ষার কাজে। তখন খবর যায় জীবনরক্ষাকারি সারতুইন-১ এর মতো জিনের কাছে। তারা তখন কোষের মধ্যে ঘুমিয়ে থাকা ঝাড়–দার, যাকে বিজ্ঞানিগণ আদর করে লাইসোসলম বলে ডাকেন, তার ঘুম ভাঙায়। আর ঘুম ভেঙেই অটোফ্যাজি নামক পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করে দেয় এবং মরা ও দুর্বল কোষগুলো থেকে প্রোটিন সংগ্রহ করে সতেজ কোষগুলোকে দিয়ে আসে। ঝাড়– দেওয়া ছাড়াও লাইসোসমের আরেকটি কাজ হচ্ছে কোষের দিকে বদমায়েশের মতো তাকিয়ে থাকা ব্যাকটেরিয়া কিংবা ভাইরাসকে ঠেঙানো। শরীরের ইমিউন অর্থাৎ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হলে কোষ তার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ করে টিকে থাকার চেষ্টা করে। তবে, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ।
অটোফ্যাজি নিয়ে পরে বিস্তারিত বলা যাবে, আপাতত ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরকে দুর্যোগের মুখোমুখি করার উপায়গুলো নিয়ে কিছু বলা যাক। ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণের সহজ উপায় হচ্ছে ভালো করে ঘুমানো, মিথ্যা পরিহার করা, মনকে প্রফুল্ল রাখা, কার্ব জাতীয় খাবার, যেমন চাল, আটা কিংবা মিষ্টি জাতীয় ফল কম করে খাওয়া, সাদা চিনি আছে এমন যেকোনো খাবার, সেটা যতই মুখরোচক হোক, তাকে পরিহার করা এবং খাওয়ার পরে একটু দ্রুত হাঁটা, যেন কোষের কাছে গøুকোজ থেকে পাওয়া শক্তি পৌঁছাতে ইনসুলিনের দ্বারস্থ হতে না হয়। বাড়তি হিসেবে নিয়মিতভাবে ম্যাটফরফিন খাওয়া যায়, অধ্যাপক ডেভিড সিনক্লিয়ার সেটাই করে আসছেন দীর্ঘদিন ধরে। যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস আছে, তারা মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো এই ড্রাগের সুবিধাটা পেয়ে আসছে। অপরদিকে এনএডি+ কে কার্যক্ষম বা সচেতন রাখার স্বার্থে শরীরকে চাপে রাখার সহজ কৌশল হচ্ছে রোজা রাখা, তার মধ্যে জলরোধা বা আধারোজাও আছে। জলরোজা অর্থাৎ ওয়াটারফাস্টিং-এ মাঝে মাঝে লেবু আর হিমালয়ান পিংকসল্ট মেশানো পানি বা ডাবের পানি পান করে শরীরের জলশূন্যতা রোধ করা কিংবা ইলেকট্রলাইটের ভারসাম্য ধরে রাখা হয়। অপরদিকে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এ ১৬-১৮ ঘণ্টার রোজা। যারা রমজান মাসের রোজায় অভ্যস্ত তাদের কাছে জলরোজা কিংবা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর আলাদা কোনো কদর নেই। কিন্তু যাদের সেই অভ্যাস নেই, তাদের কাছে ওয়াটার ফাস্টিং বা ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং-এর তাৎপর্য কম না।
রোজা নিয়ে নানান আয়োজন। ধর্মের হুকুম তো আছেই, সেই হুকুম মেনে ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা চাঁদের মাস রমজানে এক মাস রোজা রাখে। হিন্দু, খ্রিষ্টান কিংবা ইহুদিসহ অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের বেলায়ও রোজার হুকুম আছে। এর বাইরে অধুনা ডাক্তার ও পুষ্টিবিদরার রোজার পক্ষে ওকালতি করছে। এদের মধ্যে কেউ হয়তো একদিন পরপর রোজা রাখার পক্ষে বলছে, কেউবা টানা ৩ কি ৫ দিন, তবে বেশিরভাগই জলরোজা, অর্থাৎ দিনের বেলায় চিনিছাড়া চা বা কফি। পুষ্টিবিদ এবং গ্লো-১৫ বইয়ের লেখিকা নাওমি তো জাপানি সবুজ চায়ের ভক্ত, তার অভিমত হচ্ছে এই চা অটোফ্যাজিকে দ্রুততর করে, কাজেই অনাহারে থাকার সময় বেশি বেশি করে সবুজ চা পান করতে হবে। আমেরিকায় কিছু পাগল প্রকৃতির মানুষ আছে, যারা কি না ৭ দিন ধরে এরকম জলরোজা রাখে।
দৌড়ঝাঁপের বেলায় সপ্তাহে ৪ দিন, প্রতিবার ২০-৩০ মিনিট করে হাঁটা এবং প্রতি ৫ মিনিট পরপর ১ মিনিটের দৌড়― পাগলা কুত্তার ভয়ে মানুষ যেভাবে দৌড় দেয় সেভাবে, যেন শরীর আতঙ্কিত হয়। আর গরম ও শীতের সময় সপ্তাহে একদিন শরীরকে ১০ মিনিটের জন্য সেই তাপমাত্রার মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া। যাদের সেই সুযোগ নেই, তারা কৃত্রিমভাবে বানানো সনারুমে যেতে পারে, তারপর সেখান থেকে বের হয়ে ২-৩ মিনিট বরফশীতল জলে অবগাহন।
এনএডি+ নামক পাহারাদেরখাবার হচ্ছে ভিটামিন ডি-৩; কাজেই এর সরবরাহ অটুট রাখাটা জরুরি। কেবল এনএডি+ নামক পাহরাদারকে জাগিয়ে রাখা না, কোষের ডিএনএকে জাগিয়ে রাখার কাজটিও ভিটামিন ডি-৩ করে থাকে। এই ভিটামিনের অভাবে পেটের মধ্যে যত ভালো ভালো খাবারই পড়–ক না কেন, আর রক্তের মাধ্যমে সেগুলো কোষের দরজায় পৌঁছাক না কেন, ডিএনএ যদি অলসভাবে ঘুমায় তো কার সাধ্য কোষকে পুষ্টি জোগায়। খাদ্যকে পুষ্টিতে রূপান্তর ঘটনানোর সেই মহান চুলা, যাকে বিজ্ঞানীরা আদর করে মাইটকন্ড্রিয়া বলে ডাকে, তখন সে কী করে? দরজায় খাবার অথচ ডিএনএ তাদেরকে টেনে মাইটকন্ড্রিয়ার কাছে আনছেই না। অনেকটা বাজার এনে বাসায় দরজায় ফেলে রাখার মতো― গৃহিণী যদি সেগুলোকে রান্নাঘরে না আনে, কাটাকুটো করে চুলোয় না চড়ায় তো আহার জুটবে? তো ভিটামিন ডি-৩ খুব বিনয়ের সাথে গৃহিণীকে বাজারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
একটা সময় ছিল যখন মানুষ তো বটেই বৃক্ষ-তরুলতা থেকে শুরু করে সকল প্রাণী প্রাকৃতিক খেয়ালের শিকারে পরিণত হতো এবং মহাকালের সেই যাত্রায় কেবল সক্ষমেরাই টিকে থাকতো। এখনও তাই। আধুনিক সময়ে এসে মানুষ প্রকৃতির অনেক খেয়ালি দৈত্যকে বাক্সবন্দী করতে সক্ষম হয়েছে বটে, তবে বিনিময়ে নিজেকে রক্ষাকারি ওই জিনগুলোকে অলস বানিয়ে ছেড়েছে। স্বল্পাহার, দৌড়ঝাঁপ বা উষ্ণতা-শীতের মুখোমুখি হওয়ার মধ্য দিয়ে মূলত লক্ষ বছর ধরে বংশানুক্রমে আমাদের শরীরে বয়ে বেড়ানো জিনগুলোকে জাগিয়ে তোলার একটা ব্যবস্থা করা হয় মাত্র।
ডিএনএ’র ঘোমটা পড়ে যাওয়া কীভাবে ঠেকানো যায় তা তো জানলাম, এবার ডিএনএকে কীভাবে স্বাস্থ্যকর রাখা যায় সেই বিষয় নিয়ে কিছু জানার চেষ্টা করি। কে না জানে যে, সুস্থ দেহে সুন্দর মন। তো ডিএনএ’র বেলায় সেই সত্য আরও প্রকট। ফিরে যাই লক্ষ বছর আগে। সেই সময় থেকে শুরু ১০ হাজার বছর আগে কৃষি সভ্যতায় আসার আগ পর্যন্ত মানুষ প্রকৃতির বুক থেকে পাওয়া খাবার খেয়েই বেঁচেছে। সেই খাবার এসেছে নানাজাতের পশুপাখির মাংস, মাছ, গাছের ফলমূল থেকে। কৃষি সভ্যতায় আসার আগের ১ লক্ষ বছর ধরে খাবারের এই জোগানটা ছিল অনিয়মিত এবং পুরোপুরি ঋতুনির্ভর। কেবল মানুষ না, সকল পশু-পাখি-গাছ-পালা-মাছ-পতঙ্গ ছিল প্রকৃতির খেয়ালনির্ভর। সভ্য হওয়ার পথে মানুষ আবাদি জমিতে শস্য দানা থেকে শুরু করে নানারকমের শাক-সবজি, ডাল, বাদাম ইত্যাদি ফলাতে শুরু করে। তারপর কোনো একসময় হয়তো গরু-ছাগল-হাঁস-মুরগিকেও পালতে শুরু করে, ফলে বন থেকে পশুপাখি মানুষের আশ্রয়ে এসে বড় হয়। মানুষ তাদের কাছ থেকে পাওয়া ডিম, দুধ কিংবা মাংস খায়। এই ইতিহাস অনেক পুরোনো, তাই দায়টাও অনেক বড়। একে আমরা রবীন্দ্রনাথের ভাষা ধার করে বলতে পারি সভ্যতার ঋণ। একেবারে আধুনিক হতে গিয়ে সভ্যতার সেই ঋণকে আমরা অস্বীকার করতে পারি, কিন্তু আমাদের শরীর তা করবে কেন?
অভিযোজনের পক্ষে জিনের প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। সেই সময়টুকু না দিয়ে বিগত কয়েক দশক ধরে মানুষ যেভাবে কারখানাজাত প্রসেস খাবার, কারখানাজাত চিনি কিংবা অতিতাপে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে বের করা তেলের ওপরে নির্ভরশীল হয়েছে, তাতে করে বিপর্যয় আসতে বাধ্য। কয়েকশ বছর আগেও আমাদের খাদ্য তালিকায় এসব খাবার ছিল না। হঠাৎ করে জুটে যাওয়ায় শরীর হয়তো মেনে নেয়, কিন্তু মনে তার রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের নায়িকা লাবন্যের মতো দ্বিধা, ফলে কিছুদিন যেতে না যেতেই বিলাত থেকে সাহেব হয়ে ফিরে আসা বাঙালি অমিতের সাথে গড়ে ওঠা তার নতুন প্রেম ভেঙে পড়ে। লাবন্যকে তখন ফিরতে হয় তার পুরোনো অতিচেনা জগতে, সেখানেই যে শান্তি! খাবারের বেলাতেও তাই। নতুন নতুন খাবার কার না ভালো লাগে? কিন্তু তা যে শরীরে সয় না। কাজেই, কী খেতে পারবো, আর কী খেতে পারবো না, আর খেলে কোন খাবার কখন খাবো, সেটা ঠিক করে নিতে হবে। এ নিয়ে বিস্তারিত বলা যাবে, তবে তার আগে শরীরচর্চার ওপরে কিছু আলো ফেলে আসি।
অধ্যাপক ডেভিড সিনক্লিয়ারের মতে শরীরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশি হচ্ছে নিতম্বের কাছে সংযুক্ত হওয়া তিনটি লম্বা পেশি, সেজন্য তিনি নিয়মিতভাবে এই নিতম্বের যত্ন নিতে বলেন, নিজেও নেন। তার জন্য তার বরাদ্দকৃত সময় হচ্ছে দিনে মাত্র ২০ মিনিট। এছাড়া, যোগ ব্যায়াম বা স্ট্রেচিং করে শরীরের সকল পেশিকে সতেজ ও শিথিল রাখাটাও কম জরুরি না। ঘুমটা আরও জরুরি। কারণ, ঘুমের মধ্যে শরীর তার মেরামতের কাজগুলো করে। খাবার হজমের কাজ শেষ হয়ে গেলে আমাদের কলিজা সেই ঘুমের মধ্যে নানাকাজে ব্যস্ত থাকে বলেই ভালো ঘুম হলে সকালে ঘুম ভেঙে আমাদের ফুরফুরা লাগে। মনে হয় নবপ্রভাতে নতুনজীবন।ডা. জাহাঙ্গীর কবির তাই হাঁটতে বলেন এই ভোরে। ভোরের নতুন সূর্য নতুন শরীরকে অবগাহন করে, তবে আমাদের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি-৩ পেতে হলে হাঁটতে হবে দুপুরের আগে, যখন অতিবেগুনি রশ্মি উইভি-এ’র প্রভাবে ত্বকের তলায় জমে থাকা কোলেস্টরেল থেকে ওই কাঙ্খিত ভিটামিন জন্ম নিতে সক্ষম হয়। সুস্থ-সুন্দর জীবনের জন্য অনেক প্রয়োজনীয় এক ভিটামিন, দিনের বেলা জন্ম নিয়ে কাজ করে সারাদিন, তারপর রাত নেমে এলে যখন আমাদের প্রয়োজন হয় ঘুমের, সেই মহাসময়ে সে তার দায় মেটায়, আমাদেরকে সুন্দর ঘুম উপহার দিয়ে সে হারিয়ে যায়। কিন্তু রোদের বিপদটাও কম না। দুপুরের আগে যে রোদ সোনা ছড়ায়, দুপুর গড়িয়ে গেলে সেখান থেকে আগুন ঝরে, ওই আগুন বৃক্ষ ও তরুলতার জন্য আশীর্বাদ হলেও প্রাণীকুলের জন্য অভিশাপ, কারণ তীব্র বেগুনি রশ্মি ইউভি-বি’র প্রভাবে ঝলসে যায় আমাদের ত্বক, আর তাতে করে কোষের ভিতরে ডিএনএ’র বন্ধন ভেঙে যেতে থাকে। সে কারণে, ভিটামিন ডি-৩’র একটা ঘাটতি থেকেই যায়।
ডি-৩ নিয়ে অধ্যাপক সিনক্লিয়ারের থেকেও বেশি সোচ্চার ডাক্তার স্টিভ গানড্রি, এমডি। মার্কিন হার্ট ফাউন্ডেশনের এক সময়ের সভাপতি, কালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের এক বিখ্যাত হাসপাতালের এক সময়ের নামকরা হার্টসার্জন, হৃদপিন্ডের অপারেশন করতে করতে এক সময় তার মনে হয়েছে যে, কোথাও একটা গন্ডগোল হচ্ছে, তা না হলে মানুষের হৃদয়ে এত সমস্যা কেন, কেনই বা তাদের রক্তনালি ক্রমশ ফারাক্কা বাঁধে ভরে যাচ্ছে, ফলে সীমার বাইরে গিয়ে নতুনভাবে মানুষের শরীরকে জানার আগ্রহ জন্মে তার মধ্যে। তারপর ২৫ বছরধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সার্জনের কাজ ছেড়ে হয়ে পড়েছেন খাদ্যনালি বিশেষজ্ঞ, হয়ে পড়েছেন খাদ্য বিশেষজ্ঞ। ‘প্লান্ট প্যারাডক্স’ কিংবা ‘লংজিভিটি প্যারাডক্স’ ইত্যাদি নানা শিরোনামের বইয়ের আড়ালে তিনি তার জ্ঞান বিতরণ করে চলেছেন। ইউটিউব চ্যানেল তো আছেই।

ক্যালগেরি, কানাডা

- Advertisement -

Read More

Recent