
তাতাইর বড় একা একা লাগছে, সব কিছু কেমন যেন ছাড়া ছাড়া। তাতাই যে পরিকল্পনা নিয়ে এসেছে তার কিছুই বলা হচ্ছে না। কাজ শুরু করতে না পারলে ফিরে যেতে হবে। মামা খুব ব্যস্ত, মামী চুপচাপ, লিমা আপা নিজের মতন ঘুমাচ্ছে আর বাইরে চলে যাচ্ছে। এর মাঝে জয়কে সাহায্য করতে বলেছে। কিন্তু কার সাথে এ বিষয়ে কথা বলবে বুঝতে পারছে না। আগের দিনের হাসি খুশি আনন্দের মানুষগুলো যেন হারিয়ে গেছে। সাজিদ ভাই এ বাড়িতে আসে না। বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে অনেক বছর। ভাড়া বাড়ি ছেড়ে নিজে বাড়ি কিনেছে উত্তরায়। অথচ লন্ডনে ওর সাথে এত ঘুরে বেড়িয়েও কিছুই বলেনি, খুব অদ্ভুত মানুষ। বিদেশ থেকে এসেছে কিনা এখনো কেমনে জানব। সেও নিশ্চয়ই বদলে গেছে আর সবার মতন। যাক কাল আমি নিজের মতন কাজ শুরু করব। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে নিশ্চয়ই মুক্তিযোদ্ধা বিরাঙ্গনাদের তালিকা আছে। অথবা গ্রন্থাগারে কোনো বই। জয়কে নিয়ে কাল এসব জায়গায় ঘুরব। একটা না একটা সূত্র পেয়ে যাব হয়তো। অনেক রাত অবধি তাতাই আপন মনে এসব পরিকল্পনা করে বারান্দায় বসে। রাত প্রায় একটা, ঘুমাতে আসে তাতাই। তখনি গাড়ির শব্দ পায়। লিমা আপা এলো। নিচে গিয়ে কাজের মেয়েটাকে যেতে বলে দরজা খুলে দাঁড়ায় তাতাই। এলোমেলো পায়ে হেঁটে আসছে লিমা আপা। দরজায় তাতাইকে দেখে থমকে যায় একটু আপন মনের চলা।
– ঘুমাসনি এখনো তাতাই?
– না, তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
– আমি যে অনেক টায়ার্ড এখন।
– খাবে না ?
– না রে।
– খেয়ে এসেছো, পার্টি ছিল?
– হুম পড়ে যাচ্ছে লিমা।
– ঠিক আছে চলো তোমার রুমে এগিয়ে দেই।
তাতাই লিমাকে ধরে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে সাহায্য করে। ওর গায়ে কড়া পারফিউমের গন্ধ ছাপিয়ে গাঁজার ঘ্রাণ ধাক্কা দেয় তাতাইর নাকে।
এমন হয়ে গেল কেন লিমাপা, এখন কি ও কিছু বলবে ? ঘোরের ভিতর যদি সে কথা বলা শুরু করে দেয় তবে হয়তো ভিতরটা উজাড় করে বলে দিতেও পারে, চেষ্টা করে দেখা যাক।
– লিমা আপা এখন ঘুমাও কিন্তু কাল আমাকে গান শুনাবে তুমি। বিছানায় লিমাকে শুইয়ে দিয়ে বলে তাতাই। বিছানায় এলানো শরীর টেনে ঝট করে উঠে বসে লিমা।
– গান, হা হা হা উচ্ছাসিত হাসিতে ভাঙ্গে লিমা তারপর থেমে থেমে বলে,
গান আমি আর গাই না রে তাতাই, গান করেন সাজিদ।
– কেন, তুমি কি ভালো গান করো, ছেড়ে দিবে কেন ? তুমি তাহলে কি করো এখন ?
– কিছু না, শুধু ফূর্তি করি, আনন্দ করি।
– এটা ঠিক না লিমা আপা, গান তোমাকে করতে হবে। কাল তুমি গান করবে আমার জন্য বুঝেছো।
– না, আমি গান করব না, রাগ হয় লিমা। এরপর হঠাৎ কেঁদে ফেলে─ও আমাকে ভালোবাসে না তাতাই। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। তাই আমি আর গান করব না। আমি শেষ করে দিব নিজেকে।
– কেমনে শেষ করবে?
– ড্রাগ টেনে টেনে আমি ভুলে যেতে চাই ওর কথা। তাই আমি আর গান করব না।
– কার কথা ভুলে যেতে চাও তুমি লিমা আপা। ।
– সাজিদ।
– কি বলো, ও তো তোমার ভাই।
– তুই কিচ্ছু জানিস না।
– ও আমার ভাই না, আমার বাবা ওকে কুঁড়িয়ে নিয়ে এসেছিল।
– কি বলো লিমা আপা ? তাতাই লিমার কথা বুঝতে পারে না।
– যা বলি ঠিক।
– তাহলেও ও তোমার ভাই লিমা আপা।
– না, আমি ওকে ভালোবাসি কিন্তু ও আমাকে ভালোবাসে না। আমি ওর বোন।
কাঁদতে থাকে লিমা । তাতাই ওর গায়ে মাথায় হাত বুলায় আদরে। ঘুমিয়ে যায় লিমা একসময়।
অনেক কথা স্পষ্ট নয় তাতাইর কাছে। তবে সাজিদকে ভালোবেসে নিজেকে শেষ করছে লিমা এই বিষয়টা পরিষ্কার। সাজিদ ভাই মামাদের নিজের ছেলে না এটা তাতাই কখনো শুনেনি আগে। ভালো ঘুম হলো না রাতে। এলোমেলো উল্টাপাল্টা চিন্তায় কাটল রাত। লিমা আপার চিকিৎসা করাতে হবে। মামা-মামীর সাথে কথা বলতে হবে লিমা আপাকে নিয়ে। তাতাই ঠিক করে।
ঘুম থেকে উঠে দেখে বেশ বেলা হয়ে গেছে। একবারে শাওয়ার নিয়ে নাশতার টেবিলে আসে তাতাই। অবাক হয় তাতাই, বেলা দশটায় মামা আজ বাসায়। পত্রিকা উল্টাচ্ছেন সোফায় বসে, মামীও পাশে বসে আছেন। তাতাইকে দেখে হেসে বললেন,
– কি রে মা ঘুম হলো ? নাস্তা এক সাথে খাব বলে অপেক্ষা করতে করতে খেয়ে ফেললাম।
– হুম, আজ একটু বেশি ঘুমালাম।
– চলো তোমার সাথে আরেকবার চা খাওয়া হোক আজ। মামা উঠে ডাইনিং টেবিলে যান, সাথে মামীও উঠে আসেন। সবাই মিলে টেবিলে বসে ।
– আজ তোমার কাজ নাই মামা ?
– না, তোমার জন্য সময় করলাম আজ।
– আচ্ছা আমি সত্যি খুব বোর হচ্ছিলাম এবার।
– জানি সব ঠিক আগের মতন পাচ্ছিস না।
– হুম, তা ঠিক, নাশতা শেষ করে চায়ের কাপ টেনে নিয়ে তাতাই বলে,
– মামা আমার কিছু সিরিয়াস কথা আছে।
মামী বলেন,
– আমি কি থাকব না যাবো?
– তুমি থাকবে মামী।
– আচ্ছা সিরিয়াস কথার আগে আমি তোমাকে বলে দেই আগামী পরশু আমরা সবাই গ্রামের বাড়ি যাচ্ছি। বেশ কিছুদিন কাজকাম বাদ, ঘুরব মজা করে।
– গ্রামের বাড়ি সেটা কোথায়? অবাক তাতাই।
যেখানে আমরা বড় হয়েছি তোমার মা আর আমি, তবে ঢাকার জীবনে এত ব্যস্ততায় আর ফেরা হয়নি। তোমাদের নিয়ে যাওয়া হয়নি কখনো। এবার যাবো তোমাদের নিয়ে।
– না মামা আমার মনে পড়ছে গিয়েছিলাম, নানু বেঁচে থাকতে।
– তাই গিয়েছিলি তুই ?
– খুব ছোট ছিলাম একবার কি দুবার। মামা, আমার এক বন্ধুকেও নিয়ে যাবো, অসুবিধা নাই তো ?
– তোমার যাকে খুশি নিতে পারো।
– আমার বন্ধুটিকে আজ আমাদের সাথে খেতে নিয়ে আসব। ওর গল্প শুনলে তুমি অবাক হয়ে যাবে মামা। মামী বললেন,
– বন্ধুটি কি আমাদের ভাগনী জামাই হবে শেষে ?
– না মামী, ওর সাথে আমার প্লেনে পরিচয় এবার আসার সময়। ও ওর মা’কে খুঁজতে এসেছে বাংলাদেশে।
– ইন্টারেস্টিং।
– ইন্টারেস্টিং শুধু না, অনেক কষ্টেরও।
– ঠিক আছে আজই ডাকো ওকে পরিচয় হয়ে যাক।
– আজ ওকে নিয়ে আমি ঘুরতে বের হবো, কয়েকটা জায়গায় যাবো। সন্ধ্যায় নিয়ে আসব। তবে আমি যে সিরিয়াস বিষয়ে কথা বলতে চাইছিলাম সেটা বলি।
– বলো। তাতাই সরাসরি বলল,
– লিমাপাকে চিকিৎসা করাতে হবে। মামীর মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। মামা সোজা ওর দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল।
– ওর কি হয়েছে ?
– তোমরা একসাথে থেকে কেন কিছু জান না ওর বিষয়ে ? আমার খুব অবাক লাগছে।
– জানিরে মা, কিন্তু ও নিজেকে আমাদের থেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছে। কোনো কথাই বলা যায় না ওর সাথে। একটা সময় ঘরে বসে থাকত, কোথাও যেত না। এখন বাইরে থাকে বাড়িতে যতক্ষণ থাকে। নিজেকে আড়াল করে রাখে আমাদের থেকে। মামী বলে,
– তোমরা যাবে না, কথা বলবে না তাই বলে ?
– ওর কথা শুনলে রাগ হয়রে মা। মামী বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
– তাই বলে ওকে তোমরা ছেড়ে দিবে এভাবে?
– মারধর করা যায় না এতো বড় মেয়েকে।
– মারধর না, ওকে চিকিৎসা করাতে হবে। ওর খুব খারাপ অবস্থা, ড্রাগে ডুবে আছে।
– নীরবতা নেমে আসে তিনজনের মাঝে।
– কতটা দুঃখ বুকে চেপে চলি, মেয়ে কে বিয়ে দিয়ে নাতী নাতনীর সাথে খেলাকরে কাটব এখন অথচ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মামী বলেন।
– ওর সাথে কথা বলাই তো মুশকিল, মামা বলেন।
– আমি কথা বলব, তোমরা ভালো ক্লিনিক খুঁজে বের করো। ডাক্তারের সাথে কথা বলো। আমি নিয়ে যাবো লিমা আপাকে। জানি খুব খারাপ লাগছে তোমাদের। আমারও খুব খারাপ লাগছে। লিমা আপা আমার অনেক প্রিয়। তার এই পরিবর্তন আমি মেনে নিতে পারছি না।
– একটামাত্র মেয়ে এত আদরের অথচ ও কোথায় ভেসে যাচ্ছে, আমরা কিছুই করতে পারছি না। এটা যে কতটা কষ্টের যন্ত্রণার, বলা যায় না। সওয়াও যায় না।
– ঠিক আমাদের এমন চোখ বন্ধ করে না দেখার ভান করে থাকলে চলবে না লিমার মা। তাতাই ঠিক বলেছে, আমাদের ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে না হলে ওকে লন্ডনে নিয়ে যেতে হবে।
– অনেক দেরি হয়ে গেছে মামীর মুখ কান্না কান্না হয়ে গেছে।
– কিছুই হয়নি মামী, সব ঠিক হয়ে যাবে। মামীকে জড়িয়ে ধরে তাতাই বলে,
টেলিফোন বেজে উঠলে আবেদিন আহমেদ টেলিফোন ধরতে উঠে যান। তাতাইও ভিতরের দিকে যেতে যেতে বলে,
– আমি এখন বাইরে যাচ্ছি মামী, ভালো আইটেম সব করো। তোমার মজার রান্নার খবর আমার বন্ধুকে আগেই দিয়েছি।
– ঠিক আছে চিন্তা করো না, তাতাইর চঞ্চল চলাফেরার দিকে দেখতে দেখতে আবার বুকের ভিতর কাঁপিয়ে দীর্ঘশ্বাস আসে মিসেস আবেদিনের। ভাবেন মেয়ে হবে এমন প্রজাপতির মতন সুন্দর আর ব্যস্ত আবার সবদিকে খেয়াল। দু’দিনেই সব বুঝে গেছে বাড়ির হাল-হকিকত, নিজের মতন তা ভালো করারও চিন্তা করছে। বড় ভালোলাগায় ভরে উঠে ননদের উপর মন। খুব ভালো শিক্ষা দিয়েছে মেয়েকে এমন একটা সোনার টুকরা মেয়ে হয়েছে। সাথে ভাবেন আমি হয়তো সঠিক শিক্ষা দিতে পারিনি, তাই আমার মেয়েটা এমন হয়ে গেছে।
তৈরি হয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে তাতাই বলে,
– সন্ধ্যায় থেকো মামা আমি এখন যাই।
– গাড়ি নিয়ে যা আমি আজ আর বেরুব না।
– আচ্ছা।
টরন্টো, কানাডা
