অন্টারিওতে এলসিবিও কর্মীদের ঐতিহাসিক ধর্মঘট: রাজস্ব ক্ষতি, জনজীবনে তীব্র সংকট

অন্টারিওতে সরকারি মদ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এলসিবিও লিকার কন্ট্রোল বোর্ড অব অন্টারিও কর্মীরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণমাত্রার ধর্মঘটে নেমেছেন

অন্টারিওতে সরকারি মদ নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এলসিবিও (লিকার কন্ট্রোল বোর্ড অব অন্টারিও) কর্মীরা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পূর্ণমাত্রার ধর্মঘটে নেমেছেন। শুক্রবার ভোর থেকে শুরু হওয়া এ ধর্মঘটের ফলে প্রদেশজুড়ে প্রায় ৬৮০টির বেশি খুচরা মদের দোকান একযোগে বন্ধ হয়ে যায়। এতে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী, রেস্তোরাঁ মালিক ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ব্যাপক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।

টরন্টো বাংলা টাউনকে একজন শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য জানান, কর্মীদের মজুরি কাঠামো বহু বছর ধরে স্থবির হয়ে আছে। গত এক দশকে অন্টারিওতে বিশেষ করে টরন্টোতে ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, অথচ এলসিবিও কর্মীদের বেতন বৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১২ শতাংশের কাছাকাছি। ফলে পরিবার চালাতে অনেক কর্মীই হিমশিম খাচ্ছেন।

- Advertisement -

শ্রমিক ইউনিয়নের এক মুখপাত্র টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, “এলসিবিও প্রতিবছরই মুনাফা বাড়াচ্ছে। কিন্তু সেই মুনাফার সুফল আমরা কর্মীরা পাচ্ছি না। ন্যায্য মজুরি ও কর্মসংস্থান সুরক্ষা ছাড়া এই অবস্থার পরিবর্তন সম্ভব নয়।”

এলসিবিও শুধুমাত্র একটি মদের খুচরা দোকান নেটওয়ার্ক নয়; বরং অন্টারিও সরকারের অন্যতম বৃহৎ রাজস্ব উৎস। ২০২৩–২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সরকারের কোষাগারে অবদান রেখেছে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার। খুচরা বিক্রি, পাইকারি লেনদেন ও রপ্তানি মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যবসা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রতিদিন গড়ে এই খাতে ৫০ থেকে ৬০ মিলিয়ন ডলারের লেনদেন হয়। সুতরাং, এক সপ্তাহের ধর্মঘটেই সরকারি রাজস্ব ক্ষতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার।

গ্রীষ্মকালীন মৌসুমে যখন পর্যটন, সামাজিক অনুষ্ঠান ও বিয়ের আয়োজন বেড়ে যায়, তখন হঠাৎ এই ধর্মঘট মানুষের জীবনে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করেছে। অনেক রেস্তোরাঁ মালিক জানিয়েছেন, বিদেশি পর্যটকদের সেবায় সমস্যায় পড়ছেন তারা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক অন্টারিওবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন “একদিকে তীব্র গরম, অন্যদিকে হঠাৎ করে দোকান বন্ধ এ যেন আমাদের জন্য দ্বিগুণ দুর্ভোগ।”

অন্টারিও সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আলোচনা এখনও খোলা রয়েছে। প্রদেশের অর্থমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “আমরা চাই সমঝোতার মাধ্যমে এই সংকট নিরসন হোক। জনগণের ভোগান্তি কমানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।”

অর্থনীতিবিদদের মতে, ধর্মঘট দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু খুচরা বেচাকেনাই নয়, পর্যটন খাত, হোটেল-রেস্তোরাঁ শিল্প এবং সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। যেহেতু এলসিবিও সরকারের জন্য অন্যতম প্রধান রাজস্ব উৎস, তাই এর কার্যক্রম অচল হলে বাজেট ঘাটতির শঙ্কাও তৈরি হতে পারে।

এলসিবিও কর্মীদের এই অভূতপূর্ব আন্দোলন আসলে বৃহত্তর এক বাস্তবতার প্রতিফলন। একদিকে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে, অন্যদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের মজুরি বৃদ্ধি স্থবির। ফলে শ্রমিকরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ে রাস্তায় নেমেছেন।

এই আন্দোলন শুধু শ্রম অধিকার নয়, বরং সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও সামাজিক ন্যায্যতার প্রশ্নকেও সামনে এনেছে। কারণ, যখন একটি প্রতিষ্ঠান বিলিয়ন ডলারের মুনাফা করছে, তখন সেই মুনাফার অংশীদার কর্মীরা ন্যূনতম জীবিকা নির্বাহ করতে পারছেন না এটি সমাজে বৈষম্যের স্পষ্ট প্রতিফলন।

এখন প্রশ্ন হলো সরকার ও শ্রমিক ইউনিয়নের মধ্যে সমঝোতা কবে হবে? যদি দ্রুত সমাধান না আসে, তবে এই ধর্মঘট অন্টারিওর অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে বড় ধরনের ধাক্কা দেবে।

একটি বিষয় তবে স্পষ্ট এলসিবিওর এই ধর্মঘট শ্রম অধিকার ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে কানাডায় নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।

- Advertisement -

Read More

Recent