
অন্টারিওর শান্ত শহর স্ট্রাটফোর্ড আবারও বিশ্ব সংস্কৃতির আলোচনায়। শুরু হয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত বার্ষিক স্ট্রাটফোর্ড উৎসব ২০২৪, আর উদ্বোধনী নাটক হিসেবে মঞ্চে উঠেছে আলোচিত কমেডি “সামথিং রটেন!”। শেক্সপিয়রের যুগের নাট্যধারা ও নাট্যকারদের ব্যঙ্গ করে নির্মিত এ হাস্যরসাত্মক নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার পর থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
“সামথিং রটেন!” মূলত এক ব্যঙ্গাত্মক সংগীতনাট্য, যেখানে শেক্সপিয়রের ক্লাসিক শৈলীকে সমকালীন দৃষ্টিকোণ থেকে রসাত্মকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। গম্ভীর সংলাপের মাঝেই হঠাৎ করেই উঠে আসছে কৌতুক, গান, নাচ এবং অপ্রত্যাশিত ঘটনা যা দর্শকদের মুহূর্তে টেনে নিচ্ছে ভিন্ন আবহে। সমালোচকরা একে বলছেন, “শেক্সপিয়রের ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়েও এক অভিনব পুনর্নির্মাণ।” বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এবং পরিবারিক দর্শকদের কাছে নাটকটি ইতিমধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।
কানাডার অন্যতম বৃহত্তম সাংস্কৃতিক আয়োজন হিসেবে পরিচিত স্ট্রাটফোর্ড উৎসব প্রতিবছর মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ছয় মাসব্যাপী চলে। এ সময়ে শুধু নাটকই নয়, বরং সেমিনার, কর্মশালা ও নানা সাংস্কৃতিক কার্যক্রমও আয়োজন করা হয়।
প্রতিবছর গড়ে পাঁচ লাখেরও বেশি দর্শক অংশ নেন এ উৎসবে, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসেন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়া থেকে। ২০২৪ সালেও ব্যতিক্রম হয়নি। বরং এ বছরের প্রথম সপ্তাহেই টিকিট বিক্রি আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হয়েছে।
উৎসব শুধু সাংস্কৃতিক পরিসরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। অর্থনীতিবিদদের হিসেব অনুযায়ী, প্রতিবছর স্ট্রাটফোর্ড উৎসব স্থানীয় অর্থনীতিতে যোগ করে ১৩৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি।
হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, দোকানপাট থেকে শুরু করে স্থানীয় শিল্পীদের জন্যও এটি জীবিকার বড় ভরসা। এবারের উৎসব শুরু হতেই শহরের প্রায় সব হোটেল ও কটেজ বুক হয়ে গেছে। রেস্তোরাঁয় খাবার বিক্রিও বেড়েছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, “স্ট্রাটফোর্ড উৎসব মানেই শহরের অর্থনীতির চাকা আরও জোরে ঘোরা।”
সংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক দীপা আনন্দ টরন্টো বাংলা টাউনকে বলেন, এই উৎসব কেবল নাটকের মঞ্চায়ন নয়, বরং এটি কানাডার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অন্যতম বাহক। শেক্সপিয়রের ধারা আধুনিক প্রেক্ষাপটে উপস্থাপন করে উৎসবটি দেখাচ্ছে, অন্টারিও কেবল কানাডার ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক মানচিত্রেও গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
একই সঙ্গে এটি স্থানীয় তরুণ শিল্পীদের জন্যও এক বিশাল শিক্ষার ক্ষেত্র তৈরি করছে। তারা মঞ্চে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন বিশ্বমানের শিল্পীদের সঙ্গে, যা ভবিষ্যতের নাট্যচর্চায় নতুন প্রজন্মকে উৎসাহিত করছে।
“সামথিং রটেন!” দিয়ে এবারের স্ট্রাটফোর্ড উৎসব প্রমাণ করেছে যে শিল্প ও সংস্কৃতি কেবল বিনোদন নয়; বরং অর্থনীতি, সমাজজীবন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। অন্টারিওর এই শহর প্রতি বছর যে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক মঞ্চে আলো ছড়ায়, তা শুধু স্থানীয় পর্যটন ও ব্যবসাকে সমৃদ্ধ করছে না, বরং কানাডার সাংস্কৃতিক মর্যাদাকেও বিশ্বদরবারে আরও উজ্জ্বল করছে।
এ বছরের উৎসব ইতিমধ্যেই প্রমাণ করেছে স্ট্রাটফোর্ড কেবল একটি শহরের নাম নয়, বরং বিশ্ব সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল মঞ্চ।
