
নিজেরে নিজে জিজ্ঞেস করলো রহিমা। তারপর দ্রুত বুকে কান পাতলো পারুলের । বুক ধুকধুক ও করে না! নিস্তেজ হয়ে আছে পারুল! সাড়া নেই শব্দ নেই। কেমন একটা যেন হয়ে গেল রহিমা, কিছুটা উন্মাদের মত। ততক্ষণে আশরাফ মারুফ দু’ভাইয়ের ঘুম ভেঙে গেছে। ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তাদের ঘুমন্ত ফুলের সদ্য ফোটাঁ কলির মত নিষ্পাপ বোনটির দিকে। রহিমা মেয়েকে ডাকতে থাকলো বারবার। কান্নারত স্বরে ডেকে উঠল ” মারে ও মা কথা ক। কথা ক না! চোখ মেইল্যা দেখ। ও আল্লাহ! আল্লাহ গো! আমার মাইয়া কথা কয় না ক্যান গো আল্লাহ? ”
রহিমার কান্নার আওয়াজ শুনে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো নিশু ও দুলাল মিয়া সহ আশপাশের সকলে। আশরাফ কাদঁতে কাদঁতে গিয়ে দরজা খুললেই হুরমুড়িয়ে ভেতরে ঢুকে সকলে। দুলাল মিয়া পারুলের ছোট্ট হাতখানা নিজের হাতের মধ্যে এনে রগ চেপে ধরলেন। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাত আগের জায়গায় রেখে দিয়ে নিশুর দিকে তাকাতেই দেখলো নিশু ভয়, কান্না আর উৎসুক হয়ে চেয়ে আছে তারই দিকে। দুলাল মিয়া লম্বা একটা শ্বাস নিলেন তারপর রহিমা আর নিশুর উদ্দেশ্যে বলে উঠল ” পারুল আর বাইচাঁ নাই। ”
” ও আল্লাহ গো। ” চিৎকার দিয়ে মূর্ছা গেলেন রহিমা। নিশু হাউমাউ করে কেদেঁ পারুলরে কোলে তুলে নিল। রাতদুপুরে শোকের ছায়া নেমে এলো পুরো পরিবারে। পরিবেশটা হয়ে গেল থমথমে। কান্নার রেশ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলো। রহিমা একটু পর পর জ্ঞান হারাচ্ছে। মারুফ কান্নাকাটির মধ্যে মায়ের কাছে যেয়ে প্রশ্ন করলো ” মা! পারু আমার লগে সকালে খেলবো না? ”
রহিমা ছেলের কথা শুনে কাদঁতে কাদঁতে আবারো জ্ঞান হারালো।
চারিদিকে শুনশান-নিস্তব্ধ। কোথাও টু শব্দটিও নেই। কোথায় যেন একজোড়া হুতুম পেচাঁ অনবরত ডেকে চলেছে। একটু পর পর ঘরের ভেতর থেকে বেসুরা কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে। পারুলকে দাফন করা হয় দুলাল মিয়াদের পারিবারিক কবরে। শেষবার পারুলকে জড়িয়ে ধরার পর থেকে কেমন একটা যেন হয়ে গেলো রহিমা। কাদঁছে না,কারো সাথে কথা বলছে না,কারো দিকে তাকাচ্ছেও না। কেমন একটা জড় পদার্থের মত ঘরের এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। কেমন যেন নিষ্পাণ! যেন ধরে প্রাণ নেই। নিশু আর ফারজানা রহিমার দিকে তাকিয়ে আছে! ফারজানা কেদেঁই চলেছে বিরতিহীনভাবে। নিশু কাপাঁ কাপাঁ স্বরে ডাক দিলো ” রহিমা বু। ”
সাড়া দিলো না দেখে আবারো ডাক দিতেই নিশুর দিকে তাকালো। চোখ দু’টো অসম্ভব ফুলে আছে, বিধ্বস্ত চোখ মুখের দিকে তাকিয়ে নিশু হু হু করে কেদেঁ উঠে। বাচ্চা মেয়েটার হঠাৎ মৃত্যু যেন কেউই মেনে নিতে পারছে না। এই না সেদিন পারুল নিশুর কোল শুয়ে নিশুর চুল নিয়ে খেলছিল? পানি নিয়ে দুষ্টুমি করায় নিশু না খুব করে বকুনি দিবে বলে ভয় দেখিয়েছিল? হুট করে কি হলো মেয়েটার? নিশুকে অমন শব্দ করে কাদঁতে দেখে রহিমা বলে উঠল ” কাদঁতাছো ক্যান এত? এত কান্দনের কি আছে? ঘরে যাও। ”
রহিমার কথা শুনে যেন নিশুর কান্নার শব্দ আরো বেড়ে গেল। রহিমাকে ঝাপটে ধরে কাদঁতে কাদঁতে বললো ” রহিমা বু কান্দো তুমি। পাথর হইয়া থাইকো না! কাইন্দা শোক বাইর কইরা ফেলো।”
রহিমা কি বুঝল কে জানে নিশুর দিকে পলকহীন ভাবে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আবারো ঘরের দরজার দিকে তাকিয়ে থাকল।
আজিজ শেখ মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনে একরকম প্রায় ছুটে এসেছেন। কিছুক্ষণ কান্নাকাটির পরে রহিমাকে গালিগালাজ করা শুরু করেন। তার মেয়েকে রহিমা মে*রে ফেলেছে এই বলে দোষারোপ করতে শুরু করেন। দুলাল মিয়া খারাপ হলেও অতটাও খারাপ নন। আশরাফ,মারুফ, পারুল তিন ভাইবোনকেই অনেক আদর করতো সে। আজিজ শেখের এমন বিশ্রি আচরণ শুনে রাগ চড়চড় করে মাথায় উঠে বসলো। গলা খাকরি দিয়ে আজিজ শেখের উদ্দেশ্যে বলে উঠল ” মদ খাইয়া নাটক চু*ইতে আইছো? এতদিন বাপগিরি কই আছিলো তোমার? কোনো মা পারে তার সন্তানরে মা*ইরা ফেলতে? ”
আজিজ শেখ তার মতো গালিগালাজ করে বাড়ির দিকে চলে গেলেন। দুলাল মিয়া আজিজ শেখের যাওয়ার পানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল ” বাপ বুঝি এমন ও হয়! “
