বর্ণ লতা ।। পর্ব: ছয়

বর্ণ লতা পর্ব ছয়

এতগুলো বছরেও যে ছেলেটা কে জোর করেও কেউ ঘরের বাইরে আনতে পারেনি। সেই ছেলেটা আজকে নিজের ইচ্ছেতে নিচে এসেছে! আজ সকালেও যাকে অগোছালো লেগেছে তাকে এখন চেনাই যাচ্ছেনা। খাবার টেবিলে সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বর্ণর দিকে। নিজাম চৌধুরী ও আপাতত নিজের চিন্তা সাইডে রেখে ছেলেকে দেখতে ব্যস্ত। নিজাম চৌধুরী খারাপ হলেও ছেলেকে প্রচন্ড ভালোবাসে। জমিদার গিন্নী ও কিছু টা অবাক হয়েছে তবে তার চোখে মুখে কিছু টা চিন্তার ছাপ বিদ্যমান। মনে হচ্ছে তিনি এমন কিছু হবে আশা করেন নি। তাই তো ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে।

ছোট রোহান ও ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। সে জন্মের পর থেকে কখনোই ভাইয়ের আদর পায়নি। বর্ণ কখনো তার সাথেও কথা বলে নি। সবাই বলেছে এইটা তার বড় ভাইয়া কিন্তু কখনো কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। রোহানের ইচ্ছে হতো তার ভাইয়ের কাছে যেতে। কিন্তু কেউ যেতে দেয়নি। যদি বর্ণ রেগে গিয়ে রোহান কে আঘাত করে তাই তাকে দূরেই রেখেছে সব সময়।

- Advertisement -

বর্ণ খেয়াল করে দেখে রোহানের চোখে পানি। যে ছেলেটা কে সে কখনোই আদর করেনি। যার সাথে কথা বলেনি। সেই ছেলেটা তাকে এভাবে দেখে খুশিতে কাঁদছে ভেবেই বর্ণর চোখেও পানি চলে আসে। বর্ণ দুহাত বাড়িয়ে রোহান কে কাছে ডাকে। রোহান একবার সবার দিকে তাকায়। রাশেদ চৌধুরী চোখের ইশারায় বর্ণর কাছে যেতে বলে। রোহান এক দৌড়ে গিয়ে বর্ণর কোমর জরিয়ে ধরে কেঁদে দেয়। বর্ণ রোহান কে অনেক আদর করে। দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে তরুও কাঁদছে। তার ও ভালো লাগছে দুইভাই এর ভালোবাসা দেখতে। রাশেদ চৌধুরী ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে বর্ণর কাঁধে হাত রাখে। বর্ণ পেছনে ফিরে রাশেদ চৌধুরীকে বড় বাবা বলে জরিয়ে ধরে। কতগুলো বছর বর্ণ তার সাথে কথা বলে না। অবশ্য ভুল টা তো তার‌। তার ভুলের কারণেই ছেলেটা এত বছর গুমরে গুমরে মরেছে। ইশ্ একবার যদি সুযোগ পেতো তাহলে সব শুধরে নিতো। কিন্তু হায় আফসোস সেই সুযোগ হয়তো আর আসবে না। রাশেদ চৌধুরী বর্ণর হাত ধরে বলে…

“তুই আমাকে ক্ষমা করেছিস তো বাবা?”
“এভাবে বলো না বড় বাবা। আমরা আবার আগের মতো হাসি খুশি থাকবো দেখে নিও। সে আবার আমাদের আগের মতো হাসি খুশি রাখবে। সব কিছু ঠিক করে দিবে।”

বর্ণর কথা শুনে তরু চমকে উঠে। এসব বর্ণ কেনো বলছে। সে কি সব বলে দিবে নাকি। ভেবেই তরু ঘামতে থাকে। তার যে এখনো সবটা গোছানো বাকি। এখনি সে ধরা দিতে চায় না।

বর্ণর কথা শুনে সবাই বর্ণর দিকে জানার আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। কার কথা বলছে বর্ণ? ভাবনার মাঝেই বর্ণ আবার বলে…

“সে একবার যখন কথা দিয়েছে আমাকে ছেড়ে যাবে না। তখন সে কিছুতেই যাবে না। সবাই কে ভালো রাখবে। আর অন্যায়কারীদের কঠিন শাস্তি দিবে।”

বর্ণর কথা শুনে এইবার নিজাম চৌধুরী আর জমিদার গিন্নী ও ভয় পায়। এসব কি বলছে বর্ণ? কার কথা বলছে? নিজাম চৌধুরী আর রাশেদ চৌধুরী ভাবে বর্ণ হয়তো এখনো পুরোপুরি সুস্থ না। তাই আবল তাবল বকছে। বর্ণর কথা তে তারা গুরুত্ব দিলো না। কিন্তু জমিদার গিন্নী তো জানে বর্ণ পাগল ছিলো না। তাই তো কঠিন চোখে তাকিয়ে আছে।

নিজাম চৌধুরী ডাকে বর্ণ কে। বর্ণ বাবার ডাক উপেক্ষা করতে পারে না। শত হলেও জন্মদাতা পিতা তিনি। তাই তো বর্ণ ও তার বাবার কাছে গিয়ে বাবা বলে জরিয়ে ধরে। একজন কাজের মেয়ে গিয়ে রাহেলা কে খবর দিয়েছে। রাহেলা ছেলের কথা শুনে দৌড়ে নিচে এসে বর্ণ কে জরিয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদছে। বর্ণর কপালে চুমু খাচ্ছে। যেনো অনেক মুল্যবান সম্পদ তার। হ্যাঁ মুল্যবান-ই তো বাবা মা হাজার খারাপ হলেও সন্তান রা তাদের কাছে সব। সন্তানের জন্য হাসিমুখে সব মেনে নিতে পারে। সবাই বর্ণর কাছে গেলেও জমিদার গিন্নী এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। বর্ণ ধিরে ধিরে গিয়ে জমিদার গিন্নী কে জরিয়ে ধরে। জমিদার গিন্নী ও লোক দেখানো স্নেহ করে। বর্ণ জমিদার গিন্নীর কানে কানে কিছু একটা বলে যা শুনে জমিদার গিন্নী ঘামতে থাকে। আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে বলে…

“দাদু ভাই চলো খাবে চলো। অনেক দিন সবার সাথে খাওনা আজকে সবাই মিলে খাবার খাই চলো।”

বর্ণ কথা না বাড়িয়ে টেবিলে গিয়ে বসে। তরুর দিকে ফিরেও তাকায় না। তরুর এতে কিছুটা খারাপ লাগে। তরু মনে মনে ভাবে তখন এভাবে চলে আসায় বর্ণ হয়তো কষ্ট পেয়েছে তাই এমন করছে। সবাই যখন খেতে বসেছে রাশেদ চৌধুরী দেখে তরু চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ চৌধুরী তরু কে ডাকে…

“একই তুমি ওখানে কেনো এসো খাবে আমাদের সাথে বসো এখানে।”

রাশেদ চৌধুরীর কথা শুনে তরু একবার রাহেলা চৌধুরীর দিকে তাকায়। রাহেলা চৌধুরী কেমন শক্ত চোখে তাকিয়ে আছে। তরু আস্তে করে বলে…

“আংকেল আপনারা খেয়ে নিন। আমি পরে খেয়ে নিবো।”

“কেনো এখনই খেয়ে নাও। পরে একা একা কেনো খাবে এসো।”

“না আংকেল প্লিজ আপনারা খেয়ে নিন আমি পরে খাবো।”

রাশেদ চৌধুরী একবার রাহেলা চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলে না। চুপচাপ খাওয়ায় মনযোগ দেয়। রাহেলা চৌধুরী ও ছেলের সামনে নিজেকে খারাপ প্রমাণ করতে চায় না তাই চুপ আছে। না হলে এই মেয়েকে সে কিছুতেই ছেড়ে কথা বলতো না।

সকাল গড়িয়ে এখন সন্ধ্যা এই সময় সবাই বাড়িতে থাকে। চা নাস্তা খায় আড্ডা দেয়। আজকে বর্ণ ও আছে সবার মাঝে তাই আনন্দ টা দিগুন হয়ে গেছে। তরুর ইচ্ছে করছে না এত সুন্দর মূহুর্ত টা নষ্ট করতে। কিন্ত তরুর যে কিছু করার নাই তাকে তার কাজ করতেই হবে। এরই মাঝে কলিং বেল বেজে উঠে। তরু যেনো এই সময়েরই অপেক্ষায় ছিলো। সে দ্রুত গিয়ে দরজা খুলে দেয়ার সাথে সাথেই কিছু পুলিশ ভেতরে চলে আসে। সবাই পুলিশ দেখে অবাক হয়ে যায়। বর্ণ কিছু একটা আচ করতে পেরে তরুর দিকে তাকায়। তরু ইশারায় হ্যাঁ বুঝায়‌। বর্ণর মনটা খারাপ হয়ে যায়। পুলিশ দেখে জমিদার গিন্নী ও নিজাম চৌধুরীর চমকে উঠে। তবুও নিজেকে স্বাভাবিক রেখে জমিদার গিন্নী জিগ্যেস করে…

“কি ব্যাপার পুলিশ অফিসার আপনারা?”

“ম্যাডাম আমরা আপনার ছোট ছেলেকে অ্যারেস্ট করতে এসেছি। আমাদের কাছে খবর আছে গ্রামের সকল মেয়েদের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে নিজাম চৌধুরীর হাত আছে।”

নিজাম চৌধুরী টিস্যু দিয়ে ঘাম মুছে বলে…

“এসব কি বলছেন অফিসার প্রমাণ ছাড়া কিভাবে আপনারা এমন অবান্তর কথা বলতে পারেন?”

“আমাদের কাছে প্রমাণ আছে স্যার আপনি চলুন আমাদের সাথে। আই পি এস অফিসার চারু লতা ম্যাম সকল প্রমাণ জমা দিয়েছেন। এবং তিনি নিজেই আপনার মুখ থেকে সকল সত্যি বের করবে আপনি নিশ্চিত থাকুন।” বলেই বিদ্রুপ করে হাসেন।
নিজাম চৌধুরী জমিদার গিন্নীর দিকে তাকিয়ে বলে..

“আম্মা আপনি কিছু বলছেন না কেনো?”

জমিদার গিন্নী কি বলবে ভেবে পায়না। তিনি কিছু একটা চিন্তা করে বলেন…

“নিজাম তুমি এখন উনাদের সাথে যাও আমি দেখি তোমাকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করবো।”

নিজাম চৌধুরী অবাক হয়ে যায় জমিদার গিন্নীর কথা শুনে। সে আশা করেছিলো তার আম্মা তাকে যেতে দিবে না। আটকাবে, পুলিশ অফিসারদের বুঝাবে। কিন্তু তিনি এ কি বলছেন।

বর্ণ নিজাম চৌধুরীর সামনে এসে বলে…

“পাপ কখনোই কাউকে ছাড়ে না বাবা। যার জন্য এত পাপ করলে। এতটা নিচে নামলে দেখো তিনি ও তোমাকে ভরসা দিতে পারলো না।”

রাহেলা চৌধুরী কিছুতেই নিজাম চৌধুরী কে যেতে দিবে না। তিনি কান্না কাটি শুরু করেছেন। নিজাম চৌধুরী রাহেলা কে বুঝিয়ে সুজিয়ে চলে যায় পুলিশ অফিসারদের সাথে।

কিছুক্ষণ পর তরু জমিদার গিন্নীর কাছে গিয়ে বলে…

দাদিন এবার আমাকে যেতে হবে। যে কাজের জন্য ছিলাম সেইটা তো আর দরকার নেই। বর্ণ স্যার তো এখন সুস্থ। তাই আমি আমার গ্রামে ফিরে যেতে চাই। তরুর কথা শুনে জমিদার গিন্নী এক পলক তরুর দিকে তাকিয়ে কিছু না বলেই নিজের ঘরে চলে যায়।

এদিকে তরু বর্ণর দিকে তাকিয়ে দেখে বর্ণ চোখ মুখ শক্ত করে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে রেখেছে। যেনো এখনি দুম করে তরু কে ঘুসি মেরে দিবে। চোখ দিয়ে যেনো আগুনের ফুলকি বের হচ্ছে। তরু আর কিছু না বলে এখান থেকে চলে যেতে গেলেই বর্ণর কথা শুনে তার পা থেমে যায়। বর্ণ যে এই পরিস্থিতিতে এমন কিছু বলবে সেইটা তরু আশা করেনি‌…

- Advertisement -

Read More

Recent