
দেশে ক্রীড়া লেখক ও সাংবাদিকদের সর্বোচ্চ সংগঠন বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি। ১৯৬২ সালে জন্ম এ সংগঠনটির। নানা ক্রীড়া কর্মকান্ডের অংশ হিসেবে সংগঠনটি ১৯৯৩ সালে বাংলা একাডেমির গ্রন্থমেলায় প্রকাশ করে ক্রীড়া সাহিত্য নিয়ে ক্রীড়া বিষয়ক গ্রন্থ ‘খেলার কথা, কথার খেলা’।
সে সময় যারা ক্রীড়াকে সাহিত্যে রূপ দিয়ে লেখালেখি করতেন, তাঁদের লেখাগুলোর মাঝ থেকে সেরা লেখাটি নিয়ে প্রকাশ করা হয় এ গ্রন্থটি। ‘ক্রীড়া সাংবাদিকতা : থ্যাংকলেস যব’ শিরোনামে এ লেখাটি ঠাঁই পায় খেলার কথা, কথার খেলা গ্রন্থে। জীবনে সেরা লেখা আজ অব্দি লিখতে না পারলেও সে সময় এ লেখাটি প্রশংসিত হয়েছিলো বেশ। পাঠকদের জন্য তাই পুনর্মূদ্রণ করা হলো আমার এ গ্রন্থে-
আট-ন’টা বছর পেরিয়ে গেল। ক্রীড়া সাংবাদিকতার সাথে জড়িত আছি। সময়টা খুব একটা বেশি নয়। তবুও মনে হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনের পরিবেশটা জানতে বা বুঝতে কিছুটা অন্তত: পেরেছি। এ অঙ্গনের সাথে গত ক’টা বছর একান্ত নিবিড়ে কাটিয়ে আজ কেন জানি মনে হচ্ছে ক্রীড়াঙ্গনটা বড় অকৃতজ্ঞ জায়গা। একজন ক্রীড়া লেখক বা সাংবাদিক হিসেবে অন্যদের কথা জানিনা, শুধু নিজের অনুভূতি দিয়ে বিচার করতে গিয়ে কখনো সখনো যে সুখময় মুহূর্তগুলো ধরা দেয়নি তা নয়। কিন্তু হিসেবের এপার-ওপারের সমীকরণ টানতে গিয়ে আজ কেন জানি মনে হচ্ছে এ পেশায় সুখের চেয়ে দুঃখের পাল্লাটাই ভারী।
হাতে কাগজ আর কলম থাকায় অনেক ক্ষমতাবান মনে হতে পারে, মনে হতে পারে অনেক থ্রিলিং জীবন, আরো মনে হতে পারে মানুষের দোয়া-বদদোয়া ও ভালোবাসায় সিক্ত একটা জীবন। কথাটা মিথ্যে নয়। অঢেল পাওয়ার পরেও একটি জিনিসের না পাওয়ার বেদনায় মাঝে-মধ্যেই এ পেশার প্রতি আমার শ্রদ্ধাবোধের একটা ঘাটতি অনুভব করি।
সরকারী, আধা-সরকারী, কর্পোরেশনের কোন চাকরী নয়, একটি জাতীয় দৈনিকে স্পোর্টস জার্নালিজম করি। মাস পেরুলে বেতন যা পাই তা একজন প্রথম শ্রেণীর সরকারী অফিসারের প্রথম চাকরী জীবনের প্রায় দেড়গুণ। কিন্তু তারপরেও কোন একটা কিছুর অভাব আমাকে দারুণ পীড়া দেয়- মনে হয় সব থেকেও যেনো কিছুই নেই।
কিছুদিন আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এক বন্ধুর সাথে বসে চুটিয়ে আড্ডা মারছিলাম। ঈদের দু’দিন পর এসেছিলো আমার বাসায় ঈদের লম্বা ছুটি বেশ জমিয়ে উপভোগ করতে। দু’জনায় ছিলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। ফিন্যান্স বিভাগের ছাত্র হিসেবে একই সাথে পাঠ চুকিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে ও একটা প্রাইভেট ব্যাংকে চাকরী নিয়েছে। আমার আর ওদিকে যাওয়া হয়নি। ছাত্র জীবনে সাংবাদিকতার মতো ছন্নছাড়া জীবন আমাকে এখনো পরিকল্পিত ভবিষ্যতের কথা ভাববার সুযোগ করে দেয়নি। যদিও মাত্র ক’দিনের জন্য একটা প্রাইভেট ব্যাংকে ঢুকেছিলাম। আবার ছেড়েও দিয়েছি মাত্র এক সপ্তাহের অভিজ্ঞতা নিয়ে। ব্যাঙ্কার সেই বন্ধু বিভিন্ন উদাহরণ টেনে আমাকে বোঝাতে চাচ্ছিলো, সাংবাদিকতার মতো মহান পেশাকে বেছে নিয়ে আমি জীবনে খুব বুদ্ধিদীপ্ত একটা কাজ করেছি। ওর চোখে সাংবাদিকতা একটা মহান পেশা। এ পেশায় থেকে মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ সেবা করা যায়। আগে নাকি মেডিকেল সাইন্সের ছাত্রদের এমন কথা বলা হতো। কিন্তু ডাক্তারদের ইদানিং টাকার বিনিময়ে সেবার ওঠা-নামার হিসেব কষতে গিয়ে অনেকেই নাকি তাদেরকে এখন ভিন্ন দৃষ্টিতে মুল্যায়ন করছেন। গরীব রোগীদের সেবাতেও ডাক্তারদের মূখ্য চাহিদা টাকা-কাড়ি কাড়ি টাকা। সুতরাং আমার সেই বন্ধুর বিশ্বাস মহান পেশা বলতে এখন সাংবাদিকতা। বন্ধুর কথায় ব্যাংকিং জীবন একেবারেই অসহনীয়। ডিপোজিট আনার জন্য একটা টার্গেট চাপিয়ে দেয়া হয়। আর সেই টেনশনেই কাটাতে হয় ২৪ ঘণ্টা। সরকারী, বেসরকারী সব চাকুরীতেই বিপদসঙ্কুল অবস্থা। অথচ এই দ্যাখ তোরা, কি আরামেই না আছিস। যশ, খ্যাতি, সম্মান কি নেই তোদের! একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে। তোদের কাউকে হুজুর হুজুর করতে হয় না। তোদের সামনে চোখ উচিয়ে কথা বলার সাহস আছে ক’জনার? বন্ধুর এতোসব বকবকানি শুনে ভাবলাম ওর যুক্তিগুলো তো মিথ্যে নয়? তারপরেও কিসের অভাব আমাকে তাড়া করে ফিরছে। সত্যি কথা বলতে কি, চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটা আজও আমি মেলাতে পারিনি। শুধু মনে হচ্ছে সব পাওয়ার মাঝেও কিছুই যেনো পাইনি।
ভাবছি আমার সেই বন্ধুর কথা। একটা জিনিস ও খাঁটি বলেছে। এ পেশার লোকজনের সামনে চোখ উঁচিয়ে কথা বলার সাহস আছে ক’জনার। বস্তি থেকে বঙ্গভবন যাদের অবাধ বিচরণ।
ধান ভানতে দিয়ে শিবের গীত বোধ হয় একটু বেশী হয়ে যাচ্ছে। ফিরে আসি আসল কথায়। সত্যি কথা বলতে কি, এ পেশার প্রতি যতো কিছুই থাকুক না কেনো, মানুষের ভালবাসাটা একদমই নেই। আমার এই লেখালেখির জীবনে যিনি শিক্ষাগুরু, মিসেস সালমা রফিক (সহকারী সম্পাদক, ক্রীড়াজগত) অনেক আগেই ছবক দিয়েছিলেন, এটা একটা থ্যাংকলেস যব। কথাটা সে সময় তেমন একটা মনে ধরেনি। কিন্তু আজ মিসেস সালমা রফিকের সেই ছোট্ট ছবকটি কত শতবার যে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে তার হিসেব নেই। এখন কিছু লেখা মানেই এক একজন মানুষের ভালবাসা থেকে বিচ্যুত হওয়া। আমার ব্যক্তিগত জীবনের দু’একটি অভিজ্ঞতার কথা বলি। যে কোন বিষয়ের ওপর গঠনমূলক সমালোচনা করা হলে তার ভালো ও মন্দ দুটো জিনিসই থাকে। কিন্তু এখানেই বিপত্তি। ক্রীড়াঙ্গনে গত ক’বছর ধরেই দেখছি কি খেলোয়াড়, কি কর্মকর্তা, কি সংগঠক বলার সময় তাঁরা বলেন, আমরা সব সময়ই গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানাবো – এটা দরকার। খুব দরকার। কিন্তু তাঁদের ভাষায় গঠনমূলক সমালোচনা বলতে সত্যিকার অর্থে যে কি তা আজও আমি বুঝে উঠতে পারিনি। তবে একটি জিনিস বুঝেছি, কারো সম্পর্কে বা কোন বিষয়ে যদি ‘জিন্দাবাদ মার্কা’ লেখা লিখি তবে খুব প্রশংসা পাওয়া যায়। লেখাটা খুব গঠনমূলক হয়েছে, ভালো হয়েছে এমন মন্তব্য খুব বেশী করে কানে আসতে থাকে। আবার যদি কোন দোষ-ত্র“টি নিয়ে লিখেছি অমনি যেনো সংশ্লিষ্টরা তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। এটা একটা লেখা হলো? এমন মন্তব্যও প্রতিদিন শুনতে হয়েছে, হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে গঠনমূলক সমালোচনা করতে গিয়ে যদি কারো বিপক্ষে কখনো গেছে, তবেই দেখেছি আমার আড়ালে-আবডালে আমার চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করে গালমন্দ করেছেন। আর এভাবেই একদিন, প্রতিদিন খসে যাচ্ছে আমার এক-একজন ভালবাসার মানুষ।
কিছুদিন আগের একটা ঘটনা মনে পড়ছে। ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের কোন একজন কর্মকর্তা আমাকে তাঁর দপ্তরে চায়ের নিমন্ত্রণ করেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিলো, তার সম্পর্কে একটি সাপ্তাহিকীতে প্রকাশিত সমালোচনামূলক লেখার প্রতিবাদ কিভাবে করা যায় তা নিয়ে পরামর্শ করা। উদ্দেশ্যটা আগে বুঝিনি। আমরা একই পাড়ায় থাকি বলে সম্ভবত: লেখার ব্যাপারে আমার একটু সাহায্য কামনা করেছিলেন। তিনি তাঁর দপ্তরের এক কোনায় বসে আমার সাথে আলাপ করছিলেন। আলাপের মাঝখানে এসে ঢুকে পড়লেন প্রাক্তন এক জাতীয় ফুটবল তাঁরকা। ঘটনার আদ্য-প্রান্ত জানার আগেই মন্তব্য ছুঁড়ে দিলেন : ‘আরে ভাই এসব নিয়ে ঘাবড়াবেন না। সাংবাদিকদের চরিত্রটাই ওরকম, মানুষের পিছে লেগে থাকা’। অথচ আমার কাছে ঘটনা শুনে কখনই মনে হয়নি সেই সাপ্তাহিকীর সাংবাদিক বন্ধুটি কোন ইয়েলো জার্নালিজম করেছেন। বন্ধু সাংবাদিক উলেখিত কর্মকর্তার সাথে পরপর চারদিন এপয়েন্টমেন্ট করেও দেখা করতে পারেননি। এমনকি ক্লাবে গিয়েও কোন রকম সহযোগিতা পাননি। আর এসবই তুলে ধরা হয়েছিলো প্রতিবেদনটিতে। আসলে সত্যি লিখলেই শত্রুতা। সেদিন সেই প্রাক্তন জাতীয় ফুটবলারের (নাম উলেখ করে তাঁকে হেয় করার ইচ্ছে নেই) আচার-আচারণে আমি সত্যিই অবাক না হয়ে পারিনি।
সাংবাদিকতা পেশায় বিড়ম্বনা শুধু এখানেই নয়। এদেশে সাংবাদিকতা পেশার সাথে অনেক শিক্ষিত লোকেরও যে তেমন পরিচয় নেই তার প্রমাণ পেয়েছি যথেষ্ট। ‘প্রেস’ বা মিডিয়া বলে পরিচয় দিলে অনেক শিক্ষিত লোককেও দেখেছি যারা ভাবেন প্রেস মানেই ছাপাখানা। মিডিয়াতো বোঝেনই না, এমনকি রিপোর্টার বললে ভাবেন গোয়েন্দা সংস্থার কেউ। আবার অনেককে দেখেছি কাঁধে ক্যামেরা না থাকলে সাংবাদিক এটা বিশ্বাসই করতে চাননা। মনে আছে, একবার রমনা টেনিস কমপ্লেক্সে এশিয়ান জুনিয়র টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপের আসর বসেছিলো। গিয়েছিলাম খেলা কভার করতে। ভিআইপির গেট রক্ষার দায়িত্বে ছিলেন ক’জন বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া রোভার স্কাউট। আমার পথ রোধ করে দাঁড়ালেন। পরিচয় দিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করলো না। তাঁদের যুক্তি ক্যামেরা না থাকলে আবার কিসের সাংবাদিক। অনেক কষ্টে বুঝিয়ে সেবার পার পেয়েছিলাম ঠিকই। কিন্তু প্রচন্ড দু:খ পেয়েছিলাম, একজন বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া ছাত্রের জ্ঞানের এই অভাব দেখে। আমার এক কলিগের কথা বলি। কলেজ পড়–য়া এক মেয়ের সাথে প্রেম ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু বিয়ের সময় যখন ঘনিয়ে এসেছে তখন বাধ সাধলেন মেয়ের অভিভাবকেরা। ছেলে সাংবাদিক শুনেই ঘাবড়ে গেলেন অভিভাবকমহল। কারণ, টেলিভিশন নাটকে তাঁরা সাংবাদিককে দেখেছেন একটা আধা-ময়লা পাঞ্জাবী গায়ে চটের ব্যাগ কাঁধে করে কমদামী ব্র্যান্ড ফুঁকতে। এতেই তাঁদের বদ্ধমূল ধারণা: সাংবাদিক তৃতীয় বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্রক্লিষ্ট পেশা। কবি-সাহিত্যিকদের মতো সাংবাদিকরাও নাকি ঘর বিমুখী, উদাসীন এক ছন্নছাড়া জীবনের সাথী। ‘ম’ দিয়ে যে দুটো প্রচলিত শব্দ আছে যা একজন পুরুষের নোংরা চরিত্রকে চমৎকারভাবে চিত্রায়িত করতে পারে তারই পুঁথি পড়ানো হয়েছে প্রতিনিয়ত। তারপর হঠাৎ করেই শোনা গেলো সেই প্রেয়সী এক ডাক্তারের গলায় মালা পড়িয়ে দিয়েছেন। সুতরাং আমার সেই কলিগের প্রেমের যবনিকা ঠিক সেখানেই।
আসলেই এ পেশার মানুষগুলোর প্রতি প্রেম বা ভালোবাসার কোন পূর্ণতা নেই। নেই কোন আবেগ। আছে শুধু কঠিন বাস্তবতার এক একটি ক্ষণ। সব পেয়েও না পাওয়ার এই বেদনাটুকুর মর্মজ্বালা যে কতোটা তা আজ আমি হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করছি। মাঝে-মধ্যে বড্ড অভিমান করতে ইচ্ছে করে আমার সেই পরম শ্রদ্ধেয়া শিক্ষাগুরুর ওপর, যিনি আমাকে টেনে এনেছেন এ পেশায়, কিন্তু ছুঁড়ে দিয়েছেন অনেকের মন থেকে।
একজন খেলোয়াড়কে তৈরি করতে, একজন খেলোয়াড়কে বিকশিত করতে একজন ক্রীড়া লেখক বা ক্রীড়া সাংবাদিকের অবদান বিশ্বব্যাপী সমাদৃত। শুধু তাই নয়, ক্রীড়া উন্নয়নে, প্রসারে ও বিকাশে ক্রীড়া লেখক-সাংবাদিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু আজ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে শুধুই মনে হচ্ছে সত্যি এটা একটা থ্যাংকলেস যব।
মন্ট্রিয়ল, কানাডা
