
ফেইসবুকে আসলে অনেকের আহাজারি দেখে মনে হয় বাংলাদেশের জাতীয় সমস্যা হচ্ছে, শিক্ষকদের হেনস্থা এবং জোর করে পদত্যাগ করানো। বলে রাখি, ব্যক্তিগতভাবে আমি এই অভব্যতার বিপক্ষে।
আজ আমার যেটুকু অর্জন, সেটার পিছনে আমার শিক্ষকদের বিশাল অবদান। আমি নিজেকে মনে করি শিক্ষকদের পরিশ্রম এবং ত্যাগের ফসল। আমি সেই দূর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী, এই মধ্য বয়সেও যার মাথার উপরে অনেক শিক্ষকদের দোয়া এবং আশীর্বাদের হাত আছে।
তবুও এই শিক্ষকদের লানছিত হবার ঘটনা দেখে আমার কোন প্রতিক্রিয়া হচ্ছেনা। বরং গণহত্যায় নির্বিকার থাকা মানুষগুলো যখন এসব ঘটনায় বিশাল প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন তখন একটু অবাকই লাগছে।
যাক গে! সে দায় যার যার বিবেকের। কিন্তু আমি কেন এমন ঘটনায় স্বভাবসুলভ অস্থিরতা দেখাচ্ছি না, সেটা একটু ব্যাখ্যা করা দরকার। এটার প্রধান কারণ, এদেরকে আমি শিক্ষক বলতেই রাজি না। এদেরকে শিক্ষক বললে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের অবমাননা করা হয়।
শিক্ষক, অভিভাবক আমাদের সমাজে এই পরিচয়গুলো খুব পবিত্র। সেগুলো অর্জন করতে হয়। চাকরির চিঠিতে চেয়ার পাওয়া যায়, শিক্ষক হয়ে ওঠা যায় না। যারা এইসব ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাদের বাস্তবতা হয় তো ভিন্ন। ধরে নিচ্ছি
-তাদের শিক্ষকরা কখনো তাদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করেন নি।
-তাদের শিক্ষকরা যোগ্য ছাত্রকে বঞ্চিত করে রাজনৈতিক নেতাদের অযোগ্য ছেলেমেয়েদের বিশেষ সুবিধা দেন নি।
-তাদের শিক্ষকরা কোনদিন তাদেরকে যৌণ হয়রানি করে নি।
-তাদের শিক্ষকরা লেখাপড়া নিয়ে রাজনীতি করেনি
-তাদের শিক্ষকরা ছাত্রদের জন্য বরাদ্দ অর্থ মেরে খান নি।
-তাদের শিক্ষকরা অভিভাবকের অবস্থানের জন্য সন্তানকে হেনস্তা করে নাই।
অথবা
-রাজনৈতিক দলের হোমরাচোমরা হবার কারণে শ্রেনীকক্ষে হাজির হবার প্রয়োজনই বোধ করেন নি, এমন ঘটনা তাদের সাথে ঘটেনি।
যদি এগুলো আপনি বা আপনার কাছের মানুষ ব্যক্তিগতভাবে ফেইস না করে থাকেন, তবে ক্ষেপে যাওয়া এই ছেলমেয়েদের বাস্তবতা বোঝা আপনার কর্ম না। আমাদের সময় শিক্ষকদের নিয়ে সর্বোচ্চ স্ক্যান্ডাল ছিলো ভিকারুননিসা স্কুলের প্রিন্সিপ্যাল হামিদা আলীর বিদেশ সফরে যেয়ে হোটেলের টাওয়াল নিয়ে আসার কাহিনি।
সেই বাস্তবতা এখন আর নাই। গত কয়েক দশকে সব বদলে গেছে। আমার দশ বছরের ডিপার্টমেন্টাল এক জুনিয়রের কাছে শুনেছিলাম এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডিপার্টমেন্টের ছাত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। ছাত্রী রাজি না হওয়ায় সে প্রকাশ্যে তাকে রাজনৈতিক গুন্ডা দিয়ে রেইপ করানোর হুমকি দিয়েছে। যারা শিক্ষকের অন্যায় হলে আইন এবং বিচারের দোহাই দেন, তাদের জন্য এর পরের অংশটুকু পড়া খুব জরুরী। সেই ভুক্তভোগী ছাত্রী এই শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানালে, শিক্ষকের মাত্র দুই মাসের সাসপেনশন হয় এবং দুইমাস পরে সে সগৌরবে ফিরে এসে সেই ছাত্রীর জীবন দূর্বিষহ করে তোলে।
এটা আমি বলছি ১৩/১৪ বছর আগের কথা। গত ১৩/১৪ বছরে এই অভিযোগ জানানোর জায়গাটুকুও কারও কারো ছিলো না।
সুতরাং কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জনের আগে চিন্তা ভাবনা করেন। গত একমাসে বুঝতে পেরেছি চোখের পানি কত দামী। মজলুমের চোখের পানি স্রষ্টার আরশ কাঁপিয়ে দেয়, স্বৈরাচারের মসনদ ধ্বসিয়ে দেয়। বরং আপনার চোখ রাখুন গত দু’দিন ধরে ফেইসবুকে ঘুরে বেড়ানো ভ্যানভর্তি লাশের স্তুপের ভিডিওর দিকে।
একটি জীবনের জন্য এরচেয়ে নির্মম এবং অসম্মানের আর কি হতে পারে? আমি পুরোটা দেখতে পারিনি, নার্ভে কুলায়নি! যারা এখনো তাদের প্রিয়জনের লাশ খুঁজে পান নি, এই নির্মম ভিডিওটি হয়তোবা বারবার দেখছেন। শার্টের কোনা, প্যান্টের ভাঁজ, মুখের একাংশ যদি হারিয়ে যাওয়া বাচ্চাটির সাথে মেলে। আপনার চোখের পানি, হাহাকার বরং এদের জন্য জমা রাখেন।
আবেগ, চোখের পানি, আত্মার হায় এগুলো বড় Sacred-এগুলোর অপব্যবহার করবেন না।
টরন্টো, কানাডা
