
এই দেশে; মানে কানাডায়, বাচ্চাদের স্কুলে বিভিন্ন ধর্মের বিশেষ বিশেষ রীতি, প্রথা, উৎসবকে উৎসাহিত করতে স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেরাই আয়োজন করেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। কোনোভাবেই ধর্মের পরিচয়ে কাউকে ছোট করার বা শ্রেষ্ঠ ভাবার কোনো সুযোগ এখানে নেই।
এটি একটি গর্হিত রাষ্ট্রীয় অপরাধ। বাড়িতে যে যাই করুক, অথবা যে ধর্মই চর্চা করুক, স্কুলে বাচ্চাদের সকল ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে অত্যন্ত কঠোরভাবে ও ভালোবাসার সাথে শিক্ষা দেওয়া হয়। এমনভাবেই সেই শিক্ষা দেওয়া হয় যে, তারা সেটা শিখেও। বাড়িতে নিজের ধর্মের প্রতি কঠোর অনুশাসনে থেকেও অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে তাদের কুণ্ঠাবোধ হয় না৷ দ্বিধা কাজ করে না। বরং সকল ধর্মের মানুষের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হওয়ার চর্চাটাকেই প্রাত্যহিক জীবনের অতি অবশ্য পালনীয় রীতি মনে করে।
বাড়িতে কোন কোন পরিবারে নিজ ধর্মের আচার নিয়ম অনুশাসনের প্রতি কঠোর রীতি মেনেও কীভাবে তারা অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল হতে পারে? এজন্যই হয় যে, শিশুকালেই স্কুলে তাদের এই শিক্ষাটাই আগে দেওয়া হয়। এবং বাচ্চারা মনেপ্রাণে তা মেনে চলে সারাজীবন। মেনে চলে বলেই এইদেশে সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার চর্চা করার সহাবস্থান আছে। তারপরও কেউ কেউ এইদেশকে গালি দেন৷ বিদ্বেষমূলক বৈষম্যের আগুন ছড়িয়ে দেন।
এইদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম খ্রিস্টান। কিন্তু সংবিধান কোনভাবেই তাদেরকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রাধান্যের অধিকার দেয়নি। সংখ্যাগরিষ্ঠ বলেই তারা অন্যের ধর্মচর্চার উৎসব আয়োজনকে বন্ধ করার মিছিল শ্লোগানে রাস্তাঘাটে বেরিয়ে পড়ে না। বরং সংখ্যায় যত ক্ষুদ্রই হোক, সেই ধর্মের, ভাষার, জাতির সংস্কৃতি চর্চাকে তারা প্রভূত উৎসাহ দিয়ে থাকেন। এমনকি রাষ্ট্রীয়ভাবে সাহায্য সহযোগিতা ও অনুদান দিয়ে উৎসাহ দেন। এতে ভিন্ন ধর্মের, জাতির, ভাষার, সংস্কৃতির একটি অপূর্ব সুন্দর মধুর ঐকতান সৃষ্টি হয়। মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সহাবস্থানের সহনশীল সংবেদনশীলতা সৃষ্টি হয়।
আমি বিশ্বাস করি আমাদের বাংলাদেশও এরকম বিশ্বাসের মৌল ভাবনার উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তারপরও আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের মানুষের উপরে, বাড়িতে, উপাসনালয়ে, উৎসব আয়োজনে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে! রাষ্ট্র কি কখনোই এদের এই হুমকি, হামলা, হত্যা, ধর্ম পালন ও উৎসব আয়োজনে বাঁধা দেওয়ার নাগরিক অধিকার ক্ষুন্ন করার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেবে না! নাকি ভোটের ব্যাংক নিশ্চিত করার জন্য মানুষের প্রতি আদিম ও মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক বর্বর খেলাটি খেলেই যাবে!
জানি, আপনি আপনার ধর্মমতের বিশ্বাসকেই প্রতিষ্ঠা করতে চাইবেন। যদি আপনার ধর্মচর্চা, বিশ্বাসের প্রতিষ্ঠায় কেউ অন্তরায় না হয়, হাতলে অন্য ধর্মের উৎসব-আয়োজনকে বাঁধা দিয়ে যে তার বিশ্বাসের ধর্মচর্চার নাগরিক ও রাষ্ট্রীয় অধিকারকে খর্ব করছেন, এটা কি জানেন? এতে যে শান্তি বিঘ্নিত হয়, এটা কি বুঝেন?
যে কোন ধর্মের কাউকেই এমন কোন আচরণ করা উচিৎ নয়, যাতে আপনার ধর্মকে মানুষ ভয় পায়। সাধারণ মানুষ তার ধর্মচর্চা করতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। কিন্তু বাংলাদেশ সেদিকেই যাচ্ছে! তার অনেকগুলো সুস্পষ্ট আলামত আমরা দেখতে পাচ্ছি। যে দেশে অন্য ধর্মীয় উৎসব পালনের বিরুদ্ধে রাজ রাস্তায় মিছিল শ্লোগানে হুমকি দেওয়া হয়, সেই দেশের এক শ্রেণীর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত মানুষের পরিকল্পনা বুঝতে অসুবিধে হয় না। বুঝতে অসুবিধে হয় না, উর্দু ভাষায় জাতীয় প্রচার মাধ্যমে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনার উদ্দেশ্য, বুঝতে অসুবিধে হয় না জাতীয় সংগীতে কোথায় আপত্তি, বুঝতে অসুবিধে হয় না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিরোধিতা করার হাঁটুজল খেয়ে মরিয়া হয়ে অপপ্রচার চালানোর মূল উদ্দেশ্য, বুঝতে অসুবিধে হয় না, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম মুছে দিতে কেন তোমাদের আসল উদ্দেশ্য! আর এখানেই আমার ক্ষোভ, দুঃখ, উদ্বিগ্নতা; আর এই জন্যই আমার পর্বতপ্রমাণ শক্ত দৃঢ়তায় বিশ্বাস যে বাঙালি তার অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের দৃষ্টি হারাবে না। সকল ধর্মের মানুষকে সমান অধিকার দেয় না, এমন মধ্যযুগীয় সাম্প্রদায়িক মনোভাবের রাজনীতিকে ‘না’ বলবেই।
আজকে পূজার বিরুদ্ধে মিছিল দিয়ে ভয় ঢুকিয়ে আবার তাদেরকে দিয়েই মন্দির পাহারা দেওয়ার কৌশলের রাজনীতি মানুষ বুঝতে পারে! মানুষ এতো বোকা নয়!
আমি অঙ্গীকার করছি, সকল ধর্মের মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে, একটি সুন্দর ও শান্তিময় পৃথিবীর জন্য, আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনের জন্য, আমার শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত আমি বোধবুদ্ধি দিয়ে কাজ করবো। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।
টরন্টো, কানাডা
