
আমি আপনাকে সম্মান দেখাতে চাই। আপনাকে সারা বিশ্ব জানে, এক নামে চেনে। কানাডায় মিঃ সুজুকি ও মিঃ বাটার সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তো আমার নিজের চোখের দেখা। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে কত ধরনের কথা আছে। কত নিষ্ঠুর গল্প শুনেছি! তবু, আমি নিজেকে প্রবোধ দিয়েছি – অনেক বড় মানুষ হলে তাকে নিয়ে নেতিবাচক কিছু গল্প হয়তো মানুষ না জেনেই ছড়িয়ে দেয়।
পদ্মা সেতু প্রকল্পে অর্থ সাহায্যের বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অসম্মতিতে আপনার ভূমিকা আছে বলে যে কানাঘুষো শুনেছি, সেগুলোও আমার বিশ্বাস করতে মন সায় দেয়নি। আপনি যে একটি বিশাল সাম্রাজ্যবাদী দেশের রাজনৈতিক প্রকল্প ও ভৌগোলিক সীমানাজুড়ে নজরদারির বাস্তবায়নে কাজ করার মাধ্যম হিসেবে নিজেকে নিবেদিত করেছেন, এই ধরনের নানান কথাকেও আমলে নিইনি৷ কেননা, আমি আপনাকে সম্মান দেখাতে চাই।
নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব হিসেবেও আপনাকে আলাদাভাবে সম্মান দেখাতে চাই। কিন্তু সেখানেও হেনরী কিসিঞ্জার, অং সাং সুকির বাংলাদেশের উত্তরসূরী কি না, এই দ্বিধাও আমাকে অনিশ্চিত করে না!
কেন আমার এই দ্বিধা একটু ব্যাখ্যা করি। আপনি অবশ্যই মানবেন যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল একাত্তরের এক সাগর রক্তক্ষয়ি যুদ্ধের মাধ্যমে। একাত্তরে সংঘটিত হলেও যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল জিন্নাহর ঢাকা সফরের প্রাক্কালে রাষ্ট্রভাষা উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার দাম্ভিক বক্তৃতার পরে এর বিরুদ্ধে ছাত্রজনতার আন্দোলনের মাধ্যমে। তারপরে আমাদের সাংস্কৃতিক চর্চার অধিকারকে সংরক্ষিত করা, [ রবীন্দ্রনাথ অন্যতম ] অর্থনৈতিক বৈষম্য, স্থাপনায় বৈষম্য, সামরিক ও সরকারি চাকুরিতে বৈষম্য এবং সর্বোপরি সত্তরের নির্বাচনে নিখিল পাকিস্তানের জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়ী হয়েও প্রাপ্য ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে আমাদেরকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা। অতর্কিতভাবে ঘুমন্ত অবস্থায় নিরীহ মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছে৷ আমাদের দেশে এসে পাকিস্তানি সৈন্যরা মানুষকে হত্যা। আত্মরক্ষার জন্য বাংলাদেশের আপামর মানুষ তখন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করতে প্রাণপণ লড়াই করেছে, যুদ্ধ করেছে।
সেই যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিবৃন্দ। যাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের মানুষ যাকে ভালোবাসা সম্মান দেখিয়ে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছেন। তার মানে হলো বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। যে মুক্তিযুদ্ধের পরিচালনায় থাকা নেতৃত্বের নেতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু। যে পরিচালনা কমিটি শপথ নিয়েছিল কুষ্টিয়ার মেহেরপুর বৈধ্যনাথতলায়। যে বঙ্গবন্ধুর বত্রিশ নাম্বার বাড়ি থেকে ষাটের দশক থেকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রামের শান্তিপূর্ণ পরিকল্পনা করা হতো, যে বাড়ি থেকে বাঙালির রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ত্বরান্বিত করতে প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত।
আমি বিশ্বাস করতে চাই, জাতির একটি ক্রান্তিকালে আপনি রাষ্ট্রের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মানুষের কণ্ঠরোধ, আপনজনের প্রাণহানি, চাকুরীতে বৈষম্য, বিশাল অংকের টাকা পাচার, অপ্রতিরোধ্য দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি সবকিছুতে ক্ষুব্ধ হয়ে মানুষ বত্রিশ নাম্বার পুড়িয়ে দিয়েছে, গণভবন লুটতরাজ করেছে, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের সকল স্মারক ভাস্কর্য ভেঙে দিয়েছে। বৈধ্যনাথতলার সকল স্মারক ভাস্কর্য ও স্তম্ভ ভেঙে দিয়েছে।
শপথ নেওয়ার পরে আমি ভেবেছিলাম ক্ষুব্ধ মানুষের মনের ক্ষুব্ধতার উপর জোর দিয়ে আপনি অন্তত এটুকু বলবেন যে, এগুলো জাতির গৌরবের স্মৃতির স্মারক, এগুলো ধ্বংস করা ঠিক নয়। আমি এও ভেবেছিলাম আপনি জনগণকে শান্ত হতে অনুরোধ করবেন।
আমি ভেবেছিলাম বাংলাদেশের কথা উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে অগণিত শহীদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবেন।
বিশ্বাস করুন, আমি আপনাকে সম্মান দেখাতে চাই। কিন্তু যারা বাংলাদেশ মানে না, ঐতিহাসিকভাবে এদেশের নাম, স্বাধীনতা, জাতীয় সংগীত, বঙ্গবন্ধু, আমাদের জাতিসত্তার সংস্কৃতিকে মানে না, নানান আলামত বলে আপনি তাদেরই নেতৃত্ব দিচ্ছেন৷ প্রকারান্তরে আপনি কি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধ শক্তিরই নেতা হিসেবে নিজেকে আবির্ভূত করছেন? তা না হলে জাতির উদ্দেশ্যে দুই দুইবার আপনি ভাষণ দিলেন – একবারও মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা উল্লেখ করলেন না; মহান সংসদ ভবনের ভিতরে ভাংচুর হলো, জাতীয় সংগীত বদলে ফেলার পায়তারা ও কানাঘুষো হলো, জিন্নাহর মৃত্যুদিবস পালনের এক অনুষ্ঠানে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধকে ভারত পাকিস্তানের যুদ্ধ বলে প্রচার হলো, উর্দু ভাষায় জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যমে অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা করা হলো, অগণিত শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হলো, পাহাড়ে অশান্তি শুরু হলো, বিভিন্ন উপাসনালয় ও মানুষের নিশ্বাসের স্থাপনাগুলো ভেঙে গুঁড়িয়ে ভূলুণ্ঠিত করা হলো, আপনার মুখ থেকে একটি শব্দও উচ্চারণ হলো না, এই বিষয়গুলো নিয়ে!
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা, আমি আপনাকে সম্মান দেখাতে চাই। আপনি সম্মানিত মানুষ। আমি চাই আমার ধারণা ভুল হোক। আপনি ৮৪ বছর বয়সের একজন পরিণত বুদ্ধির পরিপক্ব ব্যক্তিত্ব। একটি জাতির অভ্যুদয়ের পেছনে অনেক অনেক ত্যাগ তিতিক্ষা থাকে৷ আমরা অতীতকে মনে রেখেই সামনের দিকে এগিয়ে যাবো। আপনি বাঙালি জাতির এক অবিসংবাদিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে একটি শ্রেষ্ঠ জীবনের অধিকারী হতে পারেন, মানব জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ কাজটি যদি করতে পারেন : এই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের যথাযথ সম্মান বজায় রেখে বাঙালির জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মূল ভিত্তিগুলোকে বহাল রেখে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের ধ্বংসলীলা থেকে বাঁচানোর জন্য কঠোরভাবে নিজের ব্যক্তিত্বকে যদি কাজে লাগাতে পারেন৷ তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তের ঋণকে অস্বীকার করবেন না, করতে পারেন না। একথা অস্বীকার করার কোন অবকাশ নেই যে, বিশ্বখ্যাতি অর্জন করলেও আপনি বাংলাদেশের সন্তান। বাংলাদেশের পতাকাই আপনার পরিচয় ও মূল সম্মান। এই সম্মানকে আরো উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে অন্তরায়গুলোকে কঠোরভাবে দমন করে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আপনার সঠিক ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত জাতি চিরকাল মনে রাখবে, যে মন্ত্রে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রাণ দিয়ে দেশটিকে স্বাধীন করেছিলেন, তা প্রতিষ্ঠায় এই মুহূর্তে আপনার সঠিক সিদ্ধান্তের নিরিখে।
অন্যতায় আপনি যদি মার্কিন মদদে পাকিস্তানের দোসরদের ৭১ এর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এই বয়সে এসে নিজেকে ব্যাপৃত করেন, তাহলে আপনি হবেন বাঙালি জাতির সবচেয়ে ঘৃণিত মানুষ। সামনের দিনগুলো বলবে আপনি নিজেকে কোথায় রাখতে চান।
টরন্টো, কানাডা
