
প্রিয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন নিয়ে কিছু লিখতে গেলে এত কথা এত ষ্মৃতি মনে পড়ে যে পরিসর মেলানো কঠিন। হাম্মাদ, রানু, হায়দারসহ এবারের রিইউনিয়নের আয়োজক বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে অল্প সময়ে স্বল্প পরিসরে জীবনের সোনালী দিনগুলিতে বন্ধুদের সাথে কাটানো সময়ের কিছু ষ্মৃতি নিয়ে এই লেখা। এখানে যাদের কথা বলা হবে তারাই যে কেবল আমার সব ষ্মৃতি জুড়ে আছে তা যেমন সত্যি না, আবার যাদের কথা বলা সম্ভব হবে না তারাও যে আমার কতখানি তা বোধকরি বলে দেয়ার দরকার পড়বে না।
যতদূর মনে পড়ে ১৯৮৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি কোন এক দিনে আমাদের ’৮৮ ব্যাচের বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু। ভর্তির আয়োজন ছিল করিম ভবনের পুরনো অডিটোরিয়ামকে কেন্দ্র করে। কি উৎসাহ উদ্দিপনার সেই দিন- আজও মনের মনিকোঠায় জ্বলজ্বলে। জাহিদ আমার পুরনো বন্ধু। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় আমরা একসাথে পড়েছি।পরবর্তীতে সোনালী ব্যাংকের চাকুরীও আমরা একসাথে শুরু করেছিলাম। তবে আমার বেশীদিন করা হয়নি। ভর্তি দিনের ঐ কুরুক্ষেত্রে জাহিদ আমাকে খালেদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। খালেদকে দেখে আমার কেন যেন খুব চেনা মনে হয়েছিল। কাকতালীয় ভাবে আমি ওর বাড়ী যে সাতক্ষিরা সেটাও বলেছিলাম। খালেদকে আগে থেকে চেনা বা বাডী় কোথায় জানা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেদিন কিভাবে সম্ভব হয়েছিল, আমি নিজ থেকে পরবর্তীতে বহু ভেবেও সেই রহস্যের কোন কুল কিনারা করতে পারিনি।
আমি, খালেদ, কান্চন, রফিক আর হাবিব মিলে থাকতাম আশরাফুল হক হলের ৪১১/খ রুমের নীচের অংশে। তমজিদ, নজরুল আর রফিক(ফিসারিজ) মিলে থাকতো উপরের অংশটায়। এই রুমে থাকাকালীন একটা অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে। তখনকার দিনে আবাহনী-মোহামেডান খেলা মানেই বাঁধভাঙ্গা আবেগ উত্তেজনা। খেলার দিন আমাদের হলের ফ্ল্যাগ ষ্ট্যান্ডে আমি আর খালেদ মিলে মোহামেডানের পতাকা লাগাতাম। একটাই ফ্ল্যাগ ষ্ট্যান্ড ছিল। এক আবাহনী-মোহামেডান খেলার দিন আমাদের রুমমেট রফিক(ফিসারিজ) তার প্রিয় দল আবাহনীর পতাকা লাগাতে না পেরে খুব রুষ্ট হয়। বিষয়টা এতদূর গড়ায় যে, সেদিনের খেলা শেষে সামছুল হক হলের সামনের তিন রাস্তার মোড়ে আমি আর খালেদ ৫/৬ জনের মারপিটের শিকার হই। আজ এতকাল পরে ভেবে অবাক হই, তরুণ বয়সে কত তুচ্ছ বিষয় নিয়ে আমরা বিবাদে জড়িয়ে পড়ি! রফিক বিষয়টা হয়তো ভুলেই গেছে। তুললাম মানে এই না যে, আমিও ভুলে যাইনি। নজরুল সব সময় রুমে আমাদের আনন্দের উৎস হয়ে বিরাজমান ছিল। আমরা ওকে খচর মচর বলে ডাকতাম। পরে কেমনে যে ওর ‘বিরাজমান’এ উত্তরণ হলো, বড়ই বিষ্ময় আমার। এখনো মনে আছে, আমরা সম্মিলিত কন্ঠে গাইতাম- ‘আমি চাইলাম তুই দিলি না’…। মালয়েশিয়া প্রবাসী মামুন আমাদের রুমের আড্ডাবাজীতে নিয়মিত যোগ দিত। ঐ রুমের জানালা দিয়ে কৃষি অনুষদ, পাঁচতলা, TSC, জব্বার মোড় সব, সব দেখা যেত। তমজিদ ঐ জানালার পাশে দাঁড়ানো আমার একটা ছবি তুলে দিয়েছিল। জীবনে আরও অনেক ছবি তোলা হয়েছে, ঐ ছবিটার মত ষ্মৃতিময় ছবি বোধকরি আমার আর দ্বিতীয়টি নেই।
বন্ধুদের আনন্দের উৎস্য জোয়েবএর সাথে আমার পরিচয়টাও কাকতালীয়। ও ভাল টিটি খেলতো। ময়মনসিংহ জেলা দলের হয়ে যশোরে খেলতে গিয়েছিল। সেই সূত্রে আমার সাথে ওর পরিচয়। পরে একসাথে ‘পিলসুজ’ করতে করতে ও আমার বন্ধু থেকে আপনজনে পরিনত হয়। সারাদিন ক্যাম্পাসে বাউন্ডুলের মত ঘুরে বেড়াত। যেখানেই থাকুক দিন গড়িয়ে রাত নামলে আমাদের দেখা হতো। ও আগাগোড়াই এলোমেলো অগোছালো মানুষ। বাসা থেকে যা নিয়ে রওনা দিতো, ওর সবসময় তাড়া থাকতো কত দ্রুত তা খরচ করে ফেলা যায়। আমি হলে মিনি ডাইনিং করে খেতাম। গভীর রাতে আমি আর জোয়েব একজনের খাবার শেয়ার করে কতবার যে দুজনে খেয়েছি! ও যেদিন কোন একজনকে ওর গোপন বেদনার কথা জানাতে যায়, আমার বেগুনী রংয়ের গেন্জিটা পরে গিয়েছিল। আমার কেবলই মনে হয় সে কারণেই হয়তো ওর বেদনাগুলো বেগুনী থেকে হঠাৎ নীল হয়ে গেছে। আমার অপয়া গেন্জিটাকে আমি আর কখনো পরিনি। জোয়েবকে মনে করে আমি এখনো কবিতা পড়ি। এই এতকাল পরেও স্বপ্ন থেকে ঘুম ভেঙ্গে আবেগতাড়িত অনুভূতিতে ও আমাকে ফোন করে। ফোনের একপাশে ও শব্দ ক’রে, আরেকপাশে আমি নিঃশব্দে কাঁদি। জোয়েব আমার বন্ধু, আমার দেখা সাদামনের মানুষ।
আমরা যখন তৃতীয় বর্ষে, একাডেমিক প্রয়োজনে আমাদের এক্সটেনসন ট্যুরে যেতে হয়েছিল। কাসেম স্যারের নেতৃত্বে আমাদের সপ্তাখানেকের গ্রুপ ট্যুরটা হয়েছিল শেরপুরে। ট্যুরের অংশ হিসাবে ওখানকার জেলা পরিষদ মিলনায়তনে আমরা মাহফুজার উপস্হাপনায় একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছিলাম। আজও মনে আছে অনুষ্ঠানে তপন আর নাজ মিলে গেয়েছিল ‘মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম’। একটা জারী গানের নেতৃত্ব দিয়েছিল শফিক। ‘গাছের একটা ডাল পশ্চিম দিকে সেই ডালেতে সূর্য ওঠে’- আহা! সেকি টান। আমার পরিচালনায় আমার জীবনের প্রথম এবং বোধকরি শেষ নাটকে আমরা সহপাঠি বন্ধুরা অভিনয় করেছিলাম। আমি ছিলাম যুদ্ধাহত মুক্তিযাদ্ধা, সুস্মিতা ছিল সোনালী। নাটকে প্রায় সবাই আনকোরা হলেও ভাল অভিনয় করেছিল। অনুষ্ঠান শেষে জেলা প্রশাসক মহোদয় ব্যক্তিগতভাবে আমাদেরকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। গ্রুপ ট্যুরটা আমাদের সহপাঠী বন্ধুদের আত্মিক বন্ধন আরও দৃঢ় করেছিল।
আমাদের সমাপনী বর্ষের ট্যুরে দুটো মজার ঘটনা ঘটেছিল। আমরা যখন সিলেটের তামাবিল এলাকায় তখন বাঘমার্কা কয়েকটা বোতল কেনা হয়েছিল। রাতে যখন আমরা এটিআই হোষ্টেলে, তখন আয়োজন করে পান করার ব্যবস্থা হলো। উপস্হিত সবাইকে খেতে হবে, কেউ বাদ যাবে না। আমরা সবাই গোল হয়ে বসলাম। একে একে যখন শাহীনের পালা এল, ও বাম হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে ডান হাতে গেলাস গলায় ঢেলে দিল। আমি যখন এতদিন পরে এই লেখা লিখছি তখনো একা একা হাসছি। ও, একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, সেদিন আমাদের নাসির কিন্তু বরাবরের মতই গন্ধেই মাতাল হয়ে গিয়েছিল।
চট্টগ্রাম সিম্যান্স হোষ্টেলে যেদিন পৌঁছালাম সেদিন বিকালে নিজেদের মত করে বেড়ানোর সুযোগ পাওয়া গেল। আসাদ, জাহিদ, মাহফুজা, নাসিরসহ আমরা আরো কয়েকজন বাইরে মানে শহরের সিঙ্গাপুর মার্কেটে ঘুরতে গেলাম। সন্ধ্যায় যখন ফিরছি, হোষ্টেলের প্রবেশ পথে একটা বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে গেল। আমাদের একজন অতি উৎসাহী সহপাঠী তারই একজন বন্ধুর সাথে অনাকাংখিত অশোভন আচরন করে ফেললো। বিষয়টা যখন এক এক করে জানাজানি হয়ে গেল তখন সবার মধ্যে অস্বস্তি আর উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো। সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত আর ট্যুর এগোবে না- এই রকম পরিস্হিতি। সকালবেলায় স্যারদের সাথে বসা হলো। যার কারনে এই পরিস্হিতির সৃষ্টি সবার অলক্ষে কোন এক ফাঁকে সে আমাদের ফেলে হারিয়ে গেল। অগত্যা আমরা আবার পরবর্তী গন্তব্যে রওনা হলাম। তারপর আমার ঐ বন্ধুটির সাথে আমাদের অনেকের আর কখনো দেখা হয়নি। বিশেষ পরিস্হিতিতে নেতৃত্বের যে গুনাবলী অপরিহার্য হয়ে পড়ে ঐদিন বান্ধবী শিরিনের কাছে আমরা তা পেয়েছিলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের এরকম আরও কত শত ঘটনার ষ্মৃতি আমাদের প্রায় সবার মনেই আছে। আরো অনেক কথা বলার ছিল। পরিসর আর সময় সব বলতে দেবে না। শেষের দিকের একটা বিষয় বলে ইতি টানবো। তখন আমরা মাষ্টার্সে। জোয়েব, হারুন, লিটন, চন্চল আমরা একসাথে ঘোরাফের করি। নাসির, জাহিদসহ অনেক বন্ধুরাই তখন চাকরীসূত্রে দূরে চলে গেছে। আমরা প্রায়ই গভীর রাতে ব্রক্ষ্মপুত্রের পাড়ে ঘুরতে যেতাম। হাঁটতে হাঁটতে একসাথে সুর করে গাইতাম ‘আমি বাঁকে আমার মনটা বাঁকে, আজও পারলাম না আমার মনকে বোঝাতে’। মনকে কি আসলেই বোঝানো যায়? আমার তো জানা নেই!
হ্যামিল্টন, কানাডা
