
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে যারা হত্যা করেছিল তাদেরকে খন্দকার মোশতাক আহমেদ সূর্য সন্তান আখ্যায়িত করেছিলেন।
এই সূর্য সন্তানদের বিচার থেকে অব্যহতি দেওয়ার জন্য তৎকালীণ রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ একটি অধ্যাদেশ জারি করেন যা ইতিহাসে কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বলে পরিচিত।
পরে ১৯৭৯ সালে সংসদ কর্তৃক এটি অনুমোদন করা হয়। যার ফলে এটি একটি আনুষ্ঠানিক আইন হিসেবে অনুমোদন পায়। ১৯৭৯ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর পর সংশোধিত আইনে এ আইনটি বাংলাদেশ সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
উপরের এই সংক্ষিপ্ত পটভূমির কারন হচ্ছে, বর্তমানের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গতকাল তার ভ্যারিফাইড ফেসবুক একাউন্টে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি সেখানে উল্লেখ করেছেন, জুলাই মাসের ১৫তারিখ থেকে আগষ্টের ৮ তারিখ পর্যন্ত সংঘটিত জুলাই গন-অভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ঘটনার জন্য কোন মামলা, গ্রেফতার বা হয়রানি করা হবে না।
আইন উপদেষ্টা এই বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেছেন।
তবে এই নির্দেশনা গ্যাজেটের মাধ্যমে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে কিনা তা আমার জানা নেই।
ফেসবুকের মাধ্যমে এই রকম আইনি একটি নির্দেশনা দেওয়া পৃথিবীর আর কোথাও হয়েছে কিনা তাও আমার জানা নেই।
তবে আইন উপদেষ্টা যেহেতু ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন সেহেতু এটি গ্যাজেটের মাধ্যমে অধ্যাদেশ আকারে প্রকাশিত হবে, সেটি মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই অনুমান করা যায়।
এখানে একটি প্রশ্ন অনেকের কাছে প্রাসংঙ্গিক মনে হতে পারে।
বিগত সরকারের পতন হয়েছে আগষ্টের মাসের ৫ তারিখ, তাহলে আগষ্টের ৮ তারিখ পর্যন্ত দায়মুক্তি কেন দেওয়া হয়েছে? আগষ্টের ৫ তারিখেই তো অভ্যুত্থান চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছে সফলতা অর্জন করেছিল। তাহলে আগষ্টের ৬,৭,৮ তারিখ এর মধ্যে আসে কেন?
যতদূর মনে পড়ে বর্তমানের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়ে গঠিত হয়েছিল আগষ্টের ৮ তারিখ।
তাহলে বুঝা যাচ্ছে জুলাইয়ের ১৫ তারিখ থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন হওয়া পর্যন্ত দায়মুক্তির কার্যকাল ধরা হয়েছে।
এটি পরিষ্কার যে এই কার্যকালের মধ্যে যা যা হত্যাকান্ড হয়েছে, যা যা অগ্নি সংযোগ হয়েছে, যা যা ভাংচুর হয়েছে, যা যা বেআইনি বা আইন বর্হিভূত কর্মকান্ড হয়েছে, সেই সবের সাথে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোন মামলা করা যাবে না এবং সংশ্লিষ্টদের গ্রেফতার, হয়রানি করা যাবে না।
এই ধরনের একটি অধ্যাদেশ স্পষ্টতই বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়াকে বাঁধা দিবে। এই সময়কালের মধ্যে যারা হত্যা হয়েছে, তাদের পরিবার,পরিজন কোন মামলা করতে পারবে না, আইনি কোন আশ্রয় পেতে পারবে না, হত্যার বিচার চাইতে পারবে না।
কথা হচ্ছে, যারা বিচার বিভাগ এবং পুলিশ বিভাগ সংস্কারের জন্য কমিশন গঠন করেছে, তারাই দেখা যাচ্ছে এমন একটি অধ্যাদেশ আনতে চাচ্ছে যা সম্পূর্ণ সংস্কারের পরিপন্থী কাজ হিসাবে বিবেচিত হবে।
একদিকে বিচার বিভাগ সংস্কারের কথা বলবেন আর অন্য দিকে বিচারের পথ বন্ধ করে দিবেন, সেটি কি স্ববিরোধী নয়?
একদিকে পুলিশ বিভাগ সংস্কারের কথা বলবেন আর অন্য দিকে মামলা নিতে বাঁধা দিয়ে আইনি প্রক্রিয়াকে বাঁধাগ্রস্ত করবেন, সেটি কি হিপোক্রেসি নয়?
আরেকটি ঝুঁকি হচ্ছে, এই অধ্যাদেশ পরবর্তী নির্বাচিত সরকারকে পার্লামেন্টে পাশ করার মাধ্যমে আইনে রূপ দিতে হবে। আইনে রূপ না দিলে অধ্যাদেশটি বাতিল বলে গন্য হবে। তখন এই সময়কালের হত্যাকান্ডের বিচার শুরু হবে, মামলাও হবে, গ্রেফতারও হবে।
এখানেই একটি বড় সন্দেহ এসে যায়, তাহলে কি এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তী নির্বাচনের আগে এমন একটি দলের সাথে সমঝোতা করে সেই দলকেই ক্ষমতায় বসাতে চাইবে যারা নির্বাচিত হয়ে এই অধ্যাদেশ পার্লামেন্টে পাশ করে আইনে রূপ দিবে যাতে করে জুলাই-আগষ্ট অভ্যুত্থানকারীদের দ্বারা সংগঠিত কোন হত্যাকান্ডের বিচার করা সম্ভব না হয়?
জনমনে এমন প্রশ্ন আসা কি স্বাভাবিক নয়?
স্কারবোরো, কানাডা
