
আমি বাবাকে কখনো জুতো পরতে দেখিনি ,না শীতে না বৰ্ষায় না প্ৰচণ্ড গরমে। আমার খুব ইচ্ছে হতো আমাকে স্কুলের ছুটির পর বাবা জুতো পরে নিতে আসুক কিংবা বাৰ্ষিক পুরষ্কারের দিনে আমার বাবা জুতো পরে আসুক,আমার বাবাকে প্ৰথম সারিতে বসতে দেয়া হতো ,আমি আমার ছোট্ট শরীরটা নিয়ে যখন প্ৰথম পুরষ্কার নেবার জন্য স্টেজে উঠতাম,মনে মনে চাইতাম হাত তালি দেবার সময় বাবা দাড়িয়ে যাক,আমি জুতো পরা সুন্দর একজড়ো পা দেখবো কিন্তু এটা আমার জীবনে কখনো ঘটেনি, আমি তখন বাবার পায়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে পানি ফেলতাম!
আবার যখন স্কুলের ছোট ক্লাসে ছিলাম খুউব ইচ্ছে হতো আমার অন্যান্য বান্ধবীদের বাবার মতো; আমাকে সাইকেলের সামনে বসিয়ে ছোট্ট রাজকন্যার মতো বাবা আমাকে সাইকেলে করে পক্ষীরাজের মতো ছুটে চলুক!
আমার কখনোই বাবার পিঠে ঘোড়া হয়ে বসা হয়ে উঠা হয়নি,কাঁধে নিয়ে আমাকে বাবা কখনোই ঘুরেনি ,মাঝে মাঝে ভাবতাম জুতো পরলে আমার বাবাকে কেমন দেখতে লাগবে ?
একটু বড় হবার পরে যখন ঈদের দিনে মাকে সালাম করে বাবার দিকে নিচু হতাম, বাবা দুহাত দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতো,”আমার ছোট্ট রাজকন্যা নিচে কেন ঝুকবে ? আয় তো বাবার বুকে আয়”। আমি সব কষ্ট ভুলে বাবার বুকে লেপ্টে বাবার ছোট্ট রাজকন্যা হয়ে যেতাম। মনে হতো বাবা জুতো পরতে পারে না তো কি হয়েছে ,আমার একটা বাবা তো আছে , ক’তো মানুষের যে বাবাই নেই। নাহ্, আমার বাবার পা ছিলোনা এটা ভাবলেই আমার কষ্ট বেড়ে যেত। আমাদের বাড়ীতে জুতোর আলনায় বাবা কি সুন্দর করে আমার জুতোগুলো সাজিয়ে রাখতো,সাথে মায়ের জুতোও,সেখানে কখনো বাবার জুতো ছিলোনা! একবার হয়েছিলো কি ? আমি নাকি তখন সবে হাঁটতে শিখেছি তারও বেশ কিছু পরে যার জুতো পেতাম তাই নাকি পরতে চাইতাম,কবে নাকি একদিন বাবার জুতো পরে পিছলে পরে গিয়েছিলাম, সেইথেকে বাবার জুতো আর আলনায় নেই, তবে মা খুব যত্ন করে আলমারিতে রেখে দিয়েছে ,মাঝে মাঝে সময় করে দেখে ,পরিস্কার জুতো তারপরও শাড়ীর আচঁল দিয়ে মুছে আবার রেখে দেয়।
আমরা কোথাও রিক্সা করে বেড়াতে গেলে খুব খেয়াল করে দেখতাম বাবা আগে উঠে হাত বাড়িয়ে দিতো মার দিকে আমাকে কোলে নেবার জন্য, তারপরে একহাত বাড়িয়ে দিতো মার দিকে যাতে মা উঠতে পারে,এবং আমাকে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রাখতো।কতোদিন মা বলতো,” আমাকে দাও, দ্যাখ আমি ঠিকই পারবো মেয়ে কে সামলাতে ।” বাবা বলতো,” তোমার কি মনে হয় আমি পারবো না ?” তখন মা আর কিছু বলতো না ,চুপ হয়ে যেত। আমি কখনো মাকে দেখিনি বাবার সাথে ঝগড়া করেছে কিংবা কোন কথা কাটাকাটি,আর বাবার বেজার মুখও কখনো দেখিনি তবুও বাবার জন্য আমার ভীষণ কষ্ট হতো । আসলে আমার বাবার কোন পা’ই ছিলোনা! স্বাধীনতা যুদ্ধে বন্দুকের গুলি এক পা দিয়ে আরেক পায়ের উপর দিয়ে চলে যায়, সময় মতো চিকিৎসা হয়নি বলে হাটুর নীচ থেকে দুটো পা’ই শেষ পৰ্য্যন্ত কেটে ফেলে দিতে হয় । বাবা কখনো আমাদের বুঝতেই দিতো না পায়ের অভাব, ক্ৰাচে ভর দিয়ে কি দিব্যি নিজের কাজকৰ্ম গুলো আস্তে আস্তে করে ফেলতো।
একটু বড় হবার পরে মুক্তিযুদ্বের কাহিনী বাবার মুখে শুনতাম , আমি শিহরিত হয়ে যেতাম, কি অসীম সাহস আর দেশের জন্য সত্যিকারের ভালোবাসা না থাকলে কেউ কি এমনটা পারে।আমার তো মনে হয় আমাদের দেশই বিশ্বে একমাত্ৰ দেশ যেখানে দেশের প্ৰকৃত সৈন্যবাহিনীর বাইরে সাধারন মানুষ এভাবে দেশের জন্য যুদ্ধ করে জীবন দিয়েছে। আসলে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধ কোন সামরিক অভিযান ছিলো না, এটা ছিলো একান্তই সাধারন শোষিত মানুষের এক ভীতিহীন লড়াই এর ইতিহাস । কি করে ধাপে ধাপে দখল হতে থাকা দেশকে মুক্ত করার জন্য এক কঠিন অংগীকারে আবদ্ধ হয়ে তিরিশ লক্ষ্য প্ৰাণ দেশের জন্য জীবন দিয়েছিলো । এ এক নজিরবিহীন ইতিহাস । আমি তখন নাকি মায়ের পেটে মাত্র তিন মাসের, একরাতে বাবা মাকে বললো যে কোনদিন বাবা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিবে।বিয়ে হয়েছে বছরও ঘুরেনি ,মার বয়স আর কতোইবা তখন ,ঠিকমতো তেইশও হয়নি,বাবা মাত্র বি,এ পাশ করে একটা স্কুলের চাকরীতে ঢুকেছে ,তখনই দাদার চাপে বাবাকে বিয়ে করতে হয়েছিলো নানাকে দেয়া দাদার কথার জন্য, উনারা ছোটবেলার বন্ধু ছিলো সেই সুবাধে কথা দিয়েছিলো একে অন্যকে,মার বিয়ের কিছুদিন পরেই নানার মৃত্যু হয় ।এখন এই অবস্থায় বাবাকে যেতে দিতে মন চাইছিলো না কিন্তু বাবাকে বাধা দেবার মতো সাহস মার ছিলো না , এক ভোরে মা ‘কে বড় মামার বাড়ীতে রেখে বাবা অবশেষে চলে গেলেন।
বাবা এপ্ৰিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে ২ নং সেক্টরে যোগ দিলেন,তখন মেজর কে,এম,খালেদ মোশারফ ছিলেন সেক্টর কমান্ডার । ২ নং সেক্টর ছিলো অন্যতম যুদ্ধবহূল সেক্টর। এখানেই রূমি সহ অন্যান্য ক্র্যাক প্লাটুনের জন্ম হয় মেজর খালেদ মোশারফের নেতৃত্বধীনে। এই সেক্টরটি ৬ টি সাব সেক্টর নিয়ে গঠিত হয়েছিলো যাতে কিনা নিয়মিত সৈন্যবাহিনীর সংখ্যা ছিলো ছয় হাজার আর প্ৰায় পয়ত্রিশ হাজার গেরিলা যোদ্ধা ছিলো ।প্ৰথমত বাবাকে ট্ৰেনিং এর জন্য পাঠানো হয়, ট্ৰেনিং শেষে বাবাকে সরাসরি যুদ্ধে পাঠানো হয় ।প্ৰথম দিন নাকি বাবার কিছুই মনে হয়নি ,শুধু খালেদ মোশারফ তাদের কে একমুঠো মাটি হাতে নিয়ে যে কথাটা বলেছিলো সেটাই মনে পড়ছিলো,আর এক আধলা মার মুখটা কেননা বেশী মনে করে নিজেকে নরম করতে চায়নি বাবা । তারপরের দিনগুলো ভয়ংকর ।
এদিগে মার কি যে দুশ্চিন্তা, খেতে পারেনা ,একে তো আমি বেড়ে উঠছিলাম কিন্তু মার না খাওয়া, দুশ্চিন্তার কারনে মা রুগ্ন হয়ে যাচ্ছিল। যে আটমাস বাবা যুদ্ধে ছিলো শুধুমাত্র একবার একরাতে কয়েকটা ঘন্টার জন্য এসেছিলো মাকে দেখতে আর সাবধানতা অবলম্বন করার জন্য বলতে। সেটা ছিলো অক্টোবরের দুই তারিখে যেদিন পাক সেনারা হোমনা থানা আক্রমন করার পরিকল্পনা করেছিলো । মা ক্রমাগত কেঁদেই চলছিলো বাবাকে দেখে ,কি রোগা হয়ে গেছে, মুখভৰ্তি দাড়ি আরো বয়স বাড়িয়ে দিয়েছে। কখনো খেতে পায় ,কখনো না , কোথায়, কখন কোন একশানে যাবে তার কোন ঠিক থাকেনা আগে থেকে । মাকে ঠিকমতো চিঠিও দিতে পারেনা। শুধু যাবার আগে বলেছিলো, “জানিনা ফিরে আসবো কি আসবো না তবে কথা দাও আমার কথা ভেবে তুমি আমাদের অনাগত সন্তানের যত্ন নেবে,আর যদি ছেলে হয় তবে নাম রাখবে স্বাধীন,মেয়ে হলে জয়ী।”
মা সে রাতে বাবাকে দেয়া কথা রেখেছিলো , আমি হয়েছি যুদ্ধের ভয়াবহ অবস্থায়, বাবা কোথায় আছে ,কেমন আছে ? বেঁচে আছে কি নেই কোন খোঁজ খবর নেই। মার কি উৎকন্ঠা, আমাকে মামী যত্ন করে আগলে রাখছে দিনরাত।
ঐদিকে বাবাকে পাঠানো হয় চন্দ্ৰপুর অপারেশনে নভেম্বর মাসের আঠারো তারিখে । পাঁচদিন ধরে চলে গেরিলা যুদ্ধ ,কিন্তু শেষের দিনে বাবা একটা ব্ৰিজের নীচে লুকিয়ে ছিলো ,শক্রপক্ষ অনেকটা কাছেই , বাবার বন্ধু জামিল চাচা বার বার বাবাকে বলছিলো সাবধানে এগুতে, বাবা তাই করছিলো কিন্তু পিছন থেকে পরপর দুটো গুলি এসে বাবার ডান পায়ের হাটুর নিচ থেকে বা পায়ে যেয়ে বিধেঁছিলো। প্ৰচুর রক্ত,আর সেইসাথে শক্রবাহিনী এতোটাই কাছে এসে পড়েছিলো বাবা শুধু ওদের কে বলছিলো বাবাকে ছেড়ে চলে যেতে। তারপরের কথা মনে নেই। পরে অন্যান্যদের কাছে শুনেছিলো জামিল চাচু এবং আরো ক’জনে মিলে ছয় মাইল বাবার অচেতন দেহটাকে বয়ে নিয়ে এসেছিলো । প্ৰচণ্ড জ্বর এবং সময় মতো চিকিৎসা না হওয়াতে প্ৰথমে বাবার বাম পাটা হাটুর নীচ থেকে কেটে ফেলা হয় এবং ডানপায়ে গাংগ্ৰিন হয়ে পা ফুলে পচে গিয়েছিলো । ২০ শে ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাবাকে জামিল চাচুরা এনে বাড়ীতে পৌঁছে দিয়ে যায় ,আমি তখন মোটে একমাসের শিশু!
২০০১ সালের ডিসেম্বরের কোন একদিন…
তারপর মাঝখানে অনেকটা বছর গড়িয়ে গেছে । আমি শুধু একটু বুঝতাম বাবার জুতোর থেকে বাবার নিঃশ্বাস আমার কাছে পরম পাওয়া, আমি এতোটা বড় হয়ে গিয়েছি তবুও আমার বাবার ছায়া আমাকে জড়িয়ে আছে রন্দ্ৰে রন্দ্ৰে এর চাইতে বেশী আর কি চাই। আজ আমার সাথে আমার পাঁচ বছরের ছোট্ট রাজকন্যাকে নিয়ে সাত বছর পরে দেশে ফিরছি ডিসেম্বরের ছুটিতে।আমার বিয়ে হয়েছে আট বছর হ’লো, স্বামী জৰ্জিয়াতে একটা ফাৰ্মাসিউটিক্যাল কোম্পানীতে চাকরী করতো, সব ভালোই চলছিলো, দু’বছর আগে ঠিক ক্রিসমাসের আগের এক সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরছিলো,পেছন থেকে এক ড্ৰাংক ড্ৰাইভার এসে সজোরে ধাক্কা মারে হাইওয়েতে ,টাল সামলাতে না পেরে সামনের গাড়ীকে বাচঁতে যেয়ে হাইওয়ের রেলিং এ বাড়ি খেয়ে অতিরিক্ত রক্তক্ষরনে মৃত্যু । তারপর আমার কি অবস্থা গিয়েছিলো জানিনা, চোখ খুলে যখন তিন বছরের পূৰ্ণ্যাকে দেখলাম তখন আর নিজেকে স্হির রাখতে পারিনি ।তারপরের দুটো বছর কি করে গেছে জানিনা, এখন শুধু মনে হয় আমার ছোট্ট পূৰ্ণ্যার জন্যই আমাকে বাঁচতে হবে। বাবারও একটু বয়স হয়েছে ,আমার কথা ভেবে আরো অসুস্থ্য হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন , তাছাড়া আমার মেয়েটাকে জন্মের পর থেকে দেখেনি। ওকে দেখলে আবারো বাবা আমাকে ফিরে পাবে আমি জানি।
বাড়ীতে কি যে আনন্দের বন্যা আজকে। মনে হচ্ছে আজ অনেক বছর পরে আমি চলে যাবার পরে এ বাড়ীতে আজ আনন্দ হচ্ছে শোকের ছায়া মাড়িয়ে। পূৰ্ণ্যাকে দেখে বাবা – মার সে কি আনন্দঅশ্রূ, মেয়েটা আমার ভালোই বাংলা বুজে, এ বছর স্কুল শুরূ করেছে ,বাবার মৃত্যুর পর খুউব কাদঁতো, এখন একটু বুঝতে পারে ।মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে ,” বাবা ,তুমি তো চুপে চুপে এসে আমাকে দেখে যেতে পারো, প্ৰমিস কাউকে বলবো না !” রাতে খেয়ে যখন আমরা বসেছি গল্প করতে, তাছাড়া টুকটাক যা এনেছি সব খুলছিলাম । আমার মেয়ে দৌড়ে একটা প্যাকেট নিয়ে এলো ওর ব্যাগ প্যাক থেকে; একটা মোড়ানে শপিং ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করছে মনে হচ্ছে । জানিনা কোন ফাঁকে ভরেছে ।বললাম, ” কি ওটা মামনি ?” ও ওর কোমড় পৰ্য্যন্ত রেশমী চুল দুলিয়ে টোলপড়া গালে হেসে বললো,” A secret gift for Nanu “. বাবার পাশেই মা বসে ছিলো ,আমি এসে পেছনে বসি ,দেখি শপিং ব্যাগ থেকে আমার মেয়ে ওর বাবার একজোড়া জুতো বের করে আমার বাবাকে পরাতে চাইছে, নীচু হয়ে ও নানুভাইয়ের পা খুজছে, আর না পেয়ে বলছে, ” Please NanuBhai ,show me your feet, don’t hide it, I can’t see nothing”.
বাবার চোখে আমি এই প্ৰথম পানি দেখলাম, বাবা কাদঁছে ,সেই সাথে মা ও কাঁদছে আর বলছে ,” যে পা তুমি খুঁজছো সে পা যে তোমার নানুভাইয়ের নেই সোনা আমার “,পূৰ্ণ্যা কিছু বুজতে না পেরে বলছে ,” আমি তো বাবার জুতোটা শুধুই নানুকে দিতে চেয়েছিলাম, now I understand why NanuBhai doesn’t wear shoes, because angels never wear shoes. ”
#গল্প( যুদ্ধের যে বৰ্ণনা দেয়া হয়েছে সব সঠিক তথ্যের অনুকরনে,জায়গার নাম এবং বিস্তারিত বৰ্ণনা কোনটাই কল্পনা না)
