
ইদানিং শুধু যে মুখ ও কলমকে মহা ধৈর্যের পরীক্ষায় সংযত রেখেছি, তাই নয়; অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত প্রতিহিংসাপরায়ণতার প্রতিক্রিয়ায় কারো কারো সুস্থির জীবনে নির্ঘুম অস্থিরতাও দেখছি, উপলব্ধি করছি। দেখছি চেনা মুখগুলোর কীভাবে হিংস্র রূপ ধারণ করে ভুলে যাচ্ছে অন্তত একদিনের সুখস্মৃতির নিটক অতীত।
বিজ্ঞান বলে – প্রতিটি ক্রিয়ার সমানুপাতিক বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। অতএব, ঢিল ছুঁড়লে পাটকেলটি খেতেই হবে। বিজ্ঞানের সঙ্গে একটি বিষয়ের বিরোধ আছে – সেটি হলো বিবেচনা। সংস্কৃতিবান সহনশীল মানুষের কাছে বিবেচনাই প্রধান। বুঝতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহজলভ্য হয়েছে বলেই আমার চারপাশের সবকিছু নিয়ে আমাকেই প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবেই কি? নাকি এক্ষেত্রে আমি বিবেচনা করবো, কোনটি আমার ব্যক্তিগত বিষয় ও কোনটি সামাজিকভাবে আলোচনা করার বিষয়।
দু’একটা উদাহরণ দিই। উদাহরণের মানুষগুলো আমার প্রিয়জন। তাই যতটুকু সম্ভব আকারে ইঙ্গিতে বুঝাতে চাই।
১৫ই আগস্টের জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে সংকটময় মুহূর্তে কয়েকজন মিলে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার আলোকেই অনেককেই সেই আয়োজনে যুক্ত করা যায়নি। আয়োজকদের একটি নামও তারা দিয়েছেন। এই অনুষ্ঠান, তাদের নাম নিয়ে যেসব সমালোচনা হয়েছে, তার উপযুক্ত জবাব দিতে গেলে অনেকের সঙ্গে চিরতরে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এমনকি আরো খারাপ কিছুই হতে পারে। তাই অনেককেই এইসব বিবেচনাহীন ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখানো থেকে নিজেদেরকে কঠোরভাবে সংযত রেখেছেন৷ কেন সংযত থেকেছেন :
এক : এইসব ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া দেখানোর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো দায়বদ্ধতার বিশ্বাস থেকে তাদের কাজ।
দুই : বর্তমান পরিস্থিতির কারণে যার যার রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিশ্বাস বহিঃপ্রকাশের ফলে সৃষ্ট দূরত্ব নিকট ভবিষ্যতেই কেটে যাবে। অতএব, এ নিয়ে দুর্ভাবনার কিছু নেই। কিন্তু…
তাই বলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদেরকে হুমকি দিতে হবে। যাচ্ছেতাই বলতে হবে। এসব সমর্থন করেও পোস্ট দিতে হবে! নিজেকে প্রশ্ন করেছেন : তাদের অধিকার চর্চায় আপনার অধিকার চর্চায় কোথাও কি বাঁধা হয়েছে?
এই শহরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি। আমি নিজে কোন রাজনৈতিক দলের সদস্য নই, কিন্তু বঙ্গবন্ধুর প্রতি আমার অদম্য আগ্রহ, শ্রদ্ধা, অপরিমেয় আবেগময় ভালোবাসা। তা সত্ত্বেও এই শহরের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গদের সঙ্গে সৌজন্যতার চেয়েও অধিক আমার সম্পর্ক। এবং এটা দীর্ঘ বছর থেকে। সে কোন রাজনৈতিক দলেরই হোক না কেন, আমাদের এই দীর্ঘ বছরের পারস্পরিক সম্মানজনক সম্পর্ক অটুট থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। একটা উদাহরণ দিই : আমার বন্ধু টুনু মিয়ার মৃত্যুর পর, পরিবারের বাইরে যে ভাইয়েরা তার দাফন ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতার জন্য সর্বান্তকরণে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেছেন, আমাদের প্রিয় এই ভাইদের রাজনৈতিক মতাদর্শ বা বিশ্বাসের চেয়ে তাদের কাছে মূখ্য ছিল চিরকালের মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিষয়, আর সেটা হলো মায়া, ভালোবাসা ও সম্মান। আমি বিশ্বাস করি, আমারও মৃত্যুর পর আমার এই ভাইয়েরাই সবকিছু তাদের কাঁধে তুলে নেবেন আমার মৃতদেহ!
এই শহরে আমি কাউকেই আমার প্রতিপক্ষ ভাবি না। রাজনৈতিক আদর্শে ভিন্নমত থাকতে পারে। আছেও।এই ভিন্নমতের মানুষদের সম্পর্কে আমার ধারণা স্পষ্ট ও সম্মানজনক। সারাজীবনে এদের সঙ্গে আমার এই সম্মানজনক সম্পর্কের কোন অবনতি হবে না।
কিন্তু….
জীবনের এই বয়সে এসে বুঝতে পারছি, কিছু কিছু বিষয় আমার কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলো আমার ভালোবাসা, অস্তিত্ব, আত্মপরিচয়ের স্মারক। এবং এগুলো যুক্তিনির্ভরতার চেয়ে বেশী আবেগময়। আমার কাছে এই আবেগ শুদ্ধতার অধিক। এই আবেগ পরাজয় মানে না। অর্থাৎ, এই আবেগে কোন পরাজয় নেই। ফাঁকা বুকে জেগে ওঠে জগতের বিস্ময় ও জয়।
এই নিয়েই তো আমি। শূন্য। একা। মুক।
টরন্টো, কানাডা
