
নিউমার্কেট গেলেই আমার ফুসফুস ও হৃৎপিণ্ড ভালো কাজ করে। কেউ হয়তো একথা বিশ্বাসই করবেন না। কিন্তু, ঘটনা সত্য। একটু বুঝিয়ে বলি : বিজ্ঞান বলে খুশিতে হাসলে হৃৎপিণ্ডের কার্যকারিতা ভালো হয়। ফুসফুস সুস্থ থাকে। সুমন রহমান এমনই একজন মানুষ যে, তাঁর তথ্যপূর্ণ নির্ভার জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ও প্রখর রসপূর্ণ গল্প যে কোন নিবিষ্ট শ্রোতাকে মুহূর্তেই আনন্দে ভরে দেবে।
প্রায় একুশ বছর আগে ২০০৩ সালে জাপান থেকে সুমন ভাই ভাবি দুই সন্তানকে নিয়ে টরন্টো এলেন। প্রায় কাছাকাছি সময় ঢাকা থেকে এলেন মাসুম রহমান। দু’জনেই অসাধারণ মানুষ। নিভিন্ন ঝর্নার ধারা যেমন ভাটিতে গিয়ে নদীর সাথে মিশে যায়, এঁরাও টরন্টো এসে প্রখ্যাত কবি ইকবাল হাসানকে খুঁজে বের করে করলেন। ইকবাল ভাই এই দুই সাহিত্যসংশ্লিষ্ট মানুষ পেয়ে চাঞ্চল্য বাড়িয়ে দিলেন। এবং স্বভাবতই ইকবাল হাসানের সঙ্গে, কান টানলে মাথা আসে সূত্রের মতো আমি তো আছি।
ঐ যে বললাম চাঞ্চল্য বাড়িয়ে দিয়েছেন! এর একটি ব্যাখ্যা দেওয়া ভালো। ইকবাল হাসান একজন কবি। উদ্দাম আর আনন্দপ্রিয় মানুষ। একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দ-আড্ডায় মেতে উঠতে শুধু একটা উছিলা লাগে। ইতিবাচক বা নেতিবাচক যাই হোক না কেন, একটা কারণ বা উছিলা তো থাকেই! অতএব, আনন্দ-আড্ডাও চলতে থাকে অবিশ্রান্তভাবে। এরই মধ্যে শামসুর রাহমান, সালেহ চৌধুরী, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, আসাদ চৌধুরী, লুৎফর রহমান রিটন, হুমায়ূন আহমেদ, জুয়েল আইচ, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ ইকবাল, ইমদাদুল হক মিলন, রাহাত খান, সৈয়দ হক, জাহিদ হাসান, শাওন, রিয়াজ প্রমুখের সঙ্গে তুখোড় আড্ডায় জানু হয়ে এসেছেন সুমন রহমান, বন্যা ভাবি ও মাসুম রহমান। ইকবাল হাসানকে আর পায় কে! আমিও আছি যথারীতি সাথে সাথে। আর সেই আড্ডায় বসলে সময়কে কান ধরে ওঠবস করিয়ে দুপুরকে সন্ধ্যায় আর সন্ধ্যাকে ভোরে পৌঁছে দিতে এঁদের জুড়ি নেই!
আর সুমন ভাই বন্যা ভাবির বাড়িতে গেলে ওদের সংগৃহীত হাজার হাজার গ্রন্থ দেখেই মনপ্রাণ ভরে যায়। কত অমূল্য গ্রন্থরাজী সুমন ভাইয়ের সংগ্রহে! এক্ষণ-এর কথা মনে আসে? নির্মাল্য আচার্য্য আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত শিল্প-সাহিত্যের এই বিখ্যাত কাগজটির প্রচ্ছদ এঁকে দিতেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। বাংলাদেশেও মীজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকার প্রচ্ছদ শিল্পী ছিলেন কামরুল হাসান। প্রতিটি এক্ষণ-এর প্রচ্ছদ আলাদা, অথচ প্রতিটিতেই এক আন্তঃপ্রবাহের যোগসূত্র। কাগজটির দর্শনে ও নাম অঙ্কনের ঐক্যে। এক্ষণ সাহিত্যের পুরনো কাগজ। অথচ, হাতে নিলেই সামনে এসে উপস্থিত হোন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, নির্মাল্য আচার্য্য ও সত্যজিৎ রায়। আল মাহমুদ বলতেন – কাগজের একটা গন্ধ আছে। সত্যিই তাই! বইয়েও গন্ধ আছে। এমনকি কোন কোন বইয়ে স্বয়ং লেখকের গন্ধ! এমনকি লেখকের অদৃশ্য ছবি; আমি তো দেখি!
কত দিনরাত যে আমাদের এভাবে কেটেছে! আহা, ইকবাল ভাই, আসাদ চৌধুরী অবধারিতভাবে এখনো আমাদের আড্ডায় প্রধান মানুষ হিসেবে উপস্থিত থাকেন৷ কালকে সুমন ভাই ও বন্যা ভাবির বাসায়ও হাজার হাজার বইয়ের ফাঁকে ইকবাল ভাই উঁকি দিচ্ছিলেন। বইয়ের তাকের কোণায় দাঁড়িয়ে নিবিষ্টমনে ‘অসম্ভবের পায়ে’ পড়ছিলেন আসাদ চৌধুরী! কী দেখছিলেন তিনি? প্রচ্ছদ ছাড়িয়ে সেই শিল্পীর মুখ! মুদ্রণের বর্ণ ছাড়িয়ে ওবায়দুল ইসলামের হাতের স্পর্শ!
জানি, আমরা যতদিন বেঁচে আছি, আমাদের নিবিড় কাছাকাছি থাকবেন আসাদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান। স্পর্শের বাইরে গিয়েও সান্নিধ্যের উষ্ণ তাপ ছড়িয়ে সারাজীবন তাঁরা থাকবেন আমাদের আত্মার কাছাকাছি!
টরন্টো, কানাডা

