
এক.
গত কয়দিন থেকে মাঝে মাঝেই বৃষ্টি হচ্ছে।
কখনো মুষলধারে আবার কখনোবা থেমে থেমে। আমার দেয়াল ঘেষা প্রতিবেশী এরিকার তখন বারবিকিউর নেষা ধরে। সিঙ্গেল মম বলে কথা। চাকরি – পোষা বেড়াল – রান্না সব কিছুই তাকে একা সামলাতে হয়। তার উপর ইদানিং বেড়েছে তার নয়া বয়ফ্রেন্ড দোয়েইনের উপদ্রব। বিকেলে বৃষ্টি নামলেই সে বারবিকিঊ খেতে চলে আসে। সাথে নিয়ে আসে তার বাচ্চাদেরও। দোয়েইনের দুই বাচ্চা এরিকার দুই বাচ্চার সমবয়সী। সব বাচ্চাদের ব্যাকইয়ার্ডের সুমিং পুলে নামিয়ে দিয়ে এরিকা আর দোয়েইন ফ্রি হয়ে যায়। পেটিওতেই চলে ওদের বারবিকিঊ। সাথে হাল্কা রক মিউজিক।
দুটি কপোত কপোতি বসে থাকে ঝুম ঝুম বৃষ্টির পাশে।
বৃষ্টি রিনিঝিনি শব্দে ওদের খুব আনন্দ হলেও আমার মনে আজ কেন যেন একটা অজানা দুঃখ। আজ এই দুঃখ ডেইভের জন্য। ডেইভ হচ্ছে এরিকার এক্স হাসবেন্ড।
আজ থেকে বিশ বছর আগে ডেভিড এবং এরিকা আমাদের দেয়াল ঘেষা এই পাশের বাসায় উঠে। তারুন্যদীপ্ত এই নবীন প্রতিবেশী পেয়ে আমরা খুব খুব খুশি হই। ওরা তখনো বিয়ে করেনি। বলল- বিয়ে করতে অনেক খরচের ব্যাপার। মাত্রইতো বাড়ি কিনলাম, এখনো বিয়ের কথা ভাবছিনা। এরপর চার বছরে দুবাচ্চা জন্ম নেয় ওদের। দেখতে দেখতেই বাচ্চারা স্কুলে যেতে শুরু করে। একদিন হঠাৎ দেখলাম ফুলে ফুলে সজানো লিমোজিন বাসার সামনে দাঁড়িয়ে। পড়ে জানলাম বার বছর সাফল্যজনক ঘর সংসার করার পর ওরা বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয় এবং খুবই ছোট এবং ঘরোয়া পরিসরে বিয়ে করে। বিয়ের সাত বছর পর সেই সংসারে ইস্তফা দেয় এরিকা। তার নাকি ‘কেন যেন ভাল লাগেনা’ রোগে ধরেছে। কি আর করা ভাল্লাগেনা রোগ নিয়ে তো আর এক ছাদের নিচে এক বিছানায় থাকা যায় না। তবে কোন ঝগড়া বিবাদ এবং কলহ ছাড়াই ওরা আলাদা হয়ে যায়।
আমার মতো এরিকারও নাকি ডেইভের জন্য দুঃখ হয়।
তাইতো আজও ডেইভের জন্য এরিকার দরজা খোলা। বাসায় আসতে কোন বারন নেই। শুধু রাত্রি যাপনের কোন অনুমতি বাদে। ওদের বিচ্ছেদের পর ডেইভ কাছাকাছি দূরত্বের একটি ভাড়া বাসায় উঠে। ডেইভ সপ্তাহান্তে এসে বাচ্চাদের নিয়ে যায় তার কাছে। সময় বয়ে যায়। এরিকা বিচ্ছেদের দুদিন পরই দোয়েনকে নিয়ে নেয় নয়া বয়ফ্রেন্ড হিসেবে। কিন্তু ডেইভ একা – বাচ্চারাই তার আদরের ধন। এরিকার ভাষায় –
: তার বন্ধবী জুটানোর মুরোদ নেই। তাই সে একা। আমি অনেক খুঁজে আমার এক বন্ধবীর ছোট বোনকে ডেইভের জন্য জোগাড় করে দেই। কিন্তু মাত্র তিন মাস। তারপর সেও তাকে কিক আওট করে। ডেইভ ভাল মানুষ। কিন্তু এই গুন দিয়েতো আর সংসার টিকানো যায় না। সংসার টিকাতে আরো অনেক কিছু দরকার হয়।
আমি জানিনা আরো অনেক কিছু বলতে কি বুঝাতে চেয়েছে এরিকা।
সিল্ডেনাফিলের এই যুগে মুরোদ নাই কথাতো ধুপে টেকে না। তাহলে অজানা কি জিনিস যা ভাল্লাগেনা রোগের কারন? তাহলে কি সময়ের সাথে স্থান- কাল – পাত্র এবং মন সবই সবই পরিবর্তিত হয় এই নশ্বর পৃথিবীতে!!
দুই.
# মেইসন এবং তার ম্যান্ডারিন বউ #
আমি তাকে চিনি খুব ছোট বেলা থেকে। উচ্চ শিক্ষিত অধ্যাপক বাবার একমাত্র ছেলে। উচ্চবৃত্ত মা বাবার অতি আদরের সন্তান হলেও খুবই মিতব্যয়ী এবং সাংসারিক ছেলে। যথেষ্ট পরোপকারীও বটে। ফেসবুকের হোম পেজে তার একা কোন ছবি নেই। সবই বন্ধুদের সাথে কিংবা পরিবারের সাথে। নিজেকে সে কখনোই স্বার্থপর ভাবতে পারে না। তাই সামাজিক মাধ্যমে শুধুই নিজের ছবি দিতে তার বিবিকে বাধে।
চোখের তরতর করে বেড়ে উঠে মেইসন।
ওয়াটারল্যু ইউনিভার্সিটি থেকে খুব সিমীত মার্ক নিয়ে পাশ করলেও সে চান্স পেয়ে অ্যাপল এর ক্যালিফোর্নিয়া হেড অফিসে। তার খুশির আর সীমা নেই। বন্ধুদের বলতে থাকে –
: দ্যাখ ওস্তাদের মার শেষ রাতে।
প্রায় সাত আট বছর আগের কথা।
ঘুরে বেড়াচ্ছি ফেসবুকের ছাদ বাগানে। বিশাল আকারের ভবনের ছয়তলার উপর কিলোমিটার লম্বা ছাদ বাগান। মনে হয় একটি খোলা উদ্যান। মেইসন সারাক্ষণই ব্যস্ত আমাদের ছবি তুলতে। ডেকে নিয়ে যাচ্ছে, এখানে, ওখানে এবং যেখানেই নাওস সিনিক ভিউ সেখানে। তবে সে নিজের ছবি তুলেছে শুধুমাত্র একটি। তাও বন্ধুকে নিয়ে গ্রুপ ছবি। আমি তার আতিথেয়তা দেখে এতই মুগ্ধ হয়েছিলাম যে, পরবর্তিতে তার ক্রস- বর্ডার ট্যাক্স প্রিপেয়ার করে দেই কম্লিমেন্টারি হসেবে, কোন ফি ছাড়া।
ভাল ছেলে বলে কথা।
বাবা মায়ের কথা মতো সে চায়না গিয়ে অতি সুন্দরী গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করে আনে। মেয়ে কথা বলে ম্যন্ডারিন ভাষায় – আর মেইসন সাধারন চাইনিজ ভাষা। অনেকটা সিলেটি আর বাঙ্গালী কথায় যেমন পার্থক্য আছে সে রকম। আমার বাচ্চাদের যখন এদেশে আসার পর স্কুলে ভর্তি করি তখন তাদের বাঙ্গালী টিচিং এসিসট্যান্ট দেয়া হলো। কিন্তু বাচ্চারা জানাল এসিস্ট্যান্ট এর কথা ওরা কিছু বুঝে না। পরে জানা গেল সে মেয়ে সিলেটি ভাষায় বাংলা বলে।
মেইসনের অবস্থাও অনেকটা সে রকমের হলো। বউ চায়নায় তার গ্রামের কলেজ থেকে বিএ পাশ। ইংরেজি কিছুটা জানলেও মুখে বলতে পারেনা। আবার চায়নিজও ভাল বলতে পারে না, পারে ম্যন্ডারিন। তাও থেমে নেই মেইসনের সংসার, চলছে ভালই। অল্প সময়ের মধ্যেই এক বাচ্চা, এবং বছর না ঘুরতেই আরেকটি। মেইসনের শান্তনা অন্ততঃ সংসারি বউ পেয়েছে। তার উপর অসম্ভব রূপবতী। তার আর আনন্দের শেষ নেই।
সূখ – দুঃখ নাকি যমজ। লেগে থাকে গায়ে গায়ে।
মেইসনকে একটি ডিপার্টমেন্টাল তদন্তের স্বার্থে অ্যাপল থেকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয় দশ দিনের জন্য। সে এখন মহা খুশিতে। সুন্দরী বউ এবং আদরের বাচ্চাদের সময় দিতে পারছে। তবে সে বুঝতে পারেনি যে এই ছুটিই হবে অ্যাপলে তার শেষ ছুটি। তার ম্যানেজার বলেছিল ওরা একটু ডিটেইলড জানবে এবং হয়ত সব ঠিক হয়ে যাবে। না কিছুই হয়নি – দশ দিনের মাথায় সে এক্সপ্রেস মেইলে একটি সুন্দর প্যাকেট হাতে পায় যাতে একটি ধন্যবাদ সূচক চিঠি এবং বড় অঙ্কের চেক ছিল। চায়না থেকে প্রকাশিত চাইনিজ পত্রিকার একটি সাক্ষাৎকার অনেকদিন পর কর্তৃপক্ষের হাতে আসে। কে জানত অ্যাপলে চাকরি পাওয়া কতটা কঠিন এবং পেতে হলে কি করতে হয় সে সংক্রান্ত তার একটি সাক্ষাৎকারই তার জীবনে অন্ধকার নামিয়ে দিবে। তবে শুধু সাক্ষতকারই নয়, তার সাথে যোগ হয়েছিল তার একটি সামাজিক মাধ্যমে গ্রুপ এক্টিভিটিজ। যেখানে সে অন্যান্য চাইনিজদের শিখাত, কিভাবে অ্যাপল সহ সিলিকন ভ্যালির অন্যান্য সফটওয়্যার কোম্পানিতে সহজে চাকরি পাওয়া যায়। কে জানে হয়ত এই পরোপকারই তার কাল হয়েছে।
জানা যায়, অ্যাপল – ফেসবুক – টেসলা সহ অধিকাংশ উদিয়মান কোম্পানি অ্যাপ্লয়িজ মিডিয়া এপিয়ারেন্স এবং পাবলিসিটির ব্যপারে খুব কঠোর অবস্থানে। তারা কনফিডেন্সিয়েলী এ ব্যাপারে খবর রাখে। তবে একমাত্র মাইক্রোসফট এ ব্যপারে উদার এবং সহায়ক।
মেইসন এখন আর নিজ গৃহে পরবাসী।
তার বাবার দেয়া ডাউন-পেমেন্টে যে বাড়ি সে কিনেছিল জিবনের শুরুতে, আজ সে সে বাড়ির গ্যারাজে ঘুমায়। চাকরি চলে যাবার পর তার বউ হয়ে যায় তার বস। সে এখন ইংরেজি শিখেছে, এখানে কিছু কোর্স করে ছোটখাট একটি কাজও পেয়েছে। বউ এখন কর্মজীবী স্বাবলম্বী মহিলা। জেইসন এটা সহজ ভাবে নিতে পারে না। তাই বিভেদ বাড়তে থাকে দিন দিন। এই গৃহ বিবাদ এবং অশান্তির কারনেই হয়ত তার পরবর্তিতে পাওয়া আমাজনের চাকুরীটিও চলে যায়। এক পর্যায়ে তার বউও সেপারেশনে চলে যায়।
সে এখন সেপারেশনে থেকেও বউয়ের সাথে সমঝোতায় এসেছে, যেন তার বাচ্চাদের কাছাকাছি তাকে থাকতে দেয়া হয়। সমাধান হচ্ছে বাসার গ্যরাজে বিছানা পাতা। মেইসন তাই করেছে। সে ভেবেছে সে আগামী বছর পাচেক কোন চাকুরী আর নেবেনা, বরং বাচ্চাদের লালান পালন করবে। তার ভাষায়, বাচ্চাদের তার মত ভাল মানুষ বানাবে।
আহা!
কতইনা বিচিত্র এই মানুষ্য জাতি এবং তার যাপিত জীবন।
তিন.
তিন যুগ আগের কথা।
আমার জীবনে প্রথম বিমান ভ্রমন। এক অস্ফুট আনন্দ – অজানা অনুভূতি। জাতিসংঘের আমন্ত্রিনে সরকারি সফর এবং ট্রেনিং। অফিসের গাড়ি এসেছে আমার কাঠাল বাগানের বাসায়। কলিগদের কেউ কেউ বিদায় দিতে বাসায় এসেছে। বন্ধুদের মধ্যে শুধু টিপু। আমাকে রাত নয়টার মধ্যে এয়ারপোর্টে বিদায় দিয়ে সবাই বিদায় ফিরেছে বাসায়। রাতের ফ্লাইট – বাংলাদেশ বিমান। রাত সাড়ে এগারটায় বিমান আকাশে উড়বে। বসে আছি উইন্ডো সিটে। কিভাবে বিমান আকাশে উড়ে দেখব বলে অজনা কৌতোহল। কিন্তু না বিমান আর উড়ছে না। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি। পাইলট ঘোষণা দিচ্ছে বিমানের যান্ত্রিক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষ হতে আরো সময় লাগবে তাই অপেক্ষা। আমার কিন্তু জানলা দিয়ে শ্রাবনের বৃষ্টি দেখতে ভালই লাগছে। রাত একটার দিকে আমাদের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের বিমান আকাশে উঠল।
জাতিসংঘের আমন্ত্রন এবং অর্থায়নে ভ্রমন বলে আমাকে পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ফ্লাইটে উঠতে হয়েছিল। জাতিসংঘের নিয়ম অনুযায়ী যে দেশ থেকে ফ্লাই করবে বিমান সে দেশেরই ফ্লাইট ব্যবহার হবে। বিমানের অনেক দূর্নাম শুনলেও আমার কাছে বাংলাদেশ বিমানের আতিথেয়তা অসাধারন লেগেছে। যদিও সময় নিয়ে সমস্যা হওয়ায় আমি লন্ডনে গিয়ে সুজারল্যান্ডে যাওয়ার কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে পারিনি।
জীবনের প্রথম ভ্রমন – তাতেই এই বিভ্রাট।
লন্ডনে গিয়ে ফ্লাইট না পেয়ে একটু হত বিহ্বল হয়ে পড়ি। এদিকে অন্য এক বাড়তি বিপদ। এক সদ্য বিবাহিতা বাংলাদেশী মহিলা সে যাবে জার্মেনীতে তার স্বামীর কাছে। তার মুখে ইংরেজি বের হয় না এবং কিভাবে কানেক্টিং ধরবে তাও জানেনা। কি আর করা শেষ পর্যন্ত নিজে জন্য পরবর্তী ফ্লাইটে টিকেট পেলাম এবং ভদ্র মহিলাকে জার্মেনীর কানেক্টিং এ পৌছে দিলাম।
আমি যখন বৃটিশ এয়ারের ফ্লাইটে সুজারল্যান্ডের জেনেভা এয়ারপোর্টে পৌঁছালাম তখন রাত প্রায় নয়টা। লোকাল ফ্লাইট বলে খাবারের তেমন কোন আয়োজন ছিল না। পেট খিদায় চো চো করছে। কিন্তু উপায় নেই। লাগেজ বেল্টে দাঁড়িয়ে থেকে এক সময় যখন হয়রান হয়ে গেলেও আমার লাগেজ পাইনি। দুশ্চিন্তায় শরীর ঘামতে থাকে। পরে বৃটিশ এয়ারের কাউন্টারে গেলে ওরা অভয় দেয় এবং একটি সুন্দর ব্যাগ হাতে ধরিয়ে দেয়, যাতে হোটেলে গিয়ে সাময়িক ব্যবহারের সব জিনিসপত্র ছিল। আজকাল আর হয়ত এরকম সুবিধা আর দেয় না। রাতে হোটেলে পৌঁছে খেয়ে দেয়ে এক ঘুমেই সকাল।
সকালে ঘুম ভাঙ্গে দরজায় ঠক ঠক আওয়াজে।
দেখি এক বিশাল দেহী ভদ্রলোক আমার লাগেজ হাতে দাঁড়িয়ে। বর্ষন মূখর এক রাতে জীবনের প্রথম বিমান ভ্রমন।
বিচিত্র এক অভিজ্ঞতা –
তবে অবশ্যই ভয় এবং আনন্দ ছিল পাশাপাশি।
উইন্ডসর, কানাডা



