
এক
রাত সাড়ে আটটা নাগাদ ইকবাল হাসান ফোন দিয়ে আমাকে জিগ্যেস করলেন- কাজ শেষ হলো কি না। আরো বললেন হাসপাতালে তাকে দেখতে সুমন রহমান ও ভাবি এসেছেন। আমার অপেক্ষা করছেন সবাই। এমনিতেই ঐ রাতে কাজ শেষ করে ইকবাল ভাইকে দেখতে যাবো, এরকমই আমার পরিকল্পনা ছিল। ফোন পেয়ে আমিও বুঝে গেলাম ইকবাল ভাই আমাকে ডাকছেন। মাইকেল গ্যারন হাসপাতালের উত্তর পূর্ব দিকের এক অত্যাধুনিক কক্ষ ইকবাল ভাইকে বরাদ্দ করা হয়েছে। উঁচ তলার এই কক্ষ থেকে টরন্টো শহরের বিশাল এক অংশ অনুমান করা যায়৷ হাজার লক্ষ বাতির আলোর বিচ্ছুরণ কোথাও কোথাও ঢেউ সৃষ্টি করেছে বলে ভ্রম হয়। রাজ রাস্তার গাড়িগুলো হঠাৎ আলোর ঝলকানি দেখিয়ে দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলে যাচ্ছে দ্রুত। কে এলো, কে চলে গেল, ঠাহর করাই মুশকিল! তবু, আমরা দেখি কেউ কেউ চলে যায় হেঁটে হেঁটে গলিপথ দিয়ে। কেউ বা দ্রুতযানে। কে জানে, এদের মধ্যে কেউ কেউ হয়তো কবিতার জন্য বাড়ি থেকে শহরে গিয়েছেন। ছোট শহর থেকে রাজধানী শহরে। এমনকি এক দেশ থেকে আরেক দেশে।
দুই.
কবিতা বলতে কি শুধু পদ্য! না, তা নয়। কবিতা বলতে তো পূর্ণতা। যেমন পূর্ণ থাকে কনিয়াক। হীরার টুকরো। যেমন পূর্ণ ভাবি ঈশ্বর আল্লাহ ভগবান। কবিতা তো তাই! এই যে প্রতিদিন শত শত রাস্তা দিয়ে হাজার লক্ষ মানুষ ছুটে চলেছেন- প্রত্যেকেরই হয়তো নিজের মতো করে একটা পূর্ণতার অভীপ্সা আছে। ইকবাল ভাইয়ের মধ্যে পূর্ণতার কি অভীপ্সা ছিল, গভীরভাবে জানতে পারিনি। কিন্তু, নিজের লেখা কবিতা নিয়ে কোনদিন একটি শব্দও উচ্চারণ করতে দেখিনি তাঁকে। কোন কবিতা কেউ পছন্দ করলে সেই কথাটি বলতেন। মাইকেল গ্যারন হাসপাতালে পৌঁছার পর ইকবাল ভাইয়ের কক্ষে সুমন ভাই ও ভাবি কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাড়ি রওয়ানা দিলেন। তাঁরা যাবেন আরেক দূরের শহর নিউ মার্কেটে। তাঁরা দু’জন চলে যাবার পর কক্ষে রইলাম আমরা তিনজন। দিনরাত অবিশ্রান্ত পাশে থাকা কবির প্রিয়তমা স্ত্রী কবি-লেখক তসলিমা হাসান ও আমি। তসলিমা ভাবি প্রাণ উজাড় করে ইকবাল ভাইয়ের সেবা করেছেন। একজন নারীর মধ্যে যা কিছু সেবা ও ভালোবাসা থাকে সবই ঢেলে দিয়েছেন ভাবি ইকবাল ভাইয়ের সেবায়!
তিন.
ঐ যে বলছিলাম, কোন কোন কবিতা কারো পছন্দ হলে অথবা সেই কবিতাটি নিয়ে মজা করলে সেই গল্পটি বলতেন উৎসাহ নিয়ে। একবার ইত্তেফাকে ‘শীত’ শিরোনামে ইকবাল ভাইয়ের একটি কবিতা ছাপা হয়েছে। ইকবাল ভাই সেদিন ইত্তেফাক ভবনে কাজে গিয়ে জানলেন কবি রফিক আজাদ তাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ইকবাল ভাই কবি রফিক আজাদের কক্ষে গিয়ে দেখেন চেয়ারের উপর দুই পা তুলে হাঁটু মুড়ে চাদরে নিজেকে ঢেকে বসে আছেন রফিক আজাদ। বিস্মিত ও উদ্বিগ্ন ইকবাল হাসান জিগ্যেস করলেন – কী হয়েছে রফিক ভাই! শরীর খারাপ? জ্বর এসেছে?
না, বেটা! ইত্তেফাকে শীত নামের একটি কবিতা পড়ে এমন ঠাণ্ডা লাগছে! শরীর রীতিমতো কাঁপতেছে!
ইকবাল হাসান বুঝে গেলেন রফিক আজাদ শীত কবিতাটি নিয়ে মজা করছেন। এরকমই আরেকদিন রফিক আজাদ ডেকে পাঠিয়েছেন ইকবাল ভাইকে। রফিক আজাদের কক্ষে গিয়ে দেখেন তিনি পুরোপুরিভাবে সমস্ত কাপড়চোপড়সহ ভেজা। ইকবাল হাসান তড়িঘড়ি করে জিগ্যেস করলেন – কী হয়েছে রফিক ভাই, আপনি এরকমভাবে ভেজা কেন?
বেটা মহাদেব সাহার বৃষ্টি শিরোনামের একটা কবিতা পড়লাম আজকে ইত্তেফাকে। এই কবিতা পড়ে তো আমি রীতিমতো ভিজে সয়লাব!
চার.
এইসব গল্প শেষ হলো যখন, তখন ঘড়িতে রাত দুটো। নার্সের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে অক্সিজেন ও ঔষধ পত্রের যন্ত্রপাতি সহ ইকবাল ভাইয়ের বিছানাকে ঠেলে বারান্দায় নিয়ে এলাম। একেবারে হাসপাতালের পশ্চিম পাশে এসে জানালার পাশে থেকে আমরা দুজন শহর দেখছিলাম। ইতোমধ্যেই ইকবাল ভাই বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠেছেন। তাঁর মলিন মুখেও একটি স্মিত হাসির রেখা ও উজ্জ্বল বিভা ফুটে উঠলো।
ইকবাল ভাই চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পী হতে৷ শিল্পী হতে পারেন নি বলে দুঃখবোধ থাকলেও শিল্পী ও শিল্পীদের কাজ নিয়ে ইকবাল ভাইয়ের আগ্রহ ছিল আমৃত্যু। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের অনেক অগ্রগণ্য শিল্পীর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তিনি। বারংবার আমি তাগাদা দিচ্ছিলাম এই সাক্ষাৎকারগুলো দিয়ে একটা বই করতে। ইকবাল ভাই পছন্দ করতেন কিবরিয়ার কাজ। কিবরিয়া যে অনেক বড় আধুনিক শিল্পী – সেটা প্রায়শই বলতেন। মনিরুল ইসলাম ও শহীদ কবীরের কাজও খুব পছন্দ করতেন। আশ্চর্য হতেন পিকাসোর প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে নতুন প্রকাশে। রঙে, রেখায়, ভাবনায়, প্রকাশের ভিন্নতায়। পৃথিবীতে আর দ্বিতীয় কোন শিল্পী নেই, যিনি নিজের অর্জিত সাফল্যের ফর্মকে প্রতিনিয়ত ভেঙ্গেচুরে নতুন প্রকাশেও নিজেকে চূড়ান্ত সাফল্যে পৌঁছে দিয়েছেন। অথবা নিজেকে উত্তোলিত করেছেন।
খুবই ভালোবাসতেন দালিকে। সালভাদর দালীর বাড়িতে সরেজমিনে সব দেখার জন্য তিন বছর আগে থেকে ইকবাল ভাই নানা পরিকল্পনা করছিলেন। সহসা ঘড়িতে দেখি ভোর পাঁচটা বাজে৷ এর মধ্যে নার্স দু’একবার ইকবাল ভাইয়ের অক্সিজেন দেখে গেলেন। পৌনে ছয়টায় বরাদ্দকৃত কক্ষে নিয়ে গেলাম। এরই মধ্যে তিনি চোখ বন্ধ করে ঘুমে চলে গেলেন। ভোরে তাঁকে ছেড়ে আসার সময় মনে হলো আর কয়দিনইবা ইকবাল ভাই আমাকে স্মরণ করবেন! এই যে আমি সারারাত তার সান্নিধ্যে থেকে ভোরের আলোয় আবার আসবো প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাড়ি ফিরে যাচ্ছি, তাঁকে হাসপাতালে রেখে, অন্তত এই আশায় যে, ইকবাল ভাই এখনো বেঁচে আছেন!
সত্যিকার অর্থেই যদি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে তো আর তাঁকে দেখতে পাবো না। কিন্তু কোনদিনই কি তাঁকে আর দেখতে পাবো না! সত্যিই কি তাই!
ভাগ্যিস ইকবাল হাসান জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলেই তাঁর সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। আজ জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করি গভীর ভালোবাসায়।
শুভ জন্মদিন ইকবাল ভাই।
টরন্টো, কানাডা
