ক্র্যাকার্স

ক্র্যাকার্স

তানিয়া পরের সারাটা দিন গ্রোসারি স্টোরে কাটাল। ঘুরে ঘুরে সে মাছ, মাংস, আটা, ময়দা, চিনি এসব নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনাকাটা করলো। কিছু তাজা ফল আর সবজি নিলো। পার্টির জন্য ক্র্যাকার্স, পটেটো চিপস আর আরও কিছু স্ন্যাকস কিনলো। এবার সে শামীমকে দিয়ে গ্রিল করাবে। এবারের পার্টিটাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য যা যা করার সবকিছু করবে সে।

কেনাকাটার সব শেষে এসে তার কেকের কথা মনে পড়লো। বিবাহ বার্ষিকী হবে আর কেক থাকবে না এটা তো হতেই পারে না। কেক কেনার জন্য সে বেশ কয়েকটা দোকান ঘুরে সবচেয়ে সুন্দর আর বিশাল একটা কেকের অর্ডার দিয়ে রাখলো।

- Advertisement -

পার্টির প্রস্তুতির এই উত্তেজনা নিয়ে সে একসময় বাড়ি ফিরল। বাজারের জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখলো। তারপর আবার সে কিছু ড্রেস কেনার জন্য বের হলো।

এবারের বার্ষিকীর জন্য সে শামীমের জন্য একটা পাঞ্জাবী বেছে রেখেছে। এখনই পাঞ্জাবীটা না আনলে পরে আবার ভুলে যেতে পারে। তাছাড়া নিজের জন্যও একটা ড্রেস কিনবে বলে ঠিক করে রেখেছে। নিজের ড্রেসের কথায় তার নিজের ওজনের কথা মনে পড়ে গেল। এই শরীরের জন্য মনের মতো কোনো ড্রেস সে পাবে না। আর ঘটলোও ঠিক তাই। দোকান ঘুরতে ঘুরতে সময় কেটে গেল, কিন্তু কোনো জামাতেই নিজেকে ভালো লাগলো না।

শেষমেষ বুঝতে পারলো এই ওজনে তানিয়া আর আগের মতো সুন্দরী না। এই অসুন্দর মেয়েটাকে শামীম আর কী করেই বা ভালোবাসবে? সাথে সাথে মনটা তার খারাপ যাওয়ায় ড্রেস না কিনেই বাড়ি ফিরলো।

সন্ধ্যাবেলা শামীম বাসায় ফিরে দেখলো তানিয়া সোফায় বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

“কী হয়েছে?” শামীম দ্রুত তার পাশে বসে উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করল।

তানিয়া কান্না থামাতে পারছিল না, কথাও বলতে পারছিল না।

“উফ! হয়েছেটা কী বলবে তো? শরীর খারাপ লাগছে?  কী হয়েছে?” শামীমের কণ্ঠে উদ্বেগ।

“তুমি এখন কীভাবে আমাকে ভালোবাসবে?” তানিয়া ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললো। “ আমি এখন এত মোটা হয়ে গেছি। দেখতেও আর আমাকে ভালো লাগে না। আমি কিছুতেই তোমার যোগ্য নই এখন।”

“এসব কী বলছো?” শামীম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল। “তুমি মোটেও মোটা বা কুৎসিত নও। গত তিন মাসে তোমার শরীর অনেক বদলেছে। আর এটাই তো স্বাভাবিক, তাই না? কিছুদিন পর ঠিক হয়ে যাবে। আর তাছাড়া তুমি এখনও সুন্দর।”

“আমি আজ নতুন একটা ড্রেস কিনতে চেয়েছিলাম,” তানিয়া কান্নারত গলায় বলল। “কিন্তু প্রতিটা ড্রেসে নিজেকে কী যে ভয়ানক লাগছিল! তুমি নিশ্চয় এখন আর আমাকে দেখতে পারো না। আমার নিজের কাছেও নিজেকে খারাপ লাগছে।”

“ওহ, তানিয়া,” শামীম দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকে জড়িয়ে ধরল। “তোমার শরীর এখন হরমোনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এমনটা তো খুব স্বাভাবিক। ডাক্তারের ওষুধগুলো নিয়মিত খাচ্ছো তো?”

“না। আমার কোনে ওষুধ খেতে ভালো লাগে না। আর আমি জানি এন্টিডিপ্রেশেন্টের ওষুধ আমাকে আরো মোটা বানিয়ে দেবে।”

“তানিয়া! আমার দিকে তাকাও।” শামীম তার মুখের দুই পাশে হাত রেখে বলল। “তুমি মোটা নও। তুমি কুৎসিতও নও। তুমি এখনও ঠিক ততটাই সুন্দর, যতটা আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম। নিজেকে এভাবে কষ্ট দিও না।”

তানিয়া ধীরে ধীরে শান্ত হলো। সে মাথা নাড়ল। “আমি চেষ্টা করব। আমি নিজেকে বারবার বোঝাচ্ছিলাম মন খারাপ না করতে, কিন্তু পারি নি। আমি তোমার জন্য সুন্দর হতে চাই— বিশেষ করে আমাদের বার্ষিকীতে। আমি চাই সবাই দেখে যেন বলতে আমরা এখনো পার্ফেক্ট ম্যাচ।”

“আমরা সবসময়ই পার্ফেক্ট ম্যাচ, তানিয়া।” শামীম তার গালে চুমু খেয়ে বলল। “তুমি অন্যদের ভাবনা নিয়ে এত ভাবো কেন? তুমি একজন বুদ্ধিমতী, সুন্দর এবং শক্তিশালী নারী। এমনকি যখন তুমি নিজেকে সুন্দর মনে করো না, তখনও তুমি সবার চেয়ে হাজার গুণ সুন্দর।”

তানিয়া চোখের জল মুছে মৃদু হাসল। “ তোমাকে না পেলে আমার কী যে হত! এই জীবনে তো আমার কেউ ছিল না। তারপরই তুমি এলে আর আমার সবকিছু বদলে গেল। ”

শামীম উঠে দাঁড়াল। “আচ্ছা তুমি এখন একটু বিশ্রাম নাও। আমি ফ্রেশ হয়ে আসি। মনে রেখো, এখনও তোমার শারীরিক অবস্থার তুলনায় অনেক বেশি কাজ করছ।”

তানিয়ার মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল। “আমাদের যা হয়েছে, তা আমাদের দুজনের ওপরেই প্রভাব ফেলেছে, আর এটাই স্বাভাবিক, তাই না? ”

“অবশ্যই,” শামীম বলল। “ক্ষতিটা তো আমাদের দুজনেরই হয়েছে। তবে শারীরিকভাবে দখলটা তোমার উপর দিয়েই গেছে। তাই তোমার কষ্টটা হয়তো আমার থেকে অনেক বেশি।”

“তুমি কি আমাদের এই ক্ষতিটা অনুভব করো না? আমাদের সন্তানের কথা?” তানিয়া জিজ্ঞেস করল।

শামীম কোনো কথা বললো না।

“শামীম?”

“আমিও তোমার মতোই বিধ্বস্ত হয়ে আছি তানিয়া। কেবল সেটা প্রকাশ করতে পারছি না,” তানিয়াকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য সে মিথ্যে উত্তর দিলো।

তানিয়া মাথা নাড়ল। তার চোখে স্বস্তির ছাপ দেখা গেল।

“আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি, সোনা। তুমি একটু বিশ্রাম নাও,” শামীম ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেল।

অধ্যায়- ৫

শামীম তরকারিটা চুলায় বসাবার সময় নিজের ওপর বিরক্ত হচ্ছিল। তানিয়াকে বলেছে রান্নাঘরে না আসতে। ওর বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু ওকে শান্ত করার জন্য শামীমকে মিথ্যে বলতে হয়েছে। সন্তানের কথাটা একেবারেই মিথ্যে। সন্তানের জন্য ওর ভেতর কোনো হাহাকার কাজ করছে না।

সিঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে শামীম জানালার বাইরে তাকিয়ে শায়লাকে ওর রান্নঘরে দেখতে পেলো। দূর থেকেই দুজনের দৃষ্টি বিনিময় হলো। শামীম হাত নাড়লো। শায়লাও হাত নেড়ে চুমু দেয়ার ভঙ্গি করলো।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেয়ে শামীম ভড়কে গেল।

“শায়লাকে হাত নাড়ছো?”

তানিয়া যে কখন রান্নাঘরে এসে প্রবেশ করেছে সে টের পায়নি।

“ওহ!” তানিয়া মাত্র কয়েক ইঞ্চি দূরে দাঁড়িয়ে। “তুমি আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে।”

তানিয়ার কঠোর চাহনি দ্রুত নরম হয়ে গেল। “ স্যরি। আমি দেখতে এসেছিলাম তোমার কোনো সাহায্য লাগবে কি না।”

“এত বেশি চিন্তা করো না তো, তানিয়া। তোমার এখন পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া উচিত,” শামীম বলল। কথাটা বলার পরই তার মনে হলো সে বারবার শুধু একটা কথাই বলছে।  “তুমি একটা টুল নিয়ে এসে বসো। কোনো কাজ করতে হবে না।”

তানিয়া খুশি হয়ে ডাইনিং থেকে একটা টুল এনে বসে পড়লো। তারপর শামীমের চোখে চোখ রেখে বললো, “তাহলে, তুমি শায়লাকে হাত নেড়েছিলে?”

“হুম। হঠাৎ উনাকে জানালা দিয়ে দেখতে পারলাম। আচ্ছা শোনো, তুমি তো দেখি পুরো ফ্রিজটা ভরে রেখেছো। আজ এত কিছু কিনতে গেলে কেন?”

“সব কিছু কিনেছি পার্টির জন্য। তোমার কথা মতো কিছু রেডিমেড খাবারও কিনেছি যাতে আমার কাজ কিছুটা কমে যায়। আর একটা কেকেরও অর্ডার করেছি।”

“বাহ। আজ তাহলে তুমি বেশ ব্যস্ত ছিলে,” শামীম বলল। সে কিছুতেই চায়নি তানিয়া এত কিছু কিনে ফেলুক। তবে যে পার্টিটা বাতিল করা আরো বেশি কঠিন হয়ে যাবে।

তানিয়া কোনো উত্তর দিচ্ছে না দেখে শামীম ওর নাম ধরে ডাকলো। “তানিয়া?”

তানিয়ার কোনো সাড়া নেই। শামীমের মনে হলো ওর সামনে এখন একটা পাথরের মূর্তি বসে আছে।

সে আবার বললো, “কথা বলছো না কেন? মন খারাপ?”

“তুমি কি আমাকে নিয়ে সুখী?” তানিয়া হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

প্রশ্ন শুনে শামীম হঠাৎ ঝিম মেরে গেল। এটাই হয়তো যথাযথ সময়। এখনই হয়তো তানিয়াকে সব কথা খুলে বলা যায়। কিন্তু তানিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে সে দমে গেল। সে এখন সত্য কথাটা বলতে পারবে না। তানিয়া কষ্ট পাবে। তাই সে বলে উঠলো, “আহ! এমন অদ্ভুত সব প্রশ্ন করো না তুমি? আমি অসুখী হবো কেন?”

তানিয়া গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। “আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি,” সে মৃদু স্বরে বলল। “আমি ভয় পাই, একদিন তুমি হয়তো আমার উপর বিরক্ত হয়ে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।”

শামীম তরকারিটা চুলা থেকে নামালো। “হঠাৎ এসব কথা কেন? ”

তানিয়া কাঁধ ঝাঁকালো। “আমি জানি না। এটা শুধু একটা অনুভূতি। মানে, আমি তোমাকে একটা সন্তান দিতে পারছি না। তুমি হয়তো কত আশা নিয়ে আছো। আমি বারবার তোমাকে হতাশ করছি। আর ধীরে ধীরে আমি দেখতেও খারাপ হয়ে যাচ্ছি। তুমি এখনো কত হ্যান্ডসাম! যে কোনো মেয়েই তোমাকে আমার থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইবে।”

“ওহ, তানিয়া। কী সব পাগলামো কথা বলছো। চলো আজকেও একটা মুভি দেখি। মুভি দেখলে তোমার মন থেকে এসব উদভট চিন্তা চলে যাবে।” শামীমের মনে হলো তানিয়া হয়তো সত্যের খুব কাছাকাছি চলে আসছে। সে হয়তো কিছু একটা বুঝে ফেলছে। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো। না, তানিয়া শায়লার কথা কখনো বুঝবে না। তানিয়ার সামনে কখনো সে কোনো ভুল করেনি। ।

“ যেহেতু পার্টি শনিবার, তুমি শুক্রবার তোমার সকল টিউশনি বাদ দিতে হবে কিন্তু। আমরা দুইজন একসাথে গিয়ে কিছু কেনাকাটা করবো। পার্টির জন্য ওইদিনই সব কাজ শেষ করে ফেলতে হবে।”

“আমি জানি। আমি সব ছাত্রদের অলরেডি ছুটি দিয়ে দিয়েছি।”

“আজ তুমিই প্রথম হাত নেড়েছিল কি?” তানিয়া হঠাৎ প্রশ্ন করল।

শামীম ওর প্রশ্ন বুঝতে পারলো না। “মানে?”

“না, বলছিলাম, শায়লাকে তুমিই আগে হাত নেড়েছিলে? না শায়লা?”

শামীম কপাল কুঁচকাল। “কখন?”

“এই তো একটু আগে যখন তুমি রান্নাঘরে এলে।  তুমি বলেছিলে, তুমি তাকে হাত নেড়েছো। ও কি প্রথম হাত নেড়েছিল?”

শামীম আবার মিথ্যার জালে আটকে পড়তে চাইলো না। “না। মনে হয়, আমি প্রথম হাত নেড়েছিলাম।”

“কেন?”

“ কেন আবার? হঠাৎ উনাকে দেখলাম। তাই। কোনোকিছু না ভেবেই।” শামীম নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করলো।

“ওহ, ঠিক আছে।।” তানিয়া বসা থেকে উঠে বেডরুমের দিকে এগুলো।

যাক, শায়লার আলোচনাটা তাহলে শেষ হলো ভেবে শামীম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তানিয়ার পিছু নিলো। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তানিয়া আবার তার দিকে ঘুরে তাকাল।

“তুমি জানো? শায়লা ওর হাসপাতালে এক ডাক্তারের সঙ্গে প্রেম করছে,” তানিয়া বলল। “যতদূর মনে পড়ে ওর নাম সায়েম। শায়লা বেশ কিছুদিন ধরে কেবল তার কথা বলছে। আমি শায়লাকে বলেছি উনাকে পার্টিতে আমন্ত্রণ জানাতে।”

শামীমের কপালে ভাঁজ পড়লো। শায়লা তাহলে অন্য একজনের সঙ্গে প্রেম করছে? সায়েম নামের কারো সাথে? কিন্তু এটা কীভাবে সম্ভব? কথাটা কি সত্যি? আর সত্যি না হলে কেনই বা শায়লা তানিয়াকে এটা বলবে?

“তাই বুঝি?” শামীম বুঝলো সিচুয়েশনটা ক্রিটিক্যাল। তার কিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো যাবে না।  ”তোমাকে এটা কখন বললেন?” তবু সে তার কৌতুহল দমাতে পারলো না।

তানিয়া কাঁধ ঝাঁকালো। “তা প্রায় এক মাস হলো। যখনই সুযোগ পায় তখনই নাকি একসাথে এদিক সেদিক ঘুরতে যায়। উনার নাকি চা-বাগানে ঘুরতে খুব ভালো লাগে। আর হাসপাতালটাও তো চা-বাগানগুলোর মাঝে।”

খবরটা শামীমের জন্য একদম নতুন।

“কিছু হয়েছে?” তানিয়া জিজ্ঞেস করল। “ তোমাকে খুব চিন্তিত লাগছে।”

শামীম নিজেকে সামলে  নেয়ার চেষ্টা করলো। “আরে না। আমি ঠিক আছি। আজ অনেক কষ্ট হয়েছে। বাচ্চাগুলো না অঙ্ক বুঝতেই চায় না। খুব ক্লান্ত লাগছে। আজ একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে বিছানায় যাবো।”

থ্রিলার- হেল্পিং হ্যান্ড- ২ । অধ্যায়- ৪

- Advertisement -

Read More

Recent